হিংসা ভুলে সম্প্রীতির বন্ধনে আহমেদাবাদ

আপডেট: ডিসেম্বর ১৮, ২০১৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


একবিংশ শতকের শুরুতে ধর্মীয় বিশ্বাসগত দাঙ্গায় বিশ্বজুড়ে সমালোচনায় এসেছিল যে শহরের নাম, ভারতের সেই আহমেদাবাদ এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০০২ সালে ভয়াবহ ওই দাঙ্গা হয় রাজ্যজুড়ে, সে সময় পাকিস্তান সীমান্ত ঘেঁষা ভারতের পশ্চিমের শহর আহমেদাবাদে দীর্ঘদিন চলে হিন্দু-মুসলিমের হিংসা, হত্যাযজ্ঞ।
ওই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রায় হাজারখানেক মানুষের মৃত্যু পেরিয়ে ১৪ বছরের মাথায় আহমেদাবাদে এখন কোনো শঙ্কা ছাড়াই দিন যাপনের কথা বললেন সংখ্যালঘু মুসলমানরা। মোদীর দল বিজেপির যুব শাখার একজন কেন্দ্রীয় নেতা আহমেদাবাদকে অভিহিত করলেন ভারতের অন্যতম ‘নিরাপদ’ শহর হিসেবে।
প্রায় ৬০০ বছর আগে একজন মুসলিম শাসক বা সুফীর নামে প্রতিষ্ঠিত এই শহরে সব ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করে আসে শতাব্দীর পর শতাব্দী। দেশ ভাগের পর পাকিস্তান থেকে দেশান্তরিত হতে বাধ্য হওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের আশ্রয় মেলে সীমান্তবর্তী গুজরাটের সবচেয়ে বড় এই শহরে।
নগর ঘুরলে মুসলিম আমলে নির্মিত নানা স্থাপনা যেমন চোখে পড়ে, তেমনি যে কোনো আগন্তুকের চোখে পড়বে সাঁই সাঁই করে স্কুটিতে ছুটে চলা বোরকা পরা নারীদের।
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের প্রধান শহর আহমেদাবাদের রাস্তায় দাঙ্গাবাজদের এই ছবি ২০০২ সালের ১ মার্চের।
গুজরাট টেকনোলজিকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের স্নাতকের শিক্ষার্থী নোমান মালিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৪ বছর আগের সেই দাঙ্গার স্মৃতিও খুব বেশি নেই। ” বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল টিমের খেলোয়াড় নোমানের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলেনি সাম্প্রদায়িক বিভেদ।
“দেখেন, আমার অধিকাংশ বন্ধুই ভিন্ন ধর্মের। আপনি জিজ্ঞেস করলেন বলে অনেকদিন পর ধর্মের বিষয়টা মনে হলো। আমাদের এগুলো স্মরণও থাকে না। আমরা একসঙ্গে থাকি, ঘুরি, আড্ডা দেই, পড়াশোনা করি। ধর্মের ভিন্নতা আমাদের জীবনে কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি।”
ওই দাঙ্গার পেছনে রাজনীতি কিছুটা হলেও কাজ করেছে বলে মনে করেন আহমেদাবাদের এই তরুণ।
নোমান মালিক (হলুদ জার্সি পরা) গুজরাট টেকনোলজিকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল টিমের নিয়মিত মুখ
তিনি বলেন, দাঙ্গার পর রাজ্েযর বিজেপি সরকার মুসলমানদের আস্থা অর্জনে কিছু পদক্ষেপ নেয়, যার সুফল  মিলছে।
আহমেদাবাদের ভাস্ত্রাপুরের আব্দুল হামিদ বোখারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালোই বলতে হবে। ২০০২ সালের পর আতঙ্কিত হওয়ার মত কিছু ঘটেনি।”
তবে ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয় সেজন্য সবগুলো ঘটনার বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
আহমেদাবাদের বাসিন্দা সুরেশ সিং বলেন, ভারতে আসলে অনেক দাঙ্গা হয়েছে। ২০০২ সালের দাঙ্গাটা সে রকম একটি দাঙ্গা। ওই দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেই স্মৃতি ব্যক্তিগতভাবে তারা হয়তো কখনোই ভুলতে পারবেন না।
“তবে এখানকার মুসলমানদের সার্বিক জীবনচক্রে সেটার প্রভাব বেশি নেই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাবের কারণে তারা পিছিয়ে পড়ছেন- বিষয়টা তা না। যথেষ্ট পরিমাণ সম্প্রীতি সমাজে আছে।”
এখানকার মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রধান সমস্যা কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের প্রধান সমস্যা শিক্ষা বিমুখতা। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে এখনও তাদের ‘ইচ্ছাকৃত’ অবহেলা রয়েছে।
“এটা বদলাতে না পারলে কীভাবে তাদের অবস্থার পরিবর্তন হবে? সার্বিকভাবে সমাজের সঙ্গে মিশে থাকতে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেই হবে। যত দেরি হবে, তাদের অগ্রগতিও তত দেরিতে হবে।”
মুসলমানদের শিক্ষা অর্জনের সুযোগ সম্পর্কে গুজরাটের রাজধানী গান্ধীনগরের ধিরুবাই আম্বানি ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজির নির্বাহী রেজিস্ট্রার সোমান নাইর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গুজরাটের ইতিহাসে বা আশপাশের রাজ্যগুলোতেও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষার উন্নয়নে এত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যতটা মুখ্যমন্ত্রী মোদির সরকার নিয়েছেন।
“মনে করেন, চিফ মিনিস্টার স্কলারশিপ। দাঙ্গার পরে মোদির আমলে চালু হয়েছে। বছরে কতগুলো দেওয়া হবে, তার কোনো সংখ্যা নাই। যথাযোগ্য আবেদনকারী পেলেই দেওয়া হয়। যেহেতু এটা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য, মেধার বিষয়টা সেইভাবে দেখা হয় না। মোটামুটি একটা লেভেলে থাকলেই এই স্কলারশিপ পাওয়া সম্ভব।”
২০০১ সাল থেকে সাড়ে ১২ বছর গুজরাট শাসন করা নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশংসা করেন সোমান নাইর।
নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশংসা করলেন গুজরাটের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী রেজিস্ট্রার সোমান নাইর
তিনি বলেন, “মোদি হচ্ছে সেই ব্যক্তি যিনি আমলাদের দৌড়ের উপরে রাখতেন। সব সময়েই বলতেন, এটা করো, এটা করো না। সুতরাং তারা তাকে অপছন্দ করতো। তারাই তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের গল্পগুজব ছড়ায়। যদি মোদি সরকার চালায়, তাহলে তারা ‘ম্যানুপুলেট’ করতে পারবে না। তাদের মত করে কিছু করতে পারবে না।”
তিন বছর ধরে গুজরাটে বসবাসকারী কেরালার এই অধিবাসী বলেন, এখানে আসার আগে তিনিও মোদি-গুজরাট-বিজেপি সম্পর্কে নানা কথা শুনেছেন। তবে আসার পর কোনোটারই সত্যতা পাননি।
“আপনাকে আমি আরেকটা বিষয় বলছি, আমি কোনোভাবেই বিজেপির সমর্থক নই। আমি এক সময় সিপিএমে সক্রিয় ছিলাম। আমি কেরালা থেকে এসেছি। কিন্তু কিছু নেতা আছে, যারা সত্িযই অনেক ভালো। তাদের সেই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। তিনি ভিন্ন দলে থাকলেও।”
তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০ শিক্ষার্থীর মধ্েয ৪৮ জন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বৃত্তি পাচ্ছেন জানিয়ে নাইর বলেন, “এই বৃত্তির বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, এখানে মেরিট খুব বেশি দেখা হয় না। আয় দেখা হয়। আয় কম হলে বৃত্তি পায়। মুসলমানরা প্রচুর এই বৃত্তি পাচ্ছে।”
আহমেদাবাদকে ভারতের অন্যতম নিরাপদ শহর বলে দাবি করলেন স্থানীয় বিজেপি নেতা হর্ষ আর সাঙ্গাবি (সাদা পাঞ্জাবি)।
গুজরাটের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আহমেদাবাদের মাজুরা এলাকার এমএলএ এবং ইয়ুথ বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হর্ষ আর সাঙ্গাবি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন আপনি ঘুরে দেখেন, আহমেদাবাদ ভারতের অন্যতম নিরাপদ শহর। এমনকি একটি মেয়ে সারা রাত একা রাস্তায় ঘুরতে পারবে, কোনো সহিংসতার আশঙ্কা নাই। নিরাপত্তা এখানকার অন্যতম দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়।
“২০০২ সালের দুর্ঘটনা সম্পর্কে বলব- পৃথিবীতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে, এটাও সে রকমই একটা ঘটনা।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে আহমেদাবাদের নাগরিকরা মূলত শান্তি ও সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করে। জনগণের সহায়তায় আমরা এই শহরকে ভারতের অন্যতম নিরাপদ শহর হিসাবে গড়ে তুলেছি।
“নগরকে নিরাপদ করার বড় একটা বিষয় হলো আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। আমরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর।”
“এখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও আমাদের জনগোষ্ঠীর অংশ। তারাও এখানে নিরাপদ। আপনি যদি পাকিস্তানের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন, তারা সেখানে যতটা নিরাপদ, তার চেয়েও বেশি নিরাপদ গুজরাটে। গুজরাটে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু কোনো বিষয় নয়।”- বিডিনিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