হিন্দু ধর্মীয় আধ্যাত্মবাদকেই অস্ত্র করছে সঙ্ঘ পরিবার

আপডেট: আগস্ট ৩১, ২০১৭, ১:২৪ পূর্বাহ্ণ

কলকাতা থেকে দীপঙ্কর দাশগুপ্ত


একদিন সঙ্ঘ পরিবারের লক্ষ্য ছিলো রামমন্দির নির্মাণ কিন্তু এখন সেই অ্যাজেন্ডা অনেকটা পিছনে চলে গিয়েছে। কারণ সঙ্ঘ পরিবার ধরে নিয়েছে, এখন যা দেশের পরিস্থিতি তাতে যখন তখন রাম মন্দির বানানো যায়। সে মথুরায় হোক বা ভাঙা বাবরি মসজিদের জায়গাতেই হোক। এখন তার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বড় অ্যাজেন্ডা হলো হিন্দু বাষ্ট্র গঠন। সেদিকে পাখির চোখ করে এই মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে তারা। একই সঙ্গে ভারতের সংবিধানকেও নিজেদের মতো কবে গড়েপিটে নিতে চাইছে সঙ্ঘ পরিবার।
রাষ্ট্রের মাথায় রয়েছেন সঙ্ঘ পরিবারের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। উপরাষ্ট্রপতি পদেও সঙ্ঘ পরিবারের লোক বসানো হয়ে গিয়েছে। ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ দখলে। সেখানে এক গেরুয়াধারীকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসানো হয়েছে। অর্থাৎ রাজনীতিতে গৈরিকীকরণ অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এখানেই থাকতে রাজি নয় আরএসএস সহ সঙ্ঘ পরিবার। তারা এবার চাইছে আরো অগ্রাসি হয়ে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তারা একেবারে সমূলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই পাল্টে দিতে চায়। গত শতকের তিরিশের দশকে হিটলার যেমন নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রক্ষমতা পুরোপরি দখল করে নিয়েছিলেন ঠিক সেই রাস্তাতেই এগোতে চাইছে সঙ্ঘ পরিবার। সেই রণকৌশল স্থির করতেই ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর মথুরায় তিনদিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হচ্ছে সঙ্ঘ পরিবার। আরএসএসের নেতৃত্বে সঙ্ঘ পরিবারভুক্ত চল্লিশটি সংগঠন এই বৈঠকে যোগ দেবে। থাকবে বাছাই করা ২০০ জন নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় বিভিন্ন রাজ্য সরকারের শীর্ষ পদস্থ কয়েকজন অফিসারকেও মথুরায় উপস্থিত হতে বলা হয়েছে। ডাকা হয়েছে সেনাবাহিনীর বাছাই করা কয়েকজন অফিসারকে। উপস্থিত থাকবেন আরএসএস প্রধান মোহন বিষ্ণ ভাগবত, সাধারণ সম্পাদক ভাইয়াজি যোশী, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ্ উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্য বিজেপি সভাপতি কেশর প্রসাদ মৌর্য্য। মথুরার কেশর ভবনে এই বৈঠক হবে।
সঙ্ঘ পরিবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইতোমধ্যে যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে স্থির হয়েছে ভারত থেকে মুসলমানদের তাড়িয়ে দেয়া সংক্রান্ত কোনো কর্মসূচি নেয়া হবে না। বরং ভারতের জাতীয় অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে খৃষ্টান ও মুসলমানদের একেবারে কোনঠাসা করে রাখা হবে। সেই সঙ্গে শুরু হবে দেশজুড়ে হিন্দু জাগরণের চেষ্টা। এ কাজে প্রধান হাতিয়ার করা হবে হিন্দু ধর্মীয় আধ্যাত্মবাদের প্রচারকে। আরএসএসের মুখ্য মুখপাত্র মনমোহন বৈদ্য জানিয়েছেন, বিভিন্ন ঘটনাক্রমের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা এবং আগামী এক বছর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি কোন পথে এগোবে তার হদিশ ঠিক করার জন্যই এই বৈঠক। আরএসএস সূত্রের খবর, আগামী এক বছর ধরে দেশের প্রতিটি কোণায় প্রতিটি রাজনৈতিক সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে সেগুলি দখল করা হবে। সেনা বাহিনী এবং আইএসএস, আইসিএসসের মধ্যেও সংগঠনকে আরো জোরদার করা হবে। সঙ্ঘ পরিবার মনে করে দীর্ঘদিন তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিবেশে প্রশাসন পরিচালিত হওয়ায় চট করে তাকে পাল্টানো সম্ভব হবে না। বিভিন্ন ইসলামি রাষ্ট্রে ধর্মই ছিলো রাজনীতির চালিকাশক্তি তাই ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনে তাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি। ভারতে সেটা করতে গেলে মতাদর্শগত প্রচারের মাধ্যমে বহু মানুষকে একজোট করতে হবে। সেই সঙ্গে ঘৃণার পরিবেশকেও চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। একদিকে রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে জাতীয় স্তরে হিন্দু ভাবাবেগ তৈরি করতে হবে, অন্যদিকে গোরক্ষা আন্দোলনকে তুঙ্গে তুলে সার্বিকভাবে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকাতে হবে। অসম, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলিতে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে অনুপ্রবেশের মতো বিষয়।
মথুরার সভায় বিশিষ্ট হিন্দু সংগঠনের মধ্যে থাকছে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ, হিন্দু সংহতি সমিতি, বজবঙ্গ দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, দূর্গা বাহিনী, রাম জন্মভূমি ন্যাস সহ মোট ৪০ টিরও বেশি সংগঠন।
উল্লেখ্য, সঙ্ঘ পরিবার হিন্দুত্বের বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর পুরোপুরি খুশি নয়, তাদের মতে, যতোটা উপভোগ হিন্দুত্বের বিষয়টি সামনে আনার কথা ছিলো ঠিক সেভাবে এগোচ্ছেন না মোদি। উত্তরপ্রদেশ সরকারের কাজেও বেশ কিছু সমালোচনা উঠে এসেছে। বিশেষত, শিশু মৃত্যুর ব্যাপারে যোগী আদিত্যনাতের যতোটা নমনীয় হওয়া উচিত ছিলো তিনি তা হননি। ফলে এক শ্রেণির মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী থাকতে গেলে তাকে এ ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে।