স্মৃতি অম্লান : কিছু স্মৃতি কথা

আপডেট: ডিসেম্বর ১৬, ২০১৬, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ

রাজিউদ্দীন আহ্মাদ


১৪ ডিসেম্বর ভদ্রার মোড়ের স্মৃতি স্তম্ভটির নির্মাণ সমাপ্তির পর ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে Ñ আ কোয়ার্টার অব আ সেঞ্চুরি! নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল প্রায় ৭/৮ মাস। প্রায় পুরোটাই ইটের গাঁথুনির কাজ, ফলে কাজ এগিয়েছিল মোটামুটি দ্রুত গতিতে। এ সব নিয়ে একটু খোলামেলা আলাপ করার উদ্দেশ্যেই আজ লিখতে বসা। শুরুতে একটু ভিন্ন প্রসক্সেগ দুটো কথা বলার জন্য এই দিন তারিখগুলো উল্লেখ করা।
স্বাধীনতার কুড়ি বছর পর ১৯৯১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্মৃতিসৌধটির উদ্বোধন হয়ে গেল। এরপর শুরু হলো এই স্মৃতিস্তম্ভের ডিজাইন ও তার নির্মাণ কাজ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পালা। প্রথমেই প্রশ্ন এলো আরডিএর চেয়ারম্যান স্বয়ং ব্রিগেডিয়ার এম এ রবের কাছ থেকে। নির্মাণ কাজ ও উদ্বোধনীর পরে তিনি একটা ডিনার থ্রো করেছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার পরে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা রাজিভাই, সত্যি করে বলুন তো, এই স্মৃতি স্তম্ভটা কতোটা নির্ভরযোগ্য? এর পাশ দিয়ে যেতে আমার তো ভীষণ ভয় করে Ñ কখন যে ভেক্সেগ পড়ে!’ আমি বললাম, ‘আপনি এর পাশ দিয়ে একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন; হেলমেট ছাড়া কখনই এর পাশে যাবেন না।’ পরে অবশ্য বলেছিলাম, ‘রিখটার স্কেলে সাড়ে ছয়/সাত মাত্রার ভূমিকম্পের আভাস যদি কখনও পান, তবে প্রচার করে দিবেন কেউ যেন এর ধারে-কাছে না আসে; তবে, ঝড়-বাতাসে কোনো ভয় নেই। ঠিক কতো গতিতে ঝড় হলে এটা ভেক্সেগ পড়বে তা আপনাকে কাল বলব।’ ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার খালেদুজ্জামানের কাছ থেকে জেনে পরের দিন চেয়ারম্যান সাহেববকে বলে দিয়েছিলাম যে, ‘ওই স্তম্ভটিকে ভেক্সেগ ফেলতে ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার বেগসম্পন্ন ঝড়ের প্রয়োজন হবে। তখন অন্যান্য দালান-কোঠা আর একটাও থাকবে না, সুতরাং এ নিয়ে চিন্তা অবান্তর।’
এর পরে নানান জনের নানান প্রশ্ন। কেউ জানতে চান, উপরের গোল সূর্যটা কী করে বানালাম; আবার কেউ জানতে চান, ইটগুলো ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছিলাম কি না। কেউ বা জানতে চাইলেন, এটি বানাতে খরচ কতো হলো। কেউ জানতে চাইলেন, কংক্রিট দিয়ে এটি বানালাম না কেন। সামনা সামনি কেউ এটিকে অবশ্য খারাপ বলেন নি; বরং সকলেই এর প্রশংসাই করেছেন; এমন কি, আমার ¯থপতি ব›ধুরাও এর প্রশংসা করেছেন। এরই এক কী দুদিন পরে দৈনিক সংবাদের এক প্রতিবেদনে জানতে পারলাম যে, নি¤œমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে এবং অদক্ষ নির্মাণ শ্রমিক দিয়ে রাজশাহীতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে … নগরবাসী শঙ্কিত … ইত্যাদি ইত্যাদি। পেপার কাটিংটি আমি অনেক যতœ করে রেখে দিয়েছিলাম, দশ বছর পরে, ২০০১ সালে, ওই পেপার কাটিংটিসহ সচিত্র কিছু লিখব বলে কিন্তু সেটি আর খুঁজে পাই নি, তাই আর লিখি নি। এতোদিনে আমার এক ঘনিষ্ট ব›ধুর অনুরোধে লিখতে বসা মূলত এর খুঁটিনাটি দিকগুলো লিপিব™ধ করে রাখার উদ্দেশ্যে।
এ প্রসক্সেগ আরও দু-চারটা কথা বলা উচিত বলে আমি মনে করি। ব্রিগেডিয়ার রবের প্রশ্নটা হয়তো কেবল তাঁর একার ছিল না। নির্মাণ করার সময়ে অনেকেই এটা বুঝতে পারেন নি, কিন্তু নির্মাণ শেষ হয়ে যাবার পরে যখন এর চার পাশ থেকে বাঁসের খুঁটিগুলি সরিয়ে ফেলা হয়েছে তখন তাঁরা এটি দেখে হয়তো সত্যিই ভয় পেয়েছিলেন। এতো উঁচু (রাস্তার সারফেস থেকে উপরের গোলোকের টপ পর্যন্ত ৮৩ ফুট যা ৮ তলা ভবনের সমান) ইটের ¯থাপনা তাঁরা আগে কখনও দেখেন নি। আর এই শক্সকার কথা জেনে দৈনিক সংবাদ দেশের অন্যান্য নির্মাণ কাজের সক্সেগ সামঞ্জস্য রেখে তার প্রতিবেদনটি লিখেছিল Ñ তারা জানবার চেষ্টাও করে নি যে, এটি কোনো ঠিকাদার নির্মাণ করে দেয় নি। আপাতদৃষ্টিতে সহজ-সরল এই স্তম্ভটির ডিজাইনের জটিলতাটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ব্রিগেডিয়ার রব, এবং তিনি আমাকে এটি নির্মাণ করে দিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করলে এটি আমি আমার বিশ্বস্ত লোকবল দিয়ে আমার নিজের তত্বাবধানে নির্মাণ করে দিয়েছিলাম। এবার মূল বিষয়ে ফিরে আসি।
১৯৯০ সাল Ñ হঠাৎ করেই প্রেসিডেন্ট এরশাদ ব্রিগেডিয়ার রবকে তাঁর জন্য থ্রেট মনে করে তাঁকে (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্ট থেকে সরিয়ে রাজশাহী ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (আরডিএ) চেয়ারম্যান করে রাজশাহীতে পাঠিয়ে দিলেন। বেচারা রব রাজশাহী এসে একেবারে একা হয়ে পড়লেন এবং নতুন কাজে কিছুতেই মন বসাতে পারছিলেন না। সিলেটের মানুষ রব রাজশাহীতে ব্যস্ত থাকার প্রয়াসে একটা ইন্টারেস্টিং কাজ খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলেন। মুক্তিযো™ধা এম এ রব দেখলেন, বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে স্বাধীনতার প্রায় কুড়ি বছর পরেও কোনো স্মৃতিসৌধ নেই। তিনি ঠিক করলেন এখানে একটা স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করবেন। কিন্তু কোথায় করবেন, আর তার জন্য অর্থই বা পাবেন কোথা থেকে! শেষ পর্যন্ত তারও একটা পথ তিনি বের করে ফেললেন।
এর কিছু আগেই রাজশাহীর তালাইমারি থেকে রেল স্টেশন পর্যন্ত একটা রাস্তা বানিয়েছে আরডিএ। ওই রাস্তার তালাইমারি ও ভদ্রা মোড়ে শোভাবর্ধনের নিমিত্তে দুটো ভাষ্কর্য তৈরির জন্য দু-লাখ করে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। তার মধ্যে তালাইমারিরটা হয়ে গেছে বাকি আছে ভদ্রার মোড়। দু-লাখ টাকার সাথে একটুখানি জায়গা তিনি পেয়ে গেলেন। এবার প্রয়োজন একটা ডিজাইন। ডিজাইনের জন্য শরণাপন্ন হলেন আমার সহপাঠী ও ব›ধু ¯থপতি মুজাহীদ আলম চৌধুরির কাছে, যে রবেরও ব›ধু। রব মুজাহীদকে একটা ডিজাইন করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন কিন্তু মুজাহীদ তখন ¯থাপত্যচর্চা ছেড়ে ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট Ñ এদিকে ব›ধুর অনুরোধ! মুজাহীদ তখন তাঁকে বুঝিয়েসুঝিয়ে রাজশাহীর একজন ¯থপতি যিনি নিজের মনে করে অতি যতেœর সক্সেগ ডিজাইন করে দিবেন এবং কোনো ফিও নিবেন না বলে আমার কাছে তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন। মুজাহীদের বাড়িতে রবের সক্সেগ আমার দু-একবার দেখা হয়েছে। চেনা-জানা, আলাপ-পরিচয় তাই আগে থেকেই ছিল। তিনি সবকিছু আমাকে বললেন, এবং তা শুনার পরে রাস্তার মধ্যে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের আইডিয়াটা আমার পছন্দ হলো না, তাই সে ডিজাইন আমি করব না Ñ তাঁকে জানিয়ে দিলাম।
এ ঘটনার পর আমারও খারাপ লাগছিল। রাতে শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা করে সি™ধান্তে পৌঁছুলাম যে, আমার পূর্বের সি™ধান্তটিই আসলে ভুল। রব আর্মির লোক, মাথায় যখন একবার ঢুকেছে, এ কাজ তিনি করেই ছাড়বেন Ñ এঁদেরকে আমি ভালভাবেই চিনি। আর আমাদের দেশের ¯থপতিদের যতটুকু জানি, যাঁকে দিয়ে এ ডিজাইন তিনি করিয়ে নিবেন তিনি যে আমার মতো করে বিষয়টাকে নিবেন না, এ বিষয়েও আমি প্রায় নিশ্চিত। তাই সকালে উঠেই রবের অফিসে পৌঁছলাম ও তাঁকে আমার সি™ধান্ত বদলানোর কথা জানালাম। তিনি যে কী খুশি হয়েছিলেন তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। বুঝতে অসুবিধা হয় নি যে, আমার মতো তিনিও বিনিদ্র রাত কাটিয়েছিলেন।
কাজ শুরু করলাম Ñ কুড়ি-একুশ ফুট রেডিয়াসের একটি গোলাকৃতি জায়গা Ñ তিন রাস্তার মোড়। প্রথম বিবেচ্য বিষয় হলো, ট্রাফিক ফ্লোকে যতটা সম্ভব সহজ রেখে একটা ডিজাইন দাঁড় করতে হবে। তিনটা ভিন্ন ডিজাইন করে পরের দিন চেয়ারম্যানকে দেখালাম। তিনি একটা চুজ করলেন Ñ সেটাকে আরও ডেভেলপ করলাম। তিনটা কার্ভড ওয়ালকে দাঁড় করালাম যাদের কেন্দ্রের দিক উঁচু হয়ে যাবে আর বাইরের দিক নিচু হবে যাতে করে গাড়ি, বাস বা ট্রাক ড্রাইভারদের দৃষ্টি অত বেশি বাধাপ্রাপ্ত না হয়। দেয়ালগুলোকে কার্ভ করার উদ্দেশ্য হলো প্রথমত, স্টেবিলিটি এবং দ্বিতীয়ত, দেখতে যেন একটি নতুন পাতা যেভাবে বের হয় তেমন লাগে Ñ অর্থাৎ নতুনের আবির্ভাব।
মাথার মধ্যে পাঁচ লাখ টাকার চিন্তা নিয়ে কাজ। চেয়ারম্যান সাহেব বলেছেন, দু-লাখ তো আছে, আর তিন লাখ টাকা যে ভাবেই হোক তিনি জোগাড় করে দিবেন। এই বাজেটের সক্সেগ সক্সগতি রেখে স্তম্ভটির উচ্চতা ৪০/৪৫ ফুটের বেশি করা কঠিন। চার-পাঁচ তলা বিল্ডিং-এর সমান উচ্চতার ওয়াল। ভাবলাম এর মাঝে কিছু ফুটো রাখলে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারবে, ওয়ালের উপর ল্যাটারাল থ্রাস্ট কম পড়বে। তা ছাড়া, ফুটোগুলো এ দেশের মানুষের বুক ঝাঁজরা হয়ে যাওয়াকেও বুুঝাবে। তাই ওয়ালের মধ্যে কিছু ফুটো করে দিলাম। ওয়ালগুলো একেকটি সমকোণী ত্রিভুজের মতো হলো কিন্তু অতিভূজটিকে সোজা না করে কার্ভড করলাম Ñ এটাও মূলত ড্রাইভারদের সুবিধার জন্য; তবে, এদের আকাশের দিকের নির্দেশ আমাদের উত্তরোত্তর উন্নতিকেও বুঝাবে। এ কার্ভটি করলাম হাইপারবোলিক প্যারাবোলার ফরমুলায় যাতে করে নিচের দিক বেশি উন্মুক্ত থাকে, ড্রাইভারদের দেখতে সুবিধা হয়। আর, এই তিনটি পাতাকে বসালাম একটা ৫০ ফুট ব্যাসের টবের উপরে যেখানে টবের উপরের ফাঁকা যায়গায় পড়ে থাকবে বিভিন্ন আকারের রঙবেরঙের পাথর যা ২ লক্ষ বীরাক্সগনাদের প্রতিক। তিনটি ওয়ালের মাথার উপর বসালাম একটি লাল সূর্যের ভেতরে বাংলাদেশের ম্যাপ, বাংলাদেশের প্রথম পতাকার আদলে Ñ এটি বাংলাদেশের প্রতিক। সক্সেগ সক্সেগ এরও একটা রেকর্ড রাখা যে, কতোটা নির্বোধ হলে একজন পতাকার ভেতরে ম্যাপ রাখতে পারে। অবশ্য, শেষ পর্যন্ত তা রাখতে পারা যায় নি Ñ যারা রেখেছিল তাদেরকেই পরে মুছে ফেলতে হয়েছে।
পরের দিন আবার চেয়ারম্যান সাহেবকে দেখালামÑ তিনি দেখে খুব খুশি। আরডিএর অন্যান্য অফিসারদের ডেকে দেখালেন তিনিÑ সকলেরই পছন্দ। চেয়ারম্যান সাহেব জানতে চাইলেন, ফুটোগুলো কেন রেখেছি এবং তাদের সংখ্যা নির্দিষ্ট কি না। আমি বুঝানোর পর তিনি আশ্বস্ত হয়ে আমাকে বললেন, দশটা করে তিনটা ওয়ালে মোট ত্রিশটা ফুটো রাখা যায় কি না। আমি বললাম, হা, তা করা যায়। এবারে তিনি বললেন, অতিভূজটিকে স্টেপের মত করা যায় কি না। আমি বললাম, তাও করা যায় Ñ মূল্য মাত্র আমার একটি রাত্রি, আর কিছু বাড়তি খরচ; কারণ, এটি মিলাতে গিয়ে হয় তো হাইট কিছুটা বেড়ে যাবে। তিনি বললেন, খরচ একটু বাড়লে বাড়–ক, আপনি ২৪টা করে স্টেপ করে দিন। পরে জেনেছিলাম তিনি ২৪টি স্টেপ দিয়ে পাকিস্তানি শাসনের ২৪ বছর বুঝাতে চেয়েছিলেন আর ৩০টা ফুটো দিয়ে ত্রিশ লক্ষ শহিদ বুঝাতে চেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে দাঁড়ালো, পাকিস্তানের শাসনের ২৪ বছরের মাথায় বুলেটের আঘাতে ত্রিশ লক্ষ শহিদের ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া বুক ও দুই লক্ষ মা-বোনের লজ্জার বিনিময়ে একটি নতুন দেশের জন্ম হয় আমাদের স্বাধীনতা যু™েধর মাধ্যমে।
