হিন্দু যুবকের শেষকৃত্য করলেন মুসলিমরা || মানুষের জয়গান এমনি করেই রচিত হয়

আপডেট: এপ্রিল ২৮, ২০১৭, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

‘মানুষ মানুষের জন্য’Ñ তারই প্রমাণ রাখলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার এক গ্রামের বাসিন্দারা। ‘সবার ওপর মানুষ সত্য’- সেই সত্যের কাছেই জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ, স্বার্থ-সংঘাতে জর্জরিত সমাজকে দাঁড় করাল ওই বাসিন্দারা। একজন মানুষ আরেক জন মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে সেটা বিস্মৃত হওয়া যায় না। যারা বিস্মৃত হতে চায় তারা মনুষত্বের বিচারে আর মানুষ থাকে না। হোক না সে হিন্দু, মুসলিম, ইসাই কিংবা বৌদ্ধ। শুধু ধর্মের কারণে মনুষত্বের অপমান তো চলে নাÑ তেমনি দৃষ্টান্ত- যা এক সময় আমাদের সমাজের বন্ধন ছিল, তা-ই মনে করিয়ে দিয়েছে মালদহের গ্রামের ওই মুসলিম বাসিন্দারা।
সারা ভারতেই জাত-পাত-ধর্মের বিভাজনরেখা যখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তখনই সম্প্রীতির এক অনন্য ছবি তুলে ধরল মালদহের ওই গ্রামের মুসলিম বাসিন্দারা। সহায়সম্বলহীন হিন্দু প্রতিবেশীর সৎকার করলেন তাঁরাই। এমনকী তাঁদের মুখে শোনা গেল হরিবোল ধ্বনিও। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন কলকাতার আজকাল পত্রিকার সূত্রে দৈনিক সোনার দেশে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য মতে,  সোমবার মৃত্যু হয় বিশ্বজিত রজক নামে এক যুবকের। লিভারের রোগে ভুগছিলেন তিনি। হতদরিদ্র রজক পরিবারের না ছিল লোকবল, না ছিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচ। এগিয়ে আসেন মুসলমান পড়শিরাই। মুহূর্তেই যেন মিলিয়ে গেল তথাকথিত ধর্মের বিভাজন। মৃত প্রতিবেশীর যুবকের দেহ কাঁধে তুলে নিলেন মুসলিম গ্রামবাসীরাই। নিয়ে গেলেন শ্মশানঘাটে। এমনকী হিন্দু প্রথা মেনে হরিবোল ধ্বনিও দিলেন তাঁরাই।
পুরো বিষয়টির উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্থানীয় মসজিদের মৌলবিই। এগিয়ে এসেছিলেন হাজি আবদুল খালেকও। তাঁদের উদ্যোগ আর মুসলিম বাসিন্দাদের সমর্থনেই অন্তিমক্রিয়া সম্পন্ন হয় বিশ্বজিতের।
হাজি সাহেব জানান, ‘বিশ্বজিৎ আমাদের ভাইয়ের মতো ছিল। ওর সৎকারের ব্যবস্থা না করলে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করত না।আর কোনও ধর্মই তো ঘৃণার কথা বলে না।’
সাধারণ মানুষ এত ধর্ম নিয়ে কাটাছেড়া করে না, এত মাথাব্যথাও নেই। এ গুলো স্বার্থন্বেষী ও ধর্মবাজদের কাজ। বিধ্বস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ালে, দুটো হিন্দু মন্ত্র উচ্চারণ করলে কি ধর্ম খোয়া যাবে! ধর্ম নিয়ে যারা টনটনে প্রতিদিন, তারা কি বলতে পারবেন অন্তেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেয়া ওই মাওলানার ধর্ম বজায় আছে? তাঁর ধর্ম বোধের কী বিশাল পরিধি যেখানে মানুষ শুধুই মানুষ হয়ে উঠে। ওই মাওলানা আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে বলছেন, হিন্দু বিশ্বজিতের শেষকৃত্য সম্পন্ন না করলে আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করতেন না। এই বোধ না থাকলে ধর্মে শান্তি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব আর বাকি থাকে কি? নিশ্চয় এই বোধের বাইরে যখনই যায় তখনই অসহিষ্ণুতা, ধর্ম-বর্ণ, ভেদবুদ্ধি মানুষকে অমানুষ করে তোলে। আমরা বর্তমান বিশ্বে তো সেই উন্মত্তাই তো দেখছি। সমাজে তো আমরা সেই ধর্মগুরু চাই- যিনি সৃষ্টির সেরা মানুষকেই হেদায়েত করবেন, তার কল্যাণ কামনা করবেন। ধর্মগুরু কোনোভাবেই উস্কানিদাতা হতে পারে না। সশ্রদ্ধ সালাম সেই মৌলবিকে, যিনি বিশ্বজিতের সৎকারের উদ্যোগ নিয়ে মানবতাকেই উর্ধে তুলে ধরেছেন। তার চেয়ে বড় প্রগতিশীল মানুষ আর কে হতে পারে? আমাদের শিক্ষাটা এখান থেকেই শুরু করিÑ তা হলেই মানবতা বাঁচে, মহান হয়ে ওঠে মনুষত্বের জয়গান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