হারিয়ে যেতে বসেছে গরিবের অ্যাম্বুলেন্স

আপডেট: জুলাই ২৪, ২০২১, ৯:৩৫ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহী বিভাগীয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত উত্তরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার সেবার অন্যতম ভরসাস্থল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। যেখানে এ অঞ্চলের আটটি জেলার মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। ১ হাজার ২০০ বেডের এ হাসপাতালে প্রতিদিন জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। আর এসব মানুষদের জরুরি চিকিৎসা সেবায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছাড়াও সহায়ক বিভিন্ন সেবা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন অনেকেই। এমনি কিছু মানুষ ‘ভ্যান অ্যাম্বুলেন্স’ চালক। অস্বচ্ছল ও কম দূরত্বে রোগিরাই মূলত এই ভ্যান অ্যাম্বুলেন্সে চলাচল করেন। স্বল্প খরচে ও সুন্দর আয়োজনের এ বাহনটিকে তাই গারিবের অ্যাম্বুলেন্সও বলছেন চালকরা।
তবে হাসপাতালে উন্নয়নের ছোঁয়া এবং রোগিদের অনাগ্রহের কারণে এই অ্যাম্বুলেন্স হারিয়ে যেতে বসেছে। গত ৬ থেকে ৭ বছরের ব্যবধানে কমেছে এ অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা। এখন হাসপাতালের সামনে মাত্র ৪ টি এমন বাহন দেখা যায়।
এ বিষয়ে কথা হয় এসব ভ্যান চালকদের সঙ্গে। এরআগে তাদের কয়েকজনকে ‘দালাল’ হিসেবে উল্লেখ করাই অনেকেই এ পেশা ছেড়েছেন। একারণে বর্তমানে যারা আছেন তারাও মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে চালক শহিদুল ইসলাম জানান, তিনি হাসপাতালে প্রায় ১৫ বছর আগে একটি প্রজেক্টে কাজ করেছিলেন। প্রজেক্ট শেষ হলে তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন। একসময় হাসপাতালের রোগি পরিবহণের জন্য একটি ভ্যান কেনেন। কিন্তু সেখানে রোগিরা আসতে চাইতো না।
কাঠের ভ্যান ছিলো। সেখানে হাত ভাঙ্গা,পা ভাঙ্গা বা যেসব রোগীদের কোমরে ব্যথা আছে তাদের সমস্যা হতো। একারণে রোগি আসতে চাইতো না। একসময় তিনি পরিকল্পনা নিয়ে ভ্যানের উপরে মোটা গোদি বসিয়েছেন। এখন রোগিরা স্বচ্ছন্দ্যে বসে থাকতে পারে। ভাঙ্গা রাস্তাতেও তেমন সমস্যা হয় না।
এরপরই তার সঙ্গে আরো কয়েকজন এমন ভ্যান বানানÑ যারা এই ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। সেসময় ১৫ থেকে ২০ টা এমন ভ্যান ছিলো। কিন্তু সময়ের আবর্তনে এখন মাত্র ৪ টি ভ্যান আছে। সামনে হয়তো এগুলোও থাকবে না।
তিনি আরও জানান, তারা নগরীর বাইরে যান না। নগরীর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় রোগি নিয়ে যান। তবে প্রধানত তারা হাসপাতালের যেসব রোগীদের টেস্ট সম্ভব হয় না; বাইরে রোগি নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে এমন রোগি বেশি পরিবহণ করেন। এখন হাসপাতালে প্যাথলজিক্যাল টেস্টের উন্নয়ন হয়েছে। সেই রোগিও তেমন নাই।
শহিদুল ইসলাম জানান, এখন করোনার রোগি বেশি। কিন্তু তারা করোনার রোগি নিচ্ছেন না। খোলা পরিবেশে করোনা রোগি পরিবহণে তাদের ভয় লাগে। এছাড়া তারা কোনো মৃত ব্যক্তিকেউ এই অ্যাম্বুলেন্সে নেন না। কেননা এই গাড়িতে বসে থেকেই তারা আড্ডা দেন, ভাড়া না থাকলে শুয়ে-বসে সময় পার করেন। অনেক সময় খাওয়া-দাওয়ার কাজও এই গাড়িতেই সারতে হয়।
আর ভাড়ার বিষয়টা তারা সময় ও দূরত্বভেদে রোগিদের থেকে নিয়ে থাকেন। অনেক সময় রোগির স্বজনরা কাজে খুশি হয়ে বকশিস দেন। এভাবেই দিন চলছে তাদের।
তিনি আরও জানান, এ গাড়িতে এখন একটি সমস্যা আছে। গাড়ির উপরে কোনো ছাদ নেই। প্রখর রোদ-বৃষ্টিতে সমস্যা হয়। একারণে যেদিন ভারি বর্ষণ কিংবা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি লেগেই থাকে সেদিন আর তাদের ভাড়া হয় না। রোদ থাকলে কাছের ভাড়া হয়। দূরের রোগিরা অন্য পরিবহণ খুঁজে নেন।
শহিদুল ইসলাম বলেন, এ গাড়ি চালিয়েই তাদের পরিবারের চার সদস্যের পেট চলে। এখন এ পরিবহণে তেমন ভাড়া হয় না। এমন অবস্থা বাকি চালকদেরও। এদের অনেকেই এ পেশা পরিবর্তন করেছেন।