সড়ক প্রশ্বস্তকরণের নামে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে অর্ধ শতবর্ষী দুই হাজার গাছ

আপডেট: অক্টোবর ৫, ২০১৯, ১:১৬ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব


কাঁশিয়াডাঙ্গা থেকে আমনুরা সড়কে এভাবেই কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ-সোনার দেশ

বর্তমানে সড়কের কোনস্থানে ৫.৫ মিটার ও কোনস্থানে ৩.৭ মিটার চওড়া রয়েছে। যেখানে ৫.৫ মিটার চওড়া আছে তা বহাল রেখে ৩.৭ মিটার চওড়াকে ৫.৫ মিটার চওড়ায় বর্ধিত করে রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা থেকে আমনুরা পর্যন্ত ৩৬ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ শুরু হয়েছে। আর এইজন্য সড়কের দুই পাশে থাকা মূল্যবান দুই হাজারের অধিক অর্ধ শতবর্ষী গাছ নির্বিচারে কাটা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রশস্তকরণের পরও সড়কের কোনোস্থানে বর্তমানে যে চওড়া আছে তাই বহাল থাকবে আর কোনোস্থানে মাত্র দেড় মিটার চওড়া বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ যেখানে সড়কের উভয়পাশে দেড় মিটার চওড়া বৃদ্ধি পাবে সেখানে এক পাশে বৃদ্ধি পাবে মাত্র শুন্য দশমিক ৯ মিটার। অথচ সড়কের যেখানে চওড়া ৫.৫ মিটার আছে সেসব স্থানের ধার থেকেও এক মিটার দূরের গাছ কাটা হচ্ছে। এনিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় এলাকাবাসীর।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাশিয়াডাঙ্গা থেকে দামকুড়া হাট সড়কের বিন্দারামপুরে একদল শ্রমিক গাছ কাটছেন। সেখানে দেখা যায়, সড়কটি চওড়ায় ৫.৫ মিটার থাকলেও তার ধার থেকে এক মিটার দূরে ৮৭ নম্বর গাছটি থাকা সত্ত্বেও সেটা কাটা হচ্ছে। একইভাবে ৮৮, ৮৯, ৯০ ও ৯১ নম্বরের গাছগুলো সড়ক থেকে দূরে থাকলেও সেসব কাটা হচ্ছে।
এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেন, সড়কের উভয়পাশে তিন ফুট করে মোট ছয় ফুট চওড়া করা হবে বলে শুনছি অথচ সড়কের ধার থেকে দূরে থাকা অনেক গাছ কাটা হচ্ছে। সেসব গাছ না কাটলেও সড়ক প্রশস্ত করা যেত।
বিন্দারামপুর গ্রামের মোখলেসুর রহমান বলেন, দেখেন, সড়ক থেকে কত দূরে রয়েছে গাছটি তবু সেই গাছটিও কাটা হচ্ছে।
হুরাইরা নামের আরেকজন স্থানীয় এলাকাবাসী বলেন, এই সড়কের দুই পাশে কত গাছ ছিলো। সব গাছ কেটে সাবাড় করে ফেলা হলো!
বিন্দারামপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বয়সি আব্দুর রশিদ ও হাসান আলী জানান, এইসব গাছের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে। কোনো কোনো গাছের বয়স পঞ্চাশ বছরের বেশি। আমাদের বোঝ-শক্তি হওয়ার পর থেকেই গাছগুলো দেখছি। সড়ক থেকে কত দূরে রয়েছে তারপরও সেগুলো কাটা হচ্ছে।
রাজশাহীর সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সামসুজ্জোহা বলেন, সড়কটি মোট ৫.৫ মিটার চওড়া করা হলেও তারপরও অনেক জায়গা লাগে। সড়ক মজবুতকরণ ও ঢালুকরণে এই জায়গা লাগে। তাই সড়কের দুই ধারের প্রায় দুই হাজারের বেশি গাছ কাটা হচ্ছে। গাছ রাখার সুযোগ থাকলে অবশ্যই গাছ রাখতাম। আর সড়ক প্রশস্তকরণের পর তো আবার পর্যাপ্ত গাছ লাগানো হয়।
রাজশাহীর সড়ক ও জনপথ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা পর্যন্ত প্রায় ৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে এই ৩৬ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ করা হচ্ছে। বর্তমানে সড়কটির কোনোস্থানে ৩.৭ মিটার চওড়া ও কোসোস্থানে ৫.৫ মিটার চওড়া রয়েছে। প্রশস্তকরণের পর তা ৫. ৫ মিটার চওড়ায় দাঁড়াবে। ইতোমধ্যে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১২ কিলোমিটার করে মোট ৩৬ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে এবছরের মার্চ ও মে মাসে।
রাজশাহী বিভাগের সড়ক ও জনপথ অধিদফতর-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আলী ইউনুস বলেন, আমাদের দেশের সড়ক তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও জেলা সড়ক। কাশিয়াডাঙ্গা থেকে আমনুরা পর্যন্ত জেলা সড়কের আদলে নির্মিত হবে।
এদিকে, সড়কের দুই পাশের মূল্যবান অর্ধ শতবর্ষী গাছগুলো কাটা হলেও নেয়া হয়নি পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সাত বছরের আগের মূল্যেই কম দামে গাছগুলো বিক্রি করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট অধিদফতর।
