স্মৃতিভ্রম প্রতিরোধে কার্যকর টনিক সজনে পাতা! পাতা, বীজ ও তেলের সম্ভাবনাময় দেশীয় ও আন্তজার্তিক বাজার

আপডেট: মার্চ ৩, ২০২৪, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ


মাহাবুল ইসলাম:সজনে। যাকে পরিত্যক্ত জমির আবাদও বলা হয়। রাজশাহীর প্রান্তিক গ্রামগুলোতে ‘ছুটি’ নামেই বেশ পরিচিত সজনে। যদিও এ নামের রহস্যভেদ করা সম্ভব হয় নি। তবে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকা’র সহযোগিতায় দেশে প্রথমবারের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেশীয় সজনের পাতা, ডাঁটা, বীজ ও তেল নিয়ে গবেষণায় বিস্ময়কর সফলতা এসেছে। দেশীয় ও আন্তজার্তিক বাজারে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে এই গবেষণা।

গবেষকরা বলছেন, সজিনার পাতা ‘নিউট্রিশন্স সুপার ফুড’ এবং সজিনা গাছ হলো ‘মিরাকেল ট্রি’। আর আমাদের দেশের সজিনার পুষ্টিগুণ ও ওষুধিগুণ আরও বেশি সমৃদ্ধ। একারণে আন্তজার্তিক বাজারে এর বিশেষ চাহিদা রয়েছে।

অপ্রচলিত সবজির বাণিজ্যিক বাজারজাতকরণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে চলা এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেন।
তিনি বলেন, আন্তজার্তিক দাতা সংস্থা জাইকার সহযোগিতায় সজিনা নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি এখনো চলমান। প্রকল্পের প্রথম ফেজে আমরা সজনে ‘পাতা’ নিয়ে গবেষণা করেছি। ভালো সফলতা পেয়েছি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের বদ্ধভূমি সংলগ্ন এলাকায় ১ হেক্টর জমি দিয়েছিলেন। যেখানে সজনে গাছ রোপণ করেছিলাম। ২ বছর ওই গাছ থেকে পাতা নিতে পেরেছিলাম। পরে জলাবদ্ধতায় গাছগুলো নষ্ট হয়ে যায়। পরে বিভিন্ন জায়গায় সজনে গাছ লাগানোর আন্দোলন করি। নগরীতে গ্রুপ করে যাদের পরিত্যক্ত জমি আছে বা সজনে চাষে ইচ্ছুক এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠান বৈঠক করেও সজনে চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়। নগরের ৮ শতাধিক মানুষ সে সময় সাড়া দিয়েছিলেন। পরে তাদের কাছ থেকে সজনে পাতা কেনাও হয়েছিলো। গবেষণা শেষে কয়েকটি চালান জাপানের মার্কেট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারি। যেটির ব্যাপক চাহিদা থাকলেও করোনার কারণে বন্ধ হয় যায়।

তিনি আরও বলেন, ওই গবেষণায় জন্য আমরা টেকনোলজি উদ্ভাবন করি। ওই টেকনোলাজি ব্যবহার করে পাতা শুকিয়ে গুড়া করে পরিক্ষা-নিরিক্ষা করা হয়। যেখানে দেখা গেছে, অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের সজিনার নিউট্রিশন্স অনেক বেশি। আর এই নিউট্রিশনাল কম্পোনেন্টে ‘গামা এমাইনো বিউট্রিক অ্যাসিড’ এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। যেটা বিস্ময়কর সফলতা এ প্রকল্পের। কারণ ‘গামা এমাইনো বিউট্রিক অ্যাসিড’ মানুষের স্মৃতিভ্রম প্রতিরোধে খুব কার্যকরি একটি টনিক। যেটা আমাদের দেশের সজিনা পাতায় সবচেয়ে বেশি।

এই টেকনোলজি ব্যবহার না করে গতানুগতিকভাবে সজিনা পাতা গুড়া করলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের দেশের অনেকেই সজিনা পাতা ড্রাই করে গুড়া করে তা বাজারজাত করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে অনেক ভিডিও দেখা যায়। কিন্তু এখানে টেকনোলজির ব্যবহার হচ্ছে না। আর সজিনা পাতা মিরাকল পাতা হলেও এর ডাল ‘বিষ’। পাতা থেকে ছোট ছোট ডালগুলো ভালোভাবে অপসারণ না করে এটা ব্যবহার করা হলে মানবদেহের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া এই টেকনোলজির বাইরে সূর্যের আলোতে পাতা শুকানো হলে নিউট্রিশন্স ভ্যালুও অনেক গুণ কমে যায়।

ওই প্রকল্পের দ্বিতীয় ফেজে তেল নিয়ে গবেষণা চলমান জানিয়ে অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেন বলেন, সজিনার বীজ থেকে যে তেল হয় তার মূল্য প্রতিলিটার ১০ হাজার টাকা এবং আন্তজার্তিক বাজারে এ তেলের ব্যাপক চাহিদা আছে। আর আমাদের দেশের তেলের গুণগত মান অনেক ভালো। একারণে জাপানি গবেষকরা এটা নিয়ে বেশ আগ্রহী।

প্রতি ৬ কেজি সজনে বীজে ১ লিটার ৮০০ গ্রাম তেল পাওয়া যায়। তবে সমস্যা হলো আমাদের দেশে সজনে বীজ উৎপাদন হয় না। এটি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এই তেল ওষুধ ও কসমেট্রিক্স শিল্পের মূল্যবান একটি উপাদান।

এদিকে, রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী জেলায় বাড়ছে সজিনার চাষ। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে রাজশাহী জেলায় সজিনার আবাদের পরিমাণ ছিলো মাত্র ১১১ হেক্টর। যেখানে উৎপাদন ছিলো ১ হাজার ৩৮৩ মেট্রিক টন। যা ২০২৩-২৪ অর্থ-বছরে আবাদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৮ হেক্টর এবং উৎপাদনের পরিমাণ ৩ হাজার ৯৯৮ মেট্রিক টন। এরমধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সজনির আবাদের পরিমাণ ছিলো ১৩২ হেক্টর ও উৎপাদন ১ হাজার ৩৪৬ মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থ-বছরে ১২৬ হেক্টর জমিতে উৎপাদন ছিলো ১ হাজার ৫৪০ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৭৮ হেক্টর জমিতে উৎপাদন ছিলো ৪ হাজার ৩৮৩ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৪৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন ছিলো তিন হাজার ৭২০ মেট্রিক টন।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক পরিচালক কৃষিবিদ মো. শামসুল ওয়াদুদ বলেন, সাম্প্রাতিককালে সজিনার স্বাস্থ্যগত গুণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চাষীরা এগিয়ে আসছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত জমিতেই সজিনার চাষ হচ্ছে। কিছু উদ্যোক্তা বাণিজ্যিকভাবে সজিনা চাষেও এগিয়ে আসছে। ফুড ভ্যালু বিবেচনায় এটির আবাদ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে জানান তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