সড়ক পরিবহন আইন পাস ও তারপরে

আপডেট: July 31, 2020, 1:42 pm

সামসুল ইসলাম টুকু:


যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল গত জুন মাসের সড়ক দুর্ঘটনার উপর খুব ছোট কিন্তু বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট করেছে। ওই রিপোর্টে যে চিত্র উঠে এসেছে তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগজনক। যাত্রী কল্যাণ সমিতি মনে করে সড়ক নিরাপত্তায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও দুর্নীতি ক্রমাগত বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতার অভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বাড়ছে। সরকারের আন্তরিক ও বিগত নির্বাচনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলেও বর্তমানে সরকারের দুটি বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। উন্নত বিশে^র সাথে তাল মিলিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, লাইসেন্স ও গাড়ি ফিটনেস পদ্ধতি ঢেলে সাজানো ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে গত জুন মাসে ৩৫৮টি দুর্ঘটনায় পৌণে চারশত জন নিহত ও প্রায় ছয়শত জন আহত হয়েছে। গড় হিসেব করলে চলতি বছরে কমপক্ষে ৫ হাজার জনের মৃত্যু ও ৭ হাজার জন আহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত বছর ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৭০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২২৭ জন নিহত ও ৭ হাজার জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ চলতি বছরে গত করোনাকালের ৫ মাসে অর্ধেকেরও কম যানবাহন চলেছে অন্যদিকে রাস্তায় পথচারীর সংখ্যাও অর্ধেক ছিলো। তারপরেও ২০২০ সালে দুর্ঘটনা এবং নিহত আহতের সংখ্যা ২০১৯ সালের চেয়ে কমেনি বরং বেড়েছে। রিপোর্টটির আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র হচ্ছে গত জুন মাসের দুর্ঘটনায় নিহতের মধ্যে রয়েছেন ১১৬ জন চালক ও ৪৬ জন পরিবহন শ্রমিকসহ ১৬২ জন এবং বাকি ২১৭ জন পথচারী নারী পুরুষ, শিশু, শিক্ষার্থী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য, ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার এবং আহতদের মধ্যে রয়েছেন ১৬২ জন চালক, ১২৫ জন পরিবহন শ্রমিকসহ ২৮৭ জন এবং বাকি ৩১৩ জন নারী-পুরুষ শিশও ইত্যাদি। এ হিসাব অনুযায়ী নিহত ও আহতদের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি চালক ও পরিবহন শ্রমিক। তাহলে তাদের নিজেদেরই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষার জন্য সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগ একান্তভাবে প্রযোজ্য। বিষয়টি তাদের বেশি করে ভাবা দরকার এবং সড়ক পরিবহন আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে সেটা প্রয়োগের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি না করা। এতে তারা তাদের বেপরোয়া জীবনে শৃঙ্খলা ফিরে আনবে এবং দুর্ঘটনাও কমবে। যান্ত্রিক যান যেহেতু দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে এমন ভাবনা বা দৃষ্ঠিভঙ্গিকে দূর করতে পারলে তাদের সুরক্ষাই মজবুত হবে। এক্ষেত্রে কিভাবে পরিবহন শ্রমিকদের উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে সে পথ খুঁজে বের করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত যে তারাও কম হচ্ছে না। সুতরাং আহত নিহতের সংখ্যা ও ছবিসহ তথ্যটিও তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে প্রতি মাসে মাসে। এ ব্যাপারে যাত্রী কল্যাণ সমিতি, বিআরটিএ ও সরকারকে ভূমিকা নিতে হবে। রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান সৃষ্ট দুর্ঘটনা ৩৫% এবং বাস সৃষ্ট দুর্ঘটনা ২২ শতাংশ। অর্থাৎ বাস ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের দুর্ঘটনা প্রায় ৫৭%। অথচ ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বিআরটিএ-এর দেওয়া রিপোর্ট এই হার ছিলো মাত্র ৪৩ শতাংশ। তাই বাস ট্রাকের দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন পাস হলেও তা প্রয়োগ বা কার্যকর না করার কারণে দুর্ঘটনা না কমে বরং বেড়েছে।
রিপোর্ট দুর্ঘটনার রকম ও স্থান উল্লেখ করা হলেও উল্লেখ করা হয়নি দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ ও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কে বা কারা। সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগের জন্য এ দুটি সমস্যাকে তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করা অতীব জরুরী। এ ধরনের প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগ হবে অযৌক্তিক। বিআরটিএ তথা সরকার কি এ বিষয়ে ভাবছে? যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ফি, লাইসেন্স, টোকেন ট্যাক্স আদায়ে বিআরটিএ’কে যতো ব্যস্ত দেখা যায় ততোটা দেখা যায় না মাঠ পর্যায় পরিবহন নিয়ন্ত্রণে। ফিটনেসবিহীন গাড়িকে ফিটনেস সনদ দিলে যা হয়। তাদের রাস্তায় দেখা মিলে একমাত্র মোবাইল কোর্টের অভিযানের সময়। অথচ বিআরটিএ যে বিষয়গুলো দেখভাল করতে পারে সেগুলো হচ্ছে পরিবহনগুলো সড়কের সাধারণ আইন মানছে কিনা, গতিবেগ ঠিক রাখছে কি না, চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কিনা, ড্রাইভার মাদকাশক্ত কিনা? যাত্রীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কিনা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থদের নায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে কিনা। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে এ সব ব্যাপারে বিআরটিএ’র কোনো ভূমিকাই নেই।
পরিবহন সেক্টরে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের দেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী কি পরিমাণ কি ধরনের যানবাহন দরকার, কতো সংখ্যক সড়ক এবং সেই সড়কের কোথায় কেমন সাইজ দরকার এ বিষয়গুলো নিয়ে সমন্বিত কোনো কাজ হয়েছে বলে আমার জানা নেই। প্রতি বছর উন্নয়ন কর্মসূচীর মধ্যে রাস্তা বাড়ছে, সাইজ বাড়ছে কিন্তু সমস্যা কমছে না। কারণ দূরদর্শী চিন্তা ভাবনার অভাব রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে যানবাহনের সংখ্যা পাগলের মতো বাড়ছে। মাত্র ১০ বছর আগে অর্থাৎ ২০১০ সালে বিআরটিএ’র হিসাব অনুযায়ী বাস ও ট্রাকের সংখ্যা ছিলো যথাক্রমে ২৭ হাজার ও ৮৩ হাজার বা সর্বসাকল্যে ১ লাখ ১০ হাজার। এদিকে ২০১৯ সালে বাস ও ট্রাকের সংখ্যা হয়েছে যথাক্রমে ৪৯ হাজার ও ১ লাখ ৫১ হাজার বা সর্বসাকল্যে ২ লাখ ১০ হাজার। মোটর সাইকেল ছিলো ৭ লাখ ৬০ হাজার আর ২০১৯ সালে হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ। অটোর রিকশার সংখ্যা ছিলো ১ লাখ ২৭ হাজার আর ২০১৯ সালে হয়েছে ৩ লাখ। ২০১০ সালে ছোটবড় সব ধরনের মোটর যানের সংখ্যা ছিলো প্রায় ১৫ লাখ আর ২০১৯ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪২ লাখ। এ ছাড়া অনিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা কম নয়। ২০২০ সালের জুন মাস নাগাদ মোট যানবাহনের সংখ্যা ৪৫ লাখের কম হবে না। মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশে রয়েছে ৪৫ লাখ যানবাহন। অথ্যাৎ প্রতি বর্গ মাইলে ৮০টি মোটর যান রয়েছে। এই সংখ্যা আমাদের দেশের জন্য বিজ্ঞানসম্মত কিনা এবং পরিবেশ উপযোগী কিনা যানবাহন আদমানি অব্যাহত থাকবে কিনা এগুলো নিয়ে ভাববার সময় এসেছে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও এখনই।
