বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

হাত দিয়ে বোমা ফেলার গর্ত ছিল ৭১এর যুদ্ধ বিমানে

আপডেট: December 9, 2019, 1:12 am

নিজস্ব প্রতিবেদক


উনিশশ’ একাত্তর সালে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা যে শুধু মাটিতেই লড়াই করেছেন তাই নয়, সে সময় একটি বিমান বাহিনীও গঠিত হয়েছিল।
কিন্তু কেমন ছিল সেই বিমান বাহিনী?
তাদের কোনো যুদ্ধ বিমান ছিল না। তারা পেয়েছিলেন তিনটি ছোট বিমান – কিন্তু তা থেকে বোমা ফেলার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
তাই বিমানের ‘বডি’ কেটে গর্ত করে বিমান সেনারা যাতে হাত দিয়ে বোমা ফেলতে পারেন – সে ব্যবস্থা করতে হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম বিমান বাহিনীর বিমান-সেনাদের। তাদের যুদ্ধ কৌশল অবাক হয়েছিলেন ভারতীয় প্রশিক্ষকরা।
সেই বিমান দিয়ে অভিযান চালিয়েই তারা ডিসেম্বর মাসে মেঘনার পূর্ব তীর পর্যন্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছিলেন।
বিবিসি বাংলার কাছে সেই যুদ্ধকালীন বিমান বাহিনীর গল্প শুনিয়েছেন ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ বীরোত্তম – যিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের পাইলট ছিলেন।
হাতে গোনা যে কজন বৈমানিক ১৯৭১এ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন – তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। যুদ্ধের শুরুর দিকে ভারতে গিয়ে কয়েকটি ছোট বিমান নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদের সাথে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীর রনি। তাকে ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন বলছিলেন কিভাবে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন ।
“ঢাকায় ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্র্যাকডাউনের পর ২৭ মার্চ যখন কারফিউ তোলা হলো – তখনই আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম মুক্তি যুদ্ধে যোগ দেবার আকাঙ্খা নিয়ে। এপ্রিলের তিন তারিখ ভারতে পৌঁছালাম।”
“ভারতের বিমান সংস্থার পাইলটরা যখন খবর পেলেন যে পিআইএর একজন পাইলট এসেছেন, তারা আমাদের সাদরে গ্রহণ করলেন। সবরকম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। সে সময়ই আমরা একটা গেরিলা এয়ার স্কোয়াড গঠনের প্রস্তাব দেই।”
“আমরা একজন সুইডিশ পাইলটের অভিজ্ঞতা থেকে এই ধারণাটা নিয়েছিলাম। সে একটা ছোট সেসনা বিমান দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে ১০-১৫টা মিগ জাহাজ ধ্বংস করেছিল। এই আইডিয়াটাই আমরা ভারত সরকারকে জানাই।”
“আমরা বললাম, এই গেরিলা এয়ার স্কোয়াড আমরা গঠন করবো বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরেই – যাতে ভারতকে আন্তর্জাতিকভাবে কোনভাবে বিব্রত হতে না হয়।”
“পরিকল্পনা গৃহীত হলো। মাত্র তিনটি বিমান দিয়ে বিমান বাহিনীর যাত্রা শুরু হলো। এগুলো কোন যুদ্ধ বিমান ছিল না। গতিও ছিল খুব কম – গাড়ির গতির থেকেও কম।”
“একটি বিমান ছিল ডাকোটা যোধপুরের মহারাজার ব্যক্তিগত বিমান – যা তিনি আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। ভারতীয় বিমান বাহিনী আমাদের দিল একটা কানাডিয়ান ‘অটার’ বিমান, আরেকটা ফরাসী এলুভিট থ্রি হেলিকপ্টার।”
এই বিমানগুলো কিভাবে তারা যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করলেন?
জবাবে ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন বলছিলেন, অটার এবং এলুভিট থ্রিতে তারা ‘রকেট পড’ বসালেন। “এর একেটিতে ৭টা করে মোট ১৪টি রকেট থাকতো। আর বসানো হয়েছিল মেশিন গান।”
“অটার প্লেনটিতে আরেকটা কাজ করা হয়েছিল। এটার বডিটাকে কেটে হাত দিয়ে বোমা ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।”
“এগুলো কনভেনশনাল যুদ্ধবিমানের সাখে কোন মিল নেই। আমরা এটা করেছিলাম একটাই কারণে – বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হাত তেকে জনগণকে উদ্ধার করার জন্য।”
“আমাদের যুদ্ধের অভিযানগুলো ছিল ভয়ংকর বিপদজনক। রাতের অন্ধকারে দুশো-আড়াইশ ফিট ওপর দিয়ে বিমানগুলো উড়তো।প্রশিক্ষণের সময় ভারতীয় ইনস্ট্রাকটররা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তারা ভাবতেই পারেন নি যে বাঙালি পাইলটরা এরকম অভিযান পরিচালনা করতে পারবে।”
“কিন্তু আমাদের এই অভিযানগুলো এতই এফেকটিভ ছিল যে ৯ই ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করে মেঘনার পূর্ব তীর আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিলাম।”
সূত্র: বিবিসি বাংলা