স্মৃতিতে ও শ্রদ্ধায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

আপডেট: জুলাই ১৩, ২০১৭, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক


‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’ (১০ জুলাই, ১৮৮৫-১৩ জুলাই, ১৯৬৯) একাধারে ছিলেন কবি-গল্পকার-প্রাবন্ধিক-গবেষক-ভাষাতাত্ত্বিক-বৈয়াকরণ-ভাষাবিজ্ঞানী-লোকসাহিত্যিক-পত্রিকাসম্পাদক-অভিধানপ্রণেতা-অনুবাদক-সাহিত্যসম্পাদক-সংস্কৃতিসংস্কারক-লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক ও ব্যাখ্যাকার-প্রাচীন ও মধ্যযুগবিশারদ এবং ইসলামী চিন্তাবিদ। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতিশব্দ ‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। একা নিজ হাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিয়ে অনলস গবেষণার যে উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছেনÑতা অতুল ও অনবদ্য! গবেষণায় যেসব বিষয় আপাতদৃষ্টিতে কারও স্পর্শসাধ্য ছিল না, সেসব বিষয়েই তিনি দিয়েছেন মনোযোগ, করেছেন অনবরত-অনলস তথ্যানুসন্ধান ও নিত্যনতুন সব সাহিত্যবিষয় উদ্ঘাটন। জ্ঞান আহরণের সাহসিকতা ও আগ্রহে যে অসীমতাকে তিনি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন তা ভাবলে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়। কী নিয়ে কাজ করেননি তিনি ! ভাষা-সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি-শিশুতোষ-প্রশাসনিক-ধর্মতাত্ত্বিক-একাডেমিক-সৃজনশীল-মননশীল প্রভূত বিষয়ে তাঁর ঐকান্তিক সাধনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে উন্নীত করেছে অনন্য এক উচ্চাসনে।
বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্সহ ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, প্রফেসর মুহম্মদ আবদুল হাই এঁদের সকলের কথাই অনেকটা জেনে ফেলেছিলাম ছোট বেলাতেই। যে সকল কৃতি প-িত ব্যক্তির নাম আমি এখানে লিপিবদ্ধ করেছি, তাঁরা সবাই ছিলেন আমার অগ্রজ মযহারুল ইসলামের সরাসরি শিক্ষক। অনার্স অথবা মাস্টার্স পর্যায়ে এই সমস্ত খ্যাতনামা শিক্ষকের কাছ থেকে তিনি পাঠ গ্রহণ করেছেন। ছুটিতে বাড়িতে এলে আমাদের বড়ভাই মযহারুল ইসলাম তাঁর বরেণ্য শিক্ষকদের গল্প আমাদেরকে সুন্দরভাবে শোনাতেন। আমরা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তাঁর সে গল্প শুনতাম।
১৯৫৫ সালে মেট্টিক পাস করবার পর আমাকে ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার জন্য ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। বড়ভাই মযহারুল ইসলাম তখন ঢাকা কলেজের বাংলার প্রভাষক। ঢাকা কলেজে আমার ভর্তি এবং ঢাকা কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভাইয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান প্রায় একই সময়ে ঘটে যায়। অর্থাৎ আমি ঢাকা কলেজে ভর্তির পর শিক্ষক হিসেবে ভাইকে আর ঢাকা কলেজে পাইনি। তিনি ইতোমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে ফেলেছেন। ১৯৫৫ সালে আব্বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। আমাদের আব্বা ছিলেন হোমিও চিকিৎসক। নিজের চিকিৎসা সবসময় তিনি নিজেই করতেন। কিন্তু তাঁর হার্টেও সমস্যা হয়েছে ভেবে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভাই আব্বাকে ঢাকায় নিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। আব্বার অসুস্থতার খবর শুনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আব্বাকে হাসপাতালে দেখতে আসেন। তখনই আমি জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্কে প্রথম দেখলাম। ছোট-খাটো, মোটা-সোটা মানুষ, কালো রঙের সেরোয়ানি, সাদা পাজামা, মুখভর্তি দাড়ি, মাথায় গোল টুপি, চেহারা দেখে মনে হলো অতি ধার্মিক এক দরবেশ ব্যক্তি। আব্বার বেডের পাশে বসে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রথমেই জানতে চাইলেন তিনি কোন পীরের মুরিদ। আব্বা উত্তরে বলেছিলেন খাজা মঈনুদ্দীন চিশতীকে তিনি পীর হিসেবে মানেন। শুনে শহীদুল্লাহ্ সাহেব বললেন তরিকাধারী মুসলমানদের হার্টের অসুখ হবার সুযোগ নেই। ঠিকমত আল্লার জিকির করতে পারলে হার্ট পরিষ্কার থাকবে। আব্বাকে বেশি বেশি আল্লার জিকির করতে পরামর্শ দিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাকাল ১ নভেম্বর ১৯৫৫ সাল। প্রতিষ্ঠালগ্নের শুরুতেই অর্থাৎ ১৯৫৫ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বাংলা বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ উপলব্ধি করেন, নতুন বিভাগকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে একজন মেধাবী তরুণ শিক্ষক প্রয়োজন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অত্যন্ত ¯েœহভাজন ছাত্র ছিলেন মযহারুল ইসলাম। মযহারুল ইসলাম তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর কৃতি ছাত্র মযহারুল ইসলামকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদানের আহ্বান জানান। গুরুর আহ্বানকে অগ্রাহ্য করতে পারেন নি মযহারুল ইসলাম। ১৯৫৭ সালে মযহারুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বিভাগে যোগদান করেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র তত্ত্বাবধানে মযহারুল ইসলাম মধ্যযুগের কবি হেয়াত মামুদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং ১৯৫৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। আমার জানা মতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মযহারুল ইসলামই প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র বেশ বয়স হয়ে গিয়েছিল। তারপরও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুরোধে  মাত্র দু’বছরের জন্য তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করতে এসেছিলেন। ১৯৫৮ সালে তাঁর দু’বছরের মেয়াদ সীমা শেষ হয়। ১৯৫৮ সালে ড. মযহারুল ইসলামের ওপর বাংলা বিভাগের দায়িত্ব দিয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ অবসরে চলে যান। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরে চলে গেলেও তাঁর প্রিয় ছাত্র মযহারুল ইসলাম তাঁকে সবসময় নানা কাজে বাংলা বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত রাখবার চেষ্টা করেছেন। বিভাগের নানা কাজে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্কে আমন্ত্রণ জানাতেন এবং প্রতিটি আমন্ত্রণে তিনি সাড়া দিতেন। সে কালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের জন্য কোন গেস্ট হাউস ছিল না। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কাজে রাজশাহীতে এলে ভাইয়ের বাসাতেই উঠতেন। আমি ভাইয়ের বাসায় থেকে রাজশাহী কলেজে অনার্স পড়তাম। আমি বাংলায় অনার্স করছি এ কথা জানবার পর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আমাকে অত্যন্ত ¯েœহ করতে থাকেন। ভয়ে ভয়ে তাঁর কাছ থেকে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের নানা বিষয় জেনে নেয়ার চেষ্টা করতাম। তিনি আমাকে ‘আবদুল খালেক’ নামে ডাকতেন। ‘খালেক’ নামে তিনি কখনও আমাকে ডাকতেন না, কারণ ‘খালেক’ আল্লাহ্র একটি নাম। আমার অগ্রজকে ‘মযহার’ বলে ডাকতেন। তিনি বেশ ভোজন রসিক ছিলেন। ভাবীর রান্নার তিনি খুব প্রশংসা করতেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যে ক’দিন বাসায় থাকতেন, ভাবী তাঁকে খুব সেবা-যতœ করতেন। ভাবীকে তিনি ‘বৌমা’ বলে সম্বোধন করতেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ একটু নাঁকি স্বরে কথা বলতেন। ফরাসি ভাষা শিখতে গিয়ে সম্ভবত এমনটি ঘটেছে।
বিভাগীয় কোন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে শুরু করলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই ভাষাবিদের কথা সহজে শেষ হতে চাইতো না। তাঁর বক্তৃতা ছোট করতে বলার সাহস কারও ছিল না। শেষ পর্যন্ত কৌশল অবলম্বন করা হতো। বিভাগীয় প্রধান তাঁর কানের কাছে গিয়ে বলতেন ‘স্যার খাবার ঠা-া হয়ে যাচ্ছে’। সাথে সাথে তিনি বক্তৃতা থামিয়ে দিতেন। খাবার সামনে রেখে তিনি বক্তৃতা দেয়া পছন্দ করতেন না।
ধর্মীয় ব্যাপারে ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অসাধারণ খ্যাতি ছিল কিন্তু তাঁর মধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামী তেমন ছিল না। তিনি ব্যক্তিজীবনে ইসলামী পোশাক ব্যবহার করতেন কিন্তু অন্যদের ওপর তা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা কখনও করেন নি। সেকালে ছাত্রীদের মধ্যে বোরখা ব্যবহারের প্রবণতা তেমন ছিল না। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ কখনও ছাত্রীদেরকে বোরখা ব্যবহারের জন্য কোনো রকম চাপ দিতেন না, তবে মেয়েদের মাথায় একটু কাপড় থাকলে তিনি খুশি হতেন। ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মাঝে মাঝে তিনি ‘নাতি-নাতনি শিক্ষার্থী’ বলে সম্বোধন করতেন, কারণ সে সময় বিভাগের যারা শিক্ষার্থী তারা সবাই ছিল তাঁর ছাত্রেরও ছাত্র-ছাত্রী।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ কথা বলতেন একটু ধীর লয়ে। আমরা তাঁর শেষ বয়সের বক্তৃতা শুনেছি। সে সময় কথা বলতে গিয়ে মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলতেন। তবে তাঁর কথার মধ্যে অসাধারণ পা-িত্যের প্রকাশ ঘটতো। ছাত্র-ছাত্রীদেরকে নিয়ে মাঝে মাঝে তিনি রসিকতা করতেন।
১৯৬৩ সালের প্রথম দিকের একটি ঘটনা আমার জীবনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। আমি তখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কোনো কাজে এলে রাজশাহী বেতার কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিয়ে সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ পরিচালিত সাহিত্য বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ আমি পেয়েছিলাম। অনুষ্ঠানে আরও যাঁরা ছিলেন তাঁরা হলেনÑ ড. মযহারুল ইসলাম, ড. কাজী আবদুল মান্নান, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী এবং খোন্দকার আজিজুল হক। বেতার কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটিকে ক্যামেরাবদ্ধ করে রেখেছিল। ছবিটি এখনও আমার কাছে অত্যন্ত যতœ সহকারে রক্ষিত আছে। এই দুর্লভ স্মৃতি কখনও ভুলবার নয়। তাঁর সঙ্গস্মৃতি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে জীবনের সকল সংকটে ও সাফল্যে।
আমি ১৩ জুলাই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ৪৭তম প্রয়াণবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। এবং প্রত্যাশা করছি জ্ঞানতাপস এই মনীষী আমাদের চেতনার জগতে জাগরুক থাকুক নিরন্তর। জয়তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ।
লেখক: উপাচার্য, নর্থঙ্গেল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি