হারাচ্ছে ঢাক-ঢোলের ঐতিহ্য ভালো নেই কারিগররা!

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২২, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

হাসান পলাশ:


শারদীয় দুর্গোৎসব এলেই মন্ডপে মন্ডপে বাদ্যযন্ত্র, ঢাক-ঢোলের শব্দ আর ধুপের গন্ধে মেতে ওঠেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। এর আগেই ব্যস্ত সময় পার করতে হতো বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগরদের। কিন্তু এবার সেই চিত্র ভিন্ন। এখন পর্যন্ত কাজের কোনো চাপ না থাকায় মন ভালো নেই ঢাক-ঢোলক কারিগরদের! পূজোর অপেক্ষায় দিন ও মাস গুণলেও এই ভরা মৌসুমে কাজ নেই তাদের হাতে। তাই হতাশা নিয়ে অলস সময় পার করছেন রাজশাহীর ঢোলক কারিগররা।

শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাজশাহী মহানগরীর সিঅ্যান্ডবির মোড়ে আসু বাবু ও পবা উপজেলার নওহাটা বাজারের তেঁতুলতলা মোড়ের চন্দন দাসের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, ঢাক-ঢোল তৈরি বা মেরামতের কাজ তেমন নেই। কেবল ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে পূর্ব পুরুষের এই পেশা এখনও ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ঢাক ও ঢোল মেরামত বা তৈরির কাজ নেই।

কারিগররা জানান, পূজোতে ঢাক-ঢোলের বাজনা অপরিহার্য। কারণ হিন্দুশাস্ত্রেও এর ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে। তাই ঢাক-ঢোল ছাড়া পূজা-অর্চনার কথা ভাবাই যায়না। তবে বর্তমান সময়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির আধিক্যে ঢাক-ঢোলের বাজনা কমে যাচ্ছে। এখন যে দুই একটি ঢাক-ঢোলের কাজ হয় তাতে কাঠ, চামড়াসহ ঢাক-ঢোল তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় খুব একটা লাভ হয়না।

রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা বাজার তেঁতুলতলা মোড়ের ঢাক তৈরির কারিগর চন্দন দাস (৪৫) বলেন, বংশ পরম্পরায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি এই পেশায় নিয়োজিত রয়েছন। তবে আগের দিনের মতো এখন আর ঢাক ও ঢোলের তেমন চাহিদা নেই। যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢাক-ঢোল, খোল ও তবলা। তবে প্রতি বছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে ঢাক-ঢোলের চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়। কিন্তু এবার তার চিত্রও অনেকটা ব্যতিক্রম।

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে বাপ-দাদার পেশার হাল ধরে রেখেছি। তবে এই ব্যবসায় এখন যা আয় হয় তা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করাই কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।

চন্দন দাস নামের এই কারিগর বলেন, বড় আকারের প্রতিটি ঢাক ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ছোট ও মাঝারি ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা দামে বিক্রি করা হচ্ছে। আসন্ন দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে এবার মাত্র ৬/৭টি ঢোল মেরামতের কাজ পেয়েছেন। কাজের চাপ একবারেই কম।

চন্দন দাস ছাড়াও কথা হয়- পবা উপজেলার একাধিক কারিগরের সাথে। তারা জানান, গান বাজনা, যাত্রানুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান দিন দিন কমে যাচ্ছে। আর অনুষ্ঠান কম হওয়ায় ঢোলের চাহিদাও কমে যাচ্ছে। তাই পরিবার বা সংসারের খরচ মেটানো এখন খুবই কঠিন হয়ে পড়ছে। যে কারণে এই কাজে কারিগররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

তারা আরও জানান, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে উৎসব-অনুষ্ঠানে এখন আর ঢোলের তেমন কদর নেই। তবে বছরের এই সময় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ঢাক-ঢোলের কদর কিছুটা হলেও অবশিষ্ট রয়েছে। পূজার আরতিতে ঢাক-ঢোলের এখনও কোনো বিকল্প নেই। তাই বছরের এই সময়ে অতটা ব্যস্ত সময় পার না করলেও টুকটাক কাজ হচ্ছে।

রাজশাহীর পবা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মো. ওয়াজেদ আলী খাঁন বলেন, পূজা মন্ডপে সানাইয়ে মন যেন কেমন করে ওঠে। শুধু সানাই নয়, জোড়া কাঠিতে ঢাক কিংবা কাসরের ওপর একটানা একটি কাঠির তিনটি শব্দ-সুরের যে মূর্ছনা সৃষ্টি করে এসেছে তা বাঙালির একান্ত নিজের সুর। এ সুরের ইন্দ্রজাল ছিড়ে আমাদের বাঙালির গানে প্রবেশ করেছে গিটার, প্যাডড্রাম ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র। যার প্রভাবে আমাদের ঢাক-ঢোল এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। তিনি আরও বলেন, বিচিত্র পেশার ভিড়ে দেশিও বাদ্যযন্ত্র তৈরির পেশায় অর্থের সেই প্রাচুর্য নেই। এ জন্য বংশানুক্রমিক এসব পেশা পরিবর্তন করছেন কারিগররা। ফলে বাদ্যযন্ত্র তৈরির দোকানগুলো দিন দিন কমে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন- স্থানীয় এই জনপ্রতিনিধি।

উল্লেখ্য, এই বছর রাজশাহী মহানগরীসহ জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ৪৫০টি মন্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