হাইকোর্টের ক্ষোভ ডিসিরা আদেশ মানেন না, নিজেরা রাজত্ব কায়েম করেছেন

আপডেট: মে ২৯, ২০২৩, ১২:২৫ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক :


দফায় দফায় সময় দেওয়ার পরও বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদী দখলমুক্ত করে প্রতিবেদন না দেওয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ডিসিরা নিজেরা রাজত্ব কায়েম করেছেন। তারা আদালতের আদেশ মানেন না। তাহলে এ আদেশ দিয়ে কী লাভ?

এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য শুনানির নির্ধারিত দিনে রোববার (২৮ মে) সংশ্লিষ্ট ডিসির পক্ষে সময় আবেদন করলে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ কথা বলেন।

এদিন আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে সময় আবেদন করেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জুলফিয়া আক্তার।
জুলফিয়া আক্তার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ডিসির পক্ষে আবারও সময় চেয়ে আদালতকে বলেন, আমাদের সময় দিন, আমরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করবো।

এসময় রিটকারীপক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আদেশ নিয়ে ডিসিরা এক ধরনের খেলা করেন। তখন আদালত বলেন, যা দেখবেন তাই তো শিখবেন। সচিবরাও তো তা-ই করেন। আদালত অবমাননার হাজার হাজার মামলা পড়ে আছে। পরে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে আগামী ১৮ জুন দিন ধার্য করেন আদালত। মনজিল মোরসেদ বলেন, আমরা তাহলে কোথায় যাব?

আদালত বলেন, আপনারা কনটেম্পট (আদালত অবমাননা) কোর্টে যান। মনজিল মোরসেদ বলেন, আদালতের আদেশ মানাতে হলে সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা (আদালত অবমাননা সংক্রান্ত) চর্চা করতে হবে। সেটা না করলে আইনের শাসন থাকবে না। জনগণও কোনো বিচার পাবে না। রাষ্ট্র কলাপস করলে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এসময় হাইকোর্ট রাষ্ট্রপক্ষের কাছে প্রতিবেদন না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমাদের সর্বশেষ আরও একটু সময় দিন। এসময় মনজিল মোরসেদ পাশ থেকে বলেন, পাঁচ বছর চলছে। তখন আদালত বলেন, সাইড টক করছেন কেন? আপনি সিনিয়র আইনজীবী। আপিনও বোঝেন-জানেন দেশের পরিস্থিতি, আদালতের অবস্থা। তারা (রাষ্ট্রপক্ষ) চেষ্টা করে।

সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল শেষবারের মতো সময় চাইলে হাইকোর্ট বলেন, আপনি যদি একশ বছরও সময় নেন লাভ হবে না। দেশ এটাই, এখানেই থাকতে হবে। লুট করে আমেরিকা নিয়ে যাবেন, সব রেখে দেবে। তাই পরিবেশটা ঠিক রাখতে বলেন। শুনানি ও আদেশের জন্য আগামী ১৮ জুন তারিখ রাখলাম। জেলা প্রশাসককে ভালো করে বুঝিয়ে বলেন। সম্মানের জায়গাটা ঠিক রাখতে বলবেন। না হলে জবাব দিতে হবে।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, সন্ধ্যা নদীতে মাটি ভরাট করে গুচ্ছগ্রাম দখল করা হচ্ছিল। বিষয়টি আমরা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলাম। হাইকোর্ট অনেকগুলো নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। তারা প্রতিবেদন না দেওয়ায় পাঁচ বছর পর আদালতে আবেদন করেছিলাম। রোববার প্রতিবেদন দেওয়ার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু প্রতিবেদন না দেওয়ায় আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপক্ষ সময় চেয়েছে।

আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে তিনি বলেন, গুচ্ছগ্রামের স্থাপনা অপসারণ করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল। যাদের সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাদের সরকারি জমিতে অন্য কোথাও বরাদ্দ দিতে নির্দেশনা ছিল। বরিশালের যত নদ-নদী আছে, সেগুলো যেন দখল না হয়, সেজন্য মনিটরিং টিম গঠন করতে বলা হয়েছিল।

এছাড়া অবৈধ মাটি ভরাট উচ্ছেদ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেসব আদেশ বাস্তবায়ন করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু জেলা প্রশাসক আদেশ অমান্য করে প্রতিবারই সময় নিচ্ছেন।
এর আগে বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর জায়গা ভরাট করে সরকারের আবাসন প্রকল্পের কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করে কয়েক দফা নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। পরিবেশ আইনের ৭ ধারা অনুসারে মাটি ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে (ডিজি) নির্দেশ দেন আদালত।

২০০৯ সালের ৩১ মে হাইকোর্ট রুল জারি করে নদী ভরাটের ওপর স্থিতাবস্থার আদেশ দেন। তখন হাইকোর্ট শুনানি শেষে রায়ে রুলের শুনানিতে নিম্নোক্ত নির্দেশনাসমূহ প্রদান করেন।
১। সন্ধ্যা/কৃষ্ণকাঠি নদীর সিএস এবং আরএস অনুসারে তিন মাসের মধ্যে জরিপ সম্পাদন করে অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করতে বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছেন।
২। ০৪ (চার) মাসের মধ্যে নদীর জায়গায় মাটি ভরাট/দখল/স্থাপনা অপসারণ/উচ্ছেদ করার নির্দেশ।
৩। আইন অনুযায়ী উক্ত প্রকল্পে যেসব গরিব লোকদের আবাসনের প্রস্তাব ছিল তাদের অন্য সরকারি জমিতে পুনর্বাসনের নির্দেশ।
৪। নদীর জায়গায় ‘কাজলাহার আশ্রয়ণ’ প্রকল্প গ্রহণ ও কার্যকরী করাকে অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।
৫। আইন ভঙ্গ করে নদীর জায়গায় মাটি ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে পরিবেশ আইনের ৭ ধারা অনুসারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ।
৬। সন্ধ্যা নদীর প্রকৃত সীমানা সংরক্ষণে বিবাদীদের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।
৭। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনকে নদীরক্ষায় মনিটরিং কমিটি করে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।
এর আগে বরিশালের সন্ধ্যা নদী ভরাট করে আবাসন প্রকল্প তৈরির সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে জনস্বার্থে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন।
তথ্যসূত্র: জাগোনিউজ