এর মধ্যে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) তাদের ৭৯০টি ও বনবিভাগ তাদের ৭৫২ টি গাছের মধ্যে বেশিরভাগ গাছ কেটে নিয়েছে। জেলা পরিষদ মালিকানাধীন গাছগুলোও কাটা পড়েছে। কাশিয়াডাঙ্গা থেকে দামকুড়াহাট পর্যন্ত সড়ক ও জনপথ বিভাগের থাকা গাছগুলোও কাটা পড়ছে। তাদের গাছ রয়েছে ৬৬৩ টি।
সোমবার দুপুরে কাশিয়াডাঙ্গা থেকে দামকুড়াহাট পর্যন্ত গিয়ে দেখা যায় সেসব গাছও কাটা চলছে। গাছগুলোর বেশিরভাগই কড়ই। তবে আম, বাবলাসহ অন্য কয়েকটি প্রজাতির গাছও রয়েছে। প্রতিদিন দুইটি গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রায় ৫০ জনের মতো শ্রমিক গাছ কাটছেন।
তাদের একজন জানান, তিনি ৩৯ দিন ধরে গাছ কাটার কাজ করছেন। গোদাগাড়ীর কদম শহর নামক জায়গা থেকে তারা গাছ কাটা শুরু করেছেন। সড়কের পাশের সাত আট কিলোমিটার এলাকার গাছ তারা কেটেছেন বলে ধারণা তার।
আরেক শ্রমিক জানান, তারা দুইটা গ্রুপে কাজ করছেন। এক গ্রুপে আছে ২৫ জন শ্রমিক ও আরেক গ্রুপে রয়েছে ২০ জন। তবে এই সংখ্যাটি কখনো বাড়া-কমা হয়। তারা সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৫০০ টাকা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাত বছর আগের মূল্য তালিকায় পরিশোধ করা হচ্ছে এসব গাছের দাম। অভিযোগ রয়েছে, ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ স্বাক্ষরিত এক চিঠির সার্ভে মূল্য অনুযায়ী গাছগুলোর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী বৃক্ষপালনবিদ কৃষিবিদ ড. জাহাঙ্গীর ফিরোজ বলেন, সড়কটিতে বিএমডিএ, বনবিভাগ, জেলা পরিষদ ও আমাদের গাছ রয়েছে। সবাইকে চিঠি দিয়ে গাছগুলো কেটে নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। আমাদের গাছগুলোও ওপেন টেন্ডার আহ্বান করে বিক্রি করা হয়েছে। আমাদের ৬৬৩টি গাছের সরকারি মূল্য সর্বনিম্ন ৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৪ টাকা হলেও উন্মুক্ত দরপত্রের কারণে গাছগুলো ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পূর্বের নির্ধারিত দামে গাছ বিক্রি হলেও উন্মুক্ত দরপত্রের কারণে তার প্রায় তিনগুণ দাম বেশি পাওয়া গেছে।
সামাজিক বনবিভাগ পবা উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন জানান, গোদাগাড়ীর ছোট নারায়ণপুর থেকে মাকরান্ধা পর্যন্ত দুই কিলোমিটার সড়কে আমাদের ৭৫২ টি গাছ ছিলো। গাছগুলো সবই ২০০০ সালের দিকে লাগানো। সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য এবছরের জানুয়ারি মাসে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে গাছগুলো সাতটি স্লটের মাধ্যমে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি স্লটের গাছ কাটা হয়েছে। আর দুইটা স্লটের গাছ কাটার রয়েছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুর রশিদ বলেন, ৭৯০ টি গাছের প্রাক্কলিত মূল্য ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৪৪ টাকা হলে বিক্রি করা হয়েছে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৫০০ টাকায়।
এদিকে গাছ কাটার বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর থেকে কোনো ছাড়পত্র নেয়া হয়নি বলে জানান উপপরিচালক মামুনুর রশিদ।
কিছুদিন আগেও কাশিয়াডাঙ্গা থেকে দামকুড়া হাটের সড়কটি ঘুরতে যেতেন শহরের বাসিন্দারা। সড়কের দুই ধারের লম্বা লম্বা গাছগুলো দেখতে খুবই দৃষ্টিনন্দন ছিলো । প্রচণ্ড ছায়া দিতো এলাকাবাসীকে। আর সেই জায়গা এখন বিস্তীর্ণ, বৃক্ষশূন্য।
পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ দ্য নেচার অ্যান্ড লাইফের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের আসলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই। যখন যা ইচ্ছা হচ্ছে করছি। দেখা যাচ্ছে গাছ লাগানো হচ্ছে আবার ২০ বছর পর সেই গাছ কাটা হচ্ছে। এর আগে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক প্রশস্তকরণের জন্য হাজার হাজার গাছ কাটা হয়েছে। একদিকে গাছ রেখে আরেকদিকে যদি সড়ক প্রশস্ত করা যেত তাহলে ভালো হতো। আমরা অনেক আন্দোলনও করেছি কিন্তু খুব একটা কাজ হয় না।