হত্যা মামলার আসামি রবিউল যেভাবে দুবাইতে স্বর্ণ ব্যবসায়ী আরাভ খান

আপডেট: মার্চ ১৮, ২০২৩, ১:৩৪ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক :


পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) পরিদর্শক মামুন এমরান খান হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আরাভ খান ওরফে রবিউল ইসলাম এখন দুবাইয়ের বড় স্বর্ণ ব্যবসায়ী। তিনি দুবাইতে ‘আরাভ জুয়েলার্সের’ মালিক।
সম্পদের এই পাহাড় গড়েছেন মাত্র পাঁচ বছরে। বিষয়টি অনেকটা আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে রাতারাতি টাকার কুমির হওয়ার মতো।

এ বিষয় নিয়ে আসামি আরাভ খান ওরফে রবিউল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে এক ব্যক্তির কথোপকথনের একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই রেকর্ডে পুলিশের এক সাবেক কর্মকর্তাসহ ৩ জনের নাম উঠে এসেছে। এই নামগুলো কীভাবে বা কী কারণে উঠে এসেছে তার কোনো ব্যাখ্যা এই ভিডিওতে পাওয়া যায়নি।

গত কয়েকদিন আগে দুবাইতে তার জুয়েলারি দোকান উদ্বোধনে গিয়েছিলেন দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকা সাবিক আল হাসান, অনলাইন ভিডিও কনটেইন ক্রিয়েটর হিরো আলমসহ অনেকে। ওই জুয়েলারি শপ উদ্বোধনের ঘটনায় একে একে আরভ খানের নানা অপকর্মের খবর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

যদিও এ বিষয়ে গত ১৬ মার্চ বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে আরাভ খান নিজের ফেসবুক পেজে এক লাইভে বলেন, আমি খুনের ঘটনায় জড়িত ছিলামই না। জড়িত থাকলে এখনই পালিয়ে যেতাম। খুন হয়েছে আমার অফিসে। এ জন্য বিচার হলে মাথা পেতে নেব আমি। আল্লাহ যেটা কপালে রাখছে সেটা হবে। আমার অফিসে মার্ডার হয়েছে এটার যদি কোনো সাজা বা বিচার হয়ে থাকে সেটা মাননীয় আদালত আমার বিচার করবে। আমি মাথা পেতে নেব। যতটুক অপরাধ করেছি ততটুক সাজা হোক এটা চাই।

এদিকে, তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পুলিশ সদস্য হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত এই পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ভাবতে শুরু করেছে। আরাভ খানকে ফেরত আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাইতে ইতোমধ্যে তোড়জোড় শুরু করেছে তারা।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, আমাদের পুলিশের একজন মেধাবি কর্মকর্তাকে (পরিদর্শক মামুন) হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয়,তার মরদেহটি যেন না পাওয়া যায়, তাই গাজীপুরের কালীগঞ্জের জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিল। ডিবি এ ঘটনার তদন্ত করেছে।

আসামি আরাভ খান ওরফে রবিউল ইসলাম পালিয়ে গেলেও নকল একজন আসামি জেলখানায় দেয় সে। পরবর্তীতে ডিবির তদন্তে নকল আসামির ঘটনা সামনে আসে। এরমধ্যে মূল আসামি দুবাইয়ে স্বর্ণের দোকানের মালিক রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খান ভারতে পালিয়ে যায়। সেখানে তিনি ভারতীয় পাসপোর্টে দুবাই যান- যোগ করেন তিনি।

এই ডিবি কর্মকর্তা বলেন, তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১২টি ওয়ারেন্ট রয়েছে। মামলা রয়েছে, চার্জশিট রয়েছে। ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলাপ করে ইন্টারপোলের সহয়তায় রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রবিউল ইসলাম হয়ে গেলেন আরাভ খান: তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার আশুতিয়া গ্রামের দিনমজুর মতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে রবিউল ইসলাম ওরফে সোহাগ মোল্লাই আরাভ খান। মতিয়ার রহমান মোল্লা একসময় চিতলমারী উপজেলায় ফেরি করে সিলভারের হাঁড়িপাতিল বিক্রি করতেন। ১৯৮৮ সালে রবিউল ইসলামের জন্ম হয়। গ্রামের বেশিরভাগ লোক তাকে সোহাগ মোল্লা নামেই ডাকতেন। ২০০৫ সালে চিতলমারী সদরের একটি বিদ্যালয় থেকে সে এসএসসি পাস করে। অভাবের কারণে তার লেখাপড়া আর এগোয়নি। ২০০৮ সালে চিতলমারী থেকে ঢাকা আসে রবিউল ইসলাম।

২০১৮ সালের ৭ জুলাই পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) পরিদর্শক মামুন এমরান খান হত্যাকাণ্ডের আসামি এই রবিউল ইসলাম ওরফে সোহাগ মোল্লা। রাজধানীর বনানীতে তার অফিসে এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল। এরপর সে পালিয়ে ভারতে চলে যায়। ভারতের কোলকাতার নারায়ণপুর বস্তিতে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে আত্মগোপন করে। সেখানে বিয়েও করে রবিউল ইসলাম ওরফে সোহাগ মোল্লা।

এরপর ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরি করে। সেই পাসপোর্ট দিয়েই পাড়ি জমায় দুবাইয়ে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দুবাইয়ের বড় স্বর্ণ ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে পুলিশ সদস্য হত্যার আসামি রবিউল ইসলাম ওরফে সোহাগ মোল্লা ভারত থেকে দুবাইতে গিয়ে হয়ে গেছে স্বর্ণ ব্যবসায়ী আরাভ খান।

দুবাইয়ে আরাভের যত সম্পদ: আরাভ খান দুবাইয়ে ‘আরাভ জুয়েলার্স’ এর মালিক। তার ওই দোকানে রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণের মজুত রয়েছে। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা টাওয়ারের ৬৫ তলায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের (নম্বর ৬৫১০) মালিক আরাভ। এছাড়াও দুবাই শহরে আরও ৪-৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। বাগান ও সুইমিংপুলসহ একটি ডুপ্লেক্স বাড়িও বানিয়েছেন তিনি। বিলাসবহুল একাধিক সব গাড়িও রয়েছে তার।

আরাভ জুয়েলার্সের উদ্বোধন উপলক্ষে ৬০ কেজি সোনা দিয়ে বানানো হয়েছে বাজপাখির আদলে একটি লোগো। আড়াই মাস সময়ে এই লোগো তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
নির্যাতন করে পুলিশ পরিদর্শককে হত্যা: পুলিশের স্পেশাল ব্র্রাঞ্চের (এসবি) পরিদর্শক মামুন এমরান খান ২০১৮ সালের ৭ জুলাই রহমত উল্লাহ নামের এক ব্যক্তির আমন্ত্রণে রাজধানীর বনানীর একটি বাড়িতে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন।

সেখানে তাকে ‘ব্ল্যাকমেল‘ করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, এই ঘটনায় পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, মামুনকে ফাঁদে ফেলে বনানীর ওই বাসায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে বেঁধে, স্কচটেপ দিয়ে মুখ আটকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। এক একপর্যায়ে পরিদর্শক মামুন মারা যান। পরে তার মরদেহ গুম করতে গাজীপুরের কালীগঞ্জে জঙ্গলে ফেলে দেয় হত্যাকারীরা। পরে সেখান থেকে মামুনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওই হত্যাকাণ্ডে রহমত উল্লাহ, রবিউল ইসলাম, সুরাইয়া আক্তার কেয়া, স্বপন সরকার, দিদার পাঠান, মিজান শেখ, আতিক হাসান, সারওয়ার হোসেন, মেহেরুন্নিসা ওরফে স্বর্ণা ও ফারিয়া বিনতে মাইসাকে আসামি করে বনানী থানায় হত্যা মামলা করে মামুনের পরিবার।

তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ এ মামলায় রহমত উল্লাহ এবং রবিউল ইসলাম ওরফে আপন ওরফে সোহাগ ওরফে হৃদয় ওরফে হৃদিসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। সেখানে রবিউল ইসলামকে পলাতক উল্লেখ করা হয়। পরে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।- বাংলানিউজ