হাইমাদ্রাসা: পশ্চিমবঙ্গে বাড়ল পাশ, মেধাতালিকায় অমুসলিমও

আপডেট: জুলাই ১৭, ২০২০, ৪:৪০ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক:


অমুসলিম পরীক্ষার্থী বাড়ার পাশাপাশি হাইমাদ্রাসার সেরা দশের মেধাতালিকায় জায়গা করে নিল এক অমুসলিম পড়ুয়া। যা সাম্প্রতিক অতীতে ঘটেনি। একই সঙ্গে হাইমাদ্রাসায় এবছর প্রথম দুটি স্থান দখল করেছে ছাত্রীরা। এ ঘটনাও বিগত বেশ কয়েক বছরে ঘটেনি বলে জানিয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে এবছরের হাইমাদ্রাসা, আলিম ও ফাজিল পরীক্ষার ফল। তিনটি পরীক্ষাতেই পাশের হার বেড়েছে। মাধ্যমিকের মতো হাইমাদ্রাসার মেধাতালিকাতেও ঠাঁই মেলেনি কলকাতার কোনও পড়ুয়ার।
এবছর সব মিলিয়ে হাইমাদ্রাসা (দশম) পরীক্ষা দিয়েছিল ৫১ হাজার ১৩৬ জন ছাত্রছাত্রী। পাশ করেছ ৮৬.১৫ শতাংশ। গতবছর পাশ করেছিল ৮৩.২০ শতাংশ। আলিম (দশম) পরীক্ষা দিয়েছিল ৯ হাজার ২৩৩ জন। পাশের হার ৮৮.৫৬ শতাংশ। গতবছর ছিল ৮৪.৯৫ শতাংশ। ফাজিল (দ্বাদশ) দেয় ৪ হাজার ৮১ জন। পাশ করেছে ৮৯.৫৬ শতাংশ। গতবছর পাশ করেছিল ৮৭.৪৯ শতাংশ। ফাজিল ছাড়া বাকি দুটি পরীক্ষাতেই ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি। সংখ্যায় বেশি হলেও পাশের হারে এগিয়ে ছাত্ররা। ৭৭১ পেয়ে হাইমাদ্রাসায় প্রথম হয়েছে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর মনিরিয়া হাইমাদ্রাসার ছাত্রী নাফিসা খাতুন। ৭৬৯ পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছে মালদার বটতলা আদর্শ হাইমাদ্রাসার তামান্না ইয়াসমিন। বীরভূমের খ-গ্রাম ডিএস হাইমাদ্রাসার ছাত্র জগন্নাথ দাস ৭৬০ পেয়ে ষষ্ঠ হয়েছে।
প্রতিবছরই হাইমাদ্রাসা পরীক্ষায় অমুসলিম পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়ছে। গত বছর এই পড়ুয়ার সংখ্যা ছিল ১১.৭৫ শতাংশ। এবছর যা বেড়ে হয়েছে ১২.৫২ শতাংশ। এবছর ৫ হাজার ৭৩৮ জন অমুসলিম পড়ুয়া পরীক্ষা দিয়েছে। পাশ করেছে ৪,৬৮১ জন। পাশের হার ৮১.৫৮ শতাংশ। যা গতবারের তুলনায় ১.৫ শতাংশ বেশি। সংখ্যা বাড়া এবং মেধাতালিকায় অমুসলিম পড়ুয়ার জায়গা করে নেওয়া নিয়ে পর্ষদের সভাপতি আবু তাহের কামরুদ্দিন বলেন, ‘হাইমাদ্রাসা পরীক্ষা মাধ্যমিকের সমতুল। মাদ্রাসাগুলিতেও এখন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে পড়ানো হয়। পরিকাঠামোগত দিক দিয়ে স্কুলের সঙ্গে মাদ্রাসার কোনও ফারাক নেই। এই কারণেই বাড়ি থেকে স্কুল দূরে আর মাদ্রাসা কাছে হলে মাদ্রাসাতেই ছেলেমেয়েদের ভর্তি করছেন অনেক অমুসলিম অভিভাবক। শুধু পড়ুয়া নয়, মাদ্রাসাগুলিতে যে শিক্ষক–শিক্ষিকারা পড়ান তাঁদের ৬০ শতাংশই অমুসলিম।’
প্রথম দুটি স্থান দখলের সঙ্গে এবছরের হাইমাদ্রাসার মেধাতালিকায় ১৩ জনের মধ্যে ৬ জনই ছাত্রী। আলিম এবং ফাজিলের মেধাতালিকাতেও রয়েছে ছাত্রীদের উজ্জ্বল উপস্থিতি। তিনটি পরীক্ষা মিলিয়ে ছাত্রদের সংখ্যা যেখানে ২১ হাজার ৯৬৬, সেখানে ছাত্রীদের সংখ্যা ৪২ হাজার ৪৮৪। এ নিয়ে পর্ষদ সভাপতি বলেন, ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প যেমন রয়েছে, তেমনি আমাদের নিজস্ব ‘মীনামঞ্চ’–এর কাজকর্মও রয়েছে। মাদ্রাসায় ছাত্রীদের স্কুলছুট প্রায় শূন্য। সর্বোপরি সব স্তরেই সচেতনা বেড়েছে।’
রাজ্যে মোট মাদ্রাসার সংখ্যা ৬১৫। কলকাতায় রয়েছে ৬টি মাদ্রাসা। ৪১১ জন পরীক্ষা দিয়েছিল। শুধু এবছরই নয়, বিগত বছরেও মেধাতালিকায় কলকাতার পড়ুয়াদের দেখা যায় না। এ নিয়ে সভাপতি বলেন, ‘মাদ্রাসার সংখ্যা কম একটা কারণ। এছাড়া অভিভাবকদের মধ্যে বেসরকারি স্কুলে পড়ানোর প্রবণতাও কলকাতায় বেশি।’
মাধ্যমিকের মতো মাদ্রাসার পরীক্ষাতেও জেলাভিত্তিক পাশের হারে এগিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর। হাইমাদ্রাসায় এই জেলার পাশের হার ৯৭.২৯ শতাংশ। আলিমে এই জেলার পাশের হার ১০০ শতাংশ। ফাজিলে এগিয়ে কোচবিহার। পাশের হার ৯৬.১৫ শতাংশ।
মাদ্রাসার পরীক্ষাগুলির মার্কশিট দেওয়া হবে ২০ থেকে ২২ জুলাই। মাধ্যমিকের মতো এখানেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে অভিভাবকদের হাতে মার্কশিট দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট পড়ুয়ার অ্যাডমিট কার্ড এবং রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট দেখিয়ে অভিভাবকরা মার্কশিট নেবেন। একাদশে ভর্তি প্রক্রিয়া কবে থেকে শুরু হবে তা দু–একদিনের মধ্যে পর্ষদের ওয়েবসাইটে জানানো হবে। স্ক্রুটিনি এবং রিভিউ সংক্রান্ত খবরও দু–একদিনের মধ্যে জানানো হবে।
ডাক্তার হতে চায় নাফিসা, তামান্না
বাবা রাজমিস্ত্রি। মা বিড়ি শ্রমিক। কোনওরকমে ডাল ভাত খেয়ে দিন গুজরান। এমনই অভাবের ঘর থেকে হাইমাদ্রাসার পরীক্ষায় প্রথম স্থান দখল করেছে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের নাফিসা খাতুন। ৮০০–র মধ্যে নাফিসা পেয়েছে ৭৭১। জঙ্গিপুরের মুনিরিয়া হাইমাদ্রাসার ছাত্রী সে। দ্বিতীয় মালদার রতুয়া থানার ভাদো গ্রামের তামান্না ইয়াসমিন। তামান্না পেয়েছে ৮০০–র মধ্যে ৭৬৯। বাট্টালা আদর্শ হাইমাদ্রাসার ছাত্রী সে। তৃতীয় হয়েছে লালগোলার সাহিদ আক্তার। তার প্রাপ্ত নম্বর ৭৬১। বৃহস্পতিবারই মাদ্রাসা বোর্ডের আলিম পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। প্রথম হয়েছে মুর্শিদাবাদের দৌলতাবাদের আসাদুল্লাহ আল গালিব। ৯০০–র মধ্যে গালিব পেয়েছে ৮২৩। সে সুলতানপুর খুনিয়াপুকুর হাইমাদ্রাসার ছাত্র।
প্রথম হওয়া নাফিসার বাড়ি জঙ্গিপুরের ছোটকালিয়া গ্রামে। বাবা তোয়াব শেখ রাজমিস্ত্রি। মা জোসেনুর বিবি বিড়ি শ্রমিক। তিন ভাই–বোনের মধ্যে নাফিসা সবার ছোট। কষ্টে চলা সংসার থেকে মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে চোয়াল শক্ত করে প্রতিজ্ঞা করেছিল নাফিসা, নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। তারজন্য পড়ায় ভাল ফল করতে হবে। এদিন ফল বেরতেই স্কুল থেকে ফোন করে শিক্ষকরা জানান, নাফিসা রাজ্যে প্রথম। বিশ্বাস করতেই পারেনি একরত্তি মেয়েটি। রাজমিস্ত্রি বাবা তোয়াব বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে মেয়ে পড়ে। আমি চাই আরও পড়ুক, ওকে আমি পড়াব।’ মা জোসেনুর বিবি বলেন, ‘কোনওদিন মেয়েটাকে দুধ, মাছ দিতে পারিনি। আলু সেদ্ধ আর ভাত খেয়েও স্কুলে গেছে।’ আর নাফিসা বলেন, ‘আমার ইচ্ছে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার। তারপর ডাক্তার হতে চাই।’ এলাকার মন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, ‘নাফিসা আমাদের গর্ব। ওর পাশে আমরা আছি। যে–কোনও ধরনের সাহায্য করা হবে।’ দ্বিতীয় তামান্নার বাবা মনসুর আলম ওষুধ ব্যবসায়ী। মা আঞ্জুরা খাতুন গৃহবধূ। ৪ ভাই–বোনের মধ্যে বাড়ির বড়। তার প্রিয় বিষয় অঙ্ক। বিজ্ঞান নিয়ে আগামীতে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হতে চায় সে। ছোট থেকে মহিলাদের সমস্যা দেখেই চিকিৎসক হওয়ার বাসনা তৈরি হয়েছে তামান্নার। লালগোলার রহমতুল্লা হাই মাদ্রাসার সাহিদ আক্তার হয়েছে তৃতীয়। বাবা আবু বাক্কার দিনমজুর। সাহিদেরও ইচ্ছে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার।
তথ্যসূত্র: আজকাল