সারা রাত জেগে কাজটি শেষ করলাম এবং পরের দিন তাঁকে আবার দেখালাম। স্টেপ করতে গিয়ে উচ্চতা বেশ কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল, ওইটুকু জায়গাতে ধরানোই যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত চেয়ারম্যান সাহেব তার ডিসক্রিশনারি পাওয়ার খাটিয়ে জায়গার মাপ রেডিয়াসে ৫ ফুট বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অ্যাপ্রুভও হয়ে গেল এবং নির্মাণ কাজের জন্য সিডিউল তৈরি করতে লেগে গেলেন তিনি; কিন্তু, গোল বাধলো Ñ এ কাজ করবে কে? চেয়ারম্যানের মতে রাজশাহীতে এ কাজ করার জন্য কোনো ঠিকাদার নেই। তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, ডিজাইনটি দেখতে যতই সাদামাটা হোক না কেন, এটি বানানো বেশ কঠিন হবে। প্রতিটি স্টেপের রাইজার, ট্রেড, এমন কি, তাদের মুখের দিকের মাপ ও গোড়ার দিকের মাপ পৃথক। ফুটোগুলো অবশ্য ইররেগুলার করতে চেয়েছিলাম যা পরে বৃত্তাকার ও সব সমান করেছি, কিন্তু সেগুলো নির্মাণ করাও বেশ দুরূহ। তার উপরে সবার উপরে একটা লাল সূর্য বসানো হয়েছিল Ñ এটা ফেরোসিমেন্ট দিয়ে তৈরি। এটাও রাজশাহীর ঠিকাদারদের জন্য নতুন। সর্বোপরি, পুরো কাজটা হবে ইট দিয়ে যার প্লাস্টিসিটি খুব কম। আবার, কাজটি টাকার অক্সেক খুব ছোট। এত ছোট কাজের জন্য ঢাকার ঠিকাদাররা এ কাজ করতে আসবেও না। আসলেও যে বাড়তি খরচ হবে তার সংকুলান করা কঠিন হয়ে যাবে। এ সব ভেবে চেয়ারম্যান সাহেব শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব দিয়ে বসলেন যে কাজটা অন্তত ডিজাইনের স্বার্থে যেন আমিই করে দিই। অন্য কাউকে দিলে ডিজাইনের কিছুই থাকবে না। একটি মাত্র শর্তে আমি নির্মাণ করে দিতে সম্মত হয়েছিলাম যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত সেই শর্ত রক্ষা করতে পারেন নি। আমি বলেছিলাম, নির্মাণ আমি করে দিব কিন্তু আরডিএর পক্ষ থেকে একজন টেকনিকেল পার্সনকে সার্বক্ষণিক তত্বাবধান করতে হবে। একজনকে সেখানে তিনি নিয়োগও দিয়েছিলেন কিন্তু মাত্র সপ্তাহখানেক পরেই তিনি চলে গিয়েছিলেন। চেয়ারম্যানের কাছে নালিশ করলে সেই সুপারভাইজার তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি, স্যার, আর কী দেখব, আর্কিটেক্ট সাহেব যে ভাবে কাজ করাচ্ছেন তার অনেক কিছু তো আমিই জানি না! ৪৫ মিনিট আগের তৈরি মর্টার তাঁর মিস্ত্রিরা যখন ব্যবহার করতে গেলেন তখন তিনি তা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নতুন মর্টার তৈরি করিয়ে তবে কাজ শুরু করলেন আমার চোখের সামনে। আমি তো জানতামও না যে, সিমেন্টে পানি মিশানোর পর ৪৫ মিনিটের মধ্যে কাজে লাগাতে হবে, তা না হলে তা ফেলে দিতে হবে!’ তারপর তাঁকে বুঝিয়েসুঝিয়ে আরও কিছু দিন পাঠানো হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত থাকেন নি।
মুশকিলে পড়লাম লেআউট দিতে গিয়ে। কার্ভড ওয়ালের লেআউট, তাও আবার রেগুলার কার্ভ নয়; একটাও নয় Ñ তিনটে। সব কটা একই রকম হতে হবে! শেষে জায়গাটিকে পরিষ্কার করে চক-পাওডার দিয়ে সরেজমিনে একটি ওয়ালের ট্রেঞ্চের ড্রইং করলাম ফুল স্কেলে। তারপরে যারা গ্রিল তৈরি করেন তেমন একজনকে ডেকে ড্রইং বরাবর একটা ফ্রেম বানালাম এমএস রড দিয়ে। মাঝে ট্রাসের মতো করে রড দিয়েই টানা দিয়ে দিলাম যাতে করে একে টানাটুনি করলে নড়েচড়ে না যায়। এবার ওই ফ্রেমটিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আরও দুটো ড্রইং আঁকা হলো। সব ড্রইং শেষ হলে ড্রইং বরাবর ইট গাঁথা হলো একটু কড়া মর্টার দিয়ে। এবারে ইটের গাঁথুনির সক্সেগ শঅল করে ট্রেঞ্চ কাটা হলো অতি সাবধানে যাতে করে ড্রইংগুলো সোজা ৯ ফুট নিচে নেমে যায়। এর পূর্বে অবশ্য মেইন রোডের উপরে দুটো স্পিড ব্রেকার নির্মাণ করে দুটো নোটিশ লিখে তার পাশে টানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নোটিশ দুটোতে দুঃখ প্রকাশ করে গাড়ির ড্রাইভারদের এই জায়গাটুকু ধীরে পার হতে অনুরোধ করা হয়েছিল, এবং এও বলা হয়েছিল যে, কাজ শেষ হলেই স্পিড ব্রেকারগুলো ভেক্সেগ ফেলা হবে। মূল কাজ শুরু হয়ে গেল। নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করলেন আরডিএর চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার এম এ রব।
৯১-এর মে/জুনের দিকে যখন কাজ শুরু হলো তখন ইটখোলাগুলোতে ইট প্রায় শেষ। ভাল ইট পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে এক্সপোজড ইটের কাজ। ইট সংগ্রহ করাটাই হয়ে পড়েছিল একটা চ্যালেঞ্জ। শেষে বিভিন্ন ভাটা ঘুরে ঘুরে ইট সংগ্রহ করা হলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে এবং সেখান থেকে বেছে বেছে এ কাজ করা হলো; নির্মাণ হয়ে যাবার পরে যে কাজের আর কোনো নিশানা থাকল না।
পুরো নির্মাণকালের প্রায় অর্ধেক সময় আমি নিজে উপ¯িথত ছিলাম এবং সার্বক্ষণিক দেখাশুনা করেছিল আমার ছোটভাই বুজি যার পোষাকি নাম আহ্মাদ মুস্তাকুল মুরশিদ। সে তার এক ব›ধুকে নিয়ে সার্বক্ষণিক ওই সাইটে অব¯থান করত। এদের ছাড়া আমার পক্ষে এ কাজ এতো সুন্দরভাবে শেষ করা সত্যিই বেশ কঠিন হতো। তারা আজ কেউই নেই, এমন কি, রাজমিস্ত্রিদের প্রধান মিস্ত্রিও মারা গেছে। এদের কথা কেউ জানবেন না। দুদিন পর আমিও থাকব না Ñ হয়ত আমার নামও সাধারণের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে Ñ থাকবে কেবল দু-এক জায়গায় লিখিত আকারে। এখানে উল্লেখযোগ্য, এই স্মৃতিসৌধটির নাম ‘স্মৃতি অম্লান’ এবং ‘যাঁদের রক্তে স্বাধীন এ দেশ’ উৎসর্গ বাণীটি দিয়েছিলেন আরডিএরই একজন অফিসার খুরশিদ আলম মিনু। তবে অনেকের কাছ থেকে নিয়ে প্রাথমিক বাছাই করেছিলেন ব্রিগেডিয়ার রব নিজেই এবং ফাইনাল করেছিলেন আমার সক্সেগ আলাপ করে Ñ এ সম্মানটুকু আমাকে দিতে তিনি কার্পণ্য করেন নি ঠিকই কিন্তু খুরশিদের নাম অনেকেই জানেন না, আমিও জেনেছিলাম অনেক পরে।
