হাসান স্যারের মৃত্যুতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট: নভেম্বর ১৭, ২০২১, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

তসিকুল ইসলাম রাজা:


বিশ্বনন্দিত কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম ও জীবন দর্শন কখনোই মুছিবার বা হারিয়ে যাবার নয়? তাঁর নিজস্ব সৃজনশীল ও মননধর্মী কাজের মধ্য দিয়েই তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে উপন্যাস ও ছোট গল্প এ দু’শাখাতেই তাঁর কলম শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। এ ছাড়াও তাঁর প্রবন্ধসমূহ, ব্যক্তিগত রচনা, কিশোর উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ কর্ম ও স্মৃতিচারণমূলক রচনাগুলো পাঠক সমাজ ও বিদগ্ধ প-িত সমাজেও সমানভাবে সমাদৃত হয়েছে। মোটকথা, উভয় বাংলা এবং বাংলা ভাষাভাষি মানুষের কছে তাঁর সাহিত্য কর্ম ও জীবনদর্শন সাদরে গৃহীত হবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন তাঁর গল্পে অত্যন্ত সার্থকভাবে রূপায়িত হয়েছে। একেবারে সমাজের নিচু স্তরের মানুষের জীবনকথন রচনায় তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার হিসেবে তাঁর খ্যাতি ও সুনামের কথা সর্বজনবিদিত।

আনন্দের ও গৌরবের বিষয় হলো- তিনি রাজশাহীতে বসেই একটি অসাধারণ গল্প রচনা করেছেন এবং সেই ‘শকুন’ নামক প্রথম গল্প রচনার মধ্য দিয়েই তিনি সর্বমহলে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর গল্পগ্রন্থ হলো- ১. সমুদ্রের স্বপ্ন; শীতের অরণ্য (১৯৬৪), ২. ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ (১৯৬৭) ৩. ‘জীবন ঘষে আগুন’ (১৯৭৩), ৪. ‘নামহীন গোত্রহীন’ (১৯৭৫), ৫. ‘পাতালে হাসপাতালে’ (১৯৮১), ৬. ‘আমরা অপেক্ষা করছি’ (১৯৮৮), ৭. ‘রোদে যাবো’ (১৯৯৫), ৮. ‘মা মেয়ের সংসার’ (১৯৯৭), ৯. ‘নির্বাচিত গল্প’ (১৯৮৭), ১০. ‘রাঢ়বঙ্গের গল্প’ ইত্যাদি।

হাসান আজিজুল হক উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। বিশেষত ‘আগুন পাখি’ (২০০৬) উপন্যাস রচনায় তিনি বাংলা উপন্যাস রচনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। এজন্য তিনি দেশ-বিদেশে যেমন খ্যাতি লাভ করেছেন, তেমনি পুরস্কৃত হয়েছেন। এ ছাড়াও তাঁর উপন্যাস ‘শিউলি’ (২০০৬), ‘বৃত্তায়ন’ (১৯৯১) এবং ‘লাল খোঁজ আমি’ কিশোর উপন্যাস সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। তাঁর সংগ্রামী জীবন ও সাধনার জন্য এবং সৃজনশীল কর্মের জন্য পাকিস্তান আমলে তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৭), ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ (১৯৭০) লাভের গৌরব অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশ-বিদেশের অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের ‘একুশে পদক’ (১৯৯৯) ও ‘স্বাধীনতা পদক ’ (২০১৯) লাভ করেছেন।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক ১৯৩৯ সালে ২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তাঁর নাড়ি পোঁতা রয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কারণে পরিবারের সঙ্গে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের খুলনায় আসেন। তারপর তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯৯৮ সালে দর্শন শাস্ত্রে অনার্স এবং ১৯৬০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে দর্শন শাস্ত্রে এম.এ পাস করেন। তিনি তাঁর কর্মজীবনে সর্বপ্রথম রাজশাহী সিটি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি সিরাজগঞ্জ কলেজ, খুলনা বিএল কলেজে অধ্যাপনা করেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দর্শন’ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০০৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁর অবসর জীবন বলে কিছুই ছিল না। সর্বদাই লেখালেখি, বইপ্রকাশ এবং সাহিত্য সংস্কৃতিমূলক বিভিন্ন কর্মে আত্মনিয়োগ করেন। মৌলবাদী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন কলম এবং বক্তৃতা ও বিবৃতিতে তিনি ছিলেন সর্বদাই সোচ্চার। আমরা রাজশাহী লেখক পরিষদ রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদ, কবিকুঞ্জ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি তাঁর মতো এতো সাহসী মানুষ খুব বেশি দেখিনি। তাঁর প্রতিটি কর্মই ছিল দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। তাঁর মৃত্যু (১৫ নভেম্বর ২০২১) আমাদের জীবনে খুবই ক্ষতি হলো। আমরা বিনম্ররচিত্তে তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি বারবার প্রণতি জানাই।
(ক্রমশ)