গত বছর ১ নভেম্বর থেকে বহুল আলোচিত এবং দেশবাসীর বহু আকাঙ্খিত সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হওয়ার কথা ছিলো। তদনুযায়ী সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরীক্ষামূলকভাবে এই আইন কার্যকর করার চেষ্টাও হয়। কিন্তু পরিবহন সেক্টর বিভিন্নভাবে বাধা দিতে থাকে। এমনকি সারাদেশে পরিবহন বন্ধ করে জনসাধারণকে জিম্মি করে দেশ অচল করার হুমকি দেয়। এমন একটা পর্যায়ে সরকার কোনো ঝুঁকি নিতে পারেনি। ফলে পাস করা আইনটি অকার্যকর হয়ে রয়েছে। তবে এটাও সত্য যে বর্তমান সরকারই সকল ঝুঁকি মাথায় নিয়ে আইনটি সংসদে পাস করে। তবে এই আইনটির কিছু সংশোধন হতে পারে বলে শোনা যায়।
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় ২ জন কলেজ ছাত্র বাস চাপায় নিহত হলে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা তীব্র আন্দোলন শুরু করে। শুধু তাই নয় শিক্ষার্থীরা পথে নেমে এসেছিলো এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয় এবং সফলভাবে তা সম্পন্ন করে দেখিয়ে দিয়েছিলো যে যানজট নিয়ন্ত্রণসহ আইন অমান্যকারীদের শাস্তি দেওয়া যায়। এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছার। সেদিন পরিবহন শ্রমিকরাও শিক্ষার্থীদের এই কার্যক্রম মানতে বাধ্য হয়। যাই হোক ছাত্রদের ওই আন্দোলনের মুখে সরকার ২০১৮ সালের আইনটিকে আরো কঠোর করে সংসদে পাস করে। কিন্তু সড়ক পরিবহন শ্রমিকরা অচল অবস্থা সৃষ্টি করে। এটা তাদের পুরোনো বদঅভ্যাস, জনসাধারণকে জিম্মি করা, দুর্দমনীয় শক্তি হিসেবে প্রদর্শন করা। এই অশুভ শক্তিটি এই অগণতান্ত্রিক ও জনবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ন হয়। এরশাদ সরকারের পতনের অন্যতম কারণ ছিলো এই আইনটি পাস করা। সে সময় অবশ্য প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এরশাদের ওই গণমুখী উদ্যোগকে সমর্থন করেনি।
বর্তমান পরিস্থিতি কিন্তু ভিন্ন। এ সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার এমনকি এই আইনকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের কোনো বিরোধীতা নেই। সেহেতু এমন সময়ে এ আইন বাস্তবে কার্যকর করতে না পারলে পরিবহন সেক্টর আরো বেপরোয়া হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। আর এভাবে যদি পরিবহন সেক্টর ও ঋণখেলাপীদের হাতে সরকার জিম্মি হয়ে যায়, তাদের আইনের আওতায় আনতে না পারে বরং পুনর্বাসন করতে হয় তাহলে আরো বহু সংস্থা আইন অমান্য করতে উৎসাহিত হবে। গত বারো বছরে এ সরকার বিডিআর বিদ্রোহ দমন করেছে, জঙ্গিদের দমন করেছে, হেফাজতীদের দমন করেছে, ক্যাসিনো সিন্ডিকেটদের আইনের আওতায় এনেছে, দুর্নীতিবাজদের আইনী প্রক্রিয়ায় আনা হচ্ছে, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতি উদঘাটন করেছে এবং বিজয়ের স্বাক্ষর রেখেছে। দেশবাসী বিশ^াস করে পরিবহন সেক্টর ও ঋণ খেলাপীদের এ সরকারই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
লেখক : কলামিষ্ট