ব্রিগেডিয়ার রব কিন্তু চেয়েছিলেন পাথরের একটা ফলকে এই নামগুলোর মধ্য থেকে কিছু নাম লিখে ওই স্মৃতিসৌধের গায়ে আটকিয়ে দিতে কিন্তু আরডিএর তদানিন্তন চিফ এক্জিকিউটিভ অফিসার (সরকারের একজন আমলা) আফতার উদ্দিনের (সিলেটি) বিরোধিতার কারণে তা আর তিনি করতে পারেন নি। এর জন্য অবশ্য তিনি খুব লজ্জিত হয়েছিলেন কারণ তিনি সগর্বে এ কথা আমাকে জানিয়েছিলেন অনেক আগেই। অবশ্য ফলকে ¯থপতির নাম লেখা আমিও খুব বেশি দেখি নি Ñ এক দেখেছি পুটিয়ার রাজবাড়িতে সেটা অনেক পুরনো, আর দেখেছি চট্টগ্রামে ঢোকার মুখে কর্নেল হাটে সম্প্রতি নির্মিত একটি স্মৃতিসৌধে।
এখানে উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে যে, এই আফতার উদ্দিনের সক্সেগ আমার কিছু মতবিরোধ হয় রঙের ব্যবহার নিয়ে। তিনি চেয়েছিলেন, ইটগুলোকে রঙ করে দিতে যা আমি গ্রহণ করি নি; এবং, এক পর্যায়ে আমাকে কিঞ্চিৎ রূঢ় হতে হয়েছিল যখন তিনি এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে যাচ্ছিলেন। আমি বলেছিলাম যে, একজন ¯থপতি যখন কোনো বিষয়ে অনমনীয় হন তখন তার পেছনে তাঁর শক্ত যুক্তি থাকে। এখন রঙ করতে খরচ হবে চল্লিশ/পঞ্চাশ হাজার টাকা, কিন্তু আমরা চলে যাবার পরেই এর জন্য খরচ হবে তিন লক্ষ টাকা। রঙ করার জন্য যে স্টেজের দরকার হবে তার জন্য বাঁশ কিনতে হবে দেড় লক্ষ টাকার আর দড়ি বানানোর জন্য পাট কিনতে হবে এক লক্ষ টাকার। চল্লিশ হাজার টাকার রঙ লাগানোর জন্য এই বাড়তি আড়াই লক্ষ টাকা কেউ খরচ করতে চাইবে না অথচ এর প্রয়োজন হবে দু-চার বছর পর পর। এ জন্যই মাথার উপরের লাল সূর্য ও তার ভেতরের ম্যাপটি করা হয়েছিল রঙিন মশলা দিয়ে, এর গায়ে রঙ লাগিয়ে দেওয়া হয় নি। এটি ঘুষে-মেজে দিলেই আবার রঙ চকচকে হয়ে যাবে।
১৯৯১ সালের ১৪ ডিসেম্বর নির্মাণ কাজ শেষ করে ১৫ ডিসেম্বর সারাদিন ধরে নির্মাণ সাইট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পরে ১৬ ডিসেম্বর, বিংশতিতম বিজয় দিবসে, স্মৃতি অম্লান উদ্বোধন করেন স্বাধীনতা যু™েধ শহিদ মুক্তিযো™ধা ঠান্ডুর পিতা। এই সি™ধান্তটাও নিয়েছিলেন চেয়ারম্যান সাহেব।
একটা বিষয় পরিষ্কার হয় নি Ñ ¯থাপনাটির নির্মাণ ব্যয় শেষ পর্যন্ত কতো হয়েছিল। না, পাঁচ লাখ টাকাতে হয় নি। আমার হাত দিয়ে খরচ হয়েছিল প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা তার মধ্যে আমার পকেট থেকে গিয়েছিল পঞ্চাশ হাজার Ñ বাকিটা আরডিএ দিয়েছিল। এর মধ্যে যা সাইটে নেই তা হচ্ছে, বাঁশ আর দড়ি বানানোর পাট যার জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা, এবং নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরি যার পরিমাণ প্রায় এক লাখ। এ ছাড়া আরডিএ সরাসরি খরচ করেছিল প্রায় লাখখানেক টাকা টবের উপরে দেওয়ার জন্য পাথর কিনতে। এই হিসাব মতে স্মৃতি অম্লান হয়ে যা দাঁড়িয়ে আছে ভদ্রার মোড়ে তার মূল্য ছয় লাখ টাকা + ডিজাইন ও সুপারভিশনের দাম যা কোনো দিনই দিতে হয় নি।