হৃথিবী রথ : শহরতলীর সাহিত্য চর্চা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২২, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


মোবাইল, কম্পিউটার, গুগোল, ফেসবুক, ইউটিউব নিয়ে সবাই এখন ব্যস্ত, সরকারি বেসরকারি পাঠাগারগুলো পাঠক শূন্য, বই বিমুখ প্রায় ৯৫ ভাগ শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী, সামাজিক অবক্ষয় সর্বগ্রাসী, দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলছে অব্যাহত গতিতে। এমন প্রতিকুল অবস্থাতেও কিছু যুবক গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে নিরবে বই পড়ায় নিমগ্ন। তাদের সমৃদ্ধ কোনো পাঠাগার নেই তারপরেও বই সংগ্রহ করে সাংসারিক কাজের ফাঁকে বইয়ের সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ এক ব্যতিক্রমি দৃষ্টান্ত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শহরতলী মহানন্দা নদীর অপর পারে বারোঘরিয়ায় তাদের বই পড়ার যৌথ প্রয়াস শহরের বুদ্ধিজীবীদের আকৃষ্ট করেছে।
তারা বইপড়াকে উৎসাহিত করার জন্য এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছেন। একটি বই নির্বাচিত করে কয়েকজনকে পড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এদের মধ্যে একজন বইটি পড়ে বইটির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য, লেখকের অভিব্যাক্তি পর্যালোচনা করে একটি নাতিদীর্ঘ প্রতিবেদন লিপিবদ্ধ করবেন এবং নির্দিষ্ট দিনে পাঠচক্রে উপস্থাপন করবেন। এই প্রতিবেদনের উপর বাকিরা সুচিন্তিত আলোচনা করবেন মতামত প্রকাশ করবেন। যা অংশগ্রহণকারী এবং দর্শক শ্রোতা সকলকেই সমৃদ্ধ করে। এ অনুষ্ঠান দেখার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে উপস্থিত হন বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী। শহরের বুদ্ধিজীবীরা বলেন, শহরে সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও কোথাও এমন সুন্দর সাহিত্য চর্চা হয়না।
তাদের এ অনুষ্ঠান তিনটিভাগে বিভক্ত পাঠচক্র, কবিতাচক্র এবং সঙ্গীতচক্র। যে কেউ এখানে অংশ নিতে পারেন। ৩-৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অত্যন্ত শৃংখলার সাথে চলে এই অনুষ্ঠান। সেখানে নেই কোনো হৈ-হুলোড়, নেই পপগানের কানফাটা আওয়াজ, নেই কোনো নর্তন-কুর্দন। এই অনুষ্ঠান কোনো ঘরে বা সাজানো মঞ্চে হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তা হতে পারে খোলা মাঠে, গাছের ছায়ায়। শহরতলীর অনুষ্ঠান বলে তা উপেক্ষিত নয় বরং শহরের বোদ্ধাদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের এ প্রয়াস সাহিত্য সংস্কৃতির অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে সাহায্য করেছে। একটা বই নিয়ে এমন সৃজনশীল আলোচনা দেশের অনেক বড় প্রতিষ্ঠানেও হতে দেখা যায়না।
যারা এই অনুষ্ঠানের পুরোভাগে রয়েছেন তারা যে খুব উচ্চ শিক্ষিত, বরেণ্য ব্যক্তি তাও নয়। কিন্তু তাদের সৃজনশীলতা অভুতপূর্ব । এরা হচ্ছেন দুজন স্কুল শিক্ষক আনিফ রুবেদ, ইভান আরভিন এবং তাদের সঙ্গে রয়েছেন সুজান সাম্পান, তমাল দীপ্তসহ কয়েকজন। তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি পাঠক সৃষ্টি করা। যেন বেকার যুবকেরা এ সবের মধ্যে জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পায়। হয়ে উঠে মার্জিত, বিনয়ী ও নির্লোভ। হিংসা, লোভ, মাদকাশক্তি থেকে দূরে থাকতে পারে। পথভ্রষ্ট বা বিপথগামী না হয়। তাদের এ প্রয়াসকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এ ক্ষেত্রেও তারা অনেক সফল হয়েছে। ২০১৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তরুণ সাহিত্যিক আনিফ রুবেদ মাত্র ৬/৭ জনকে সাথে নিয়ে ‘হৃথিবী রথ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন। বেশ কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন সদস্য সংখ্যা হয়েছে ৪০ জন। সংগঠনের জন্ম ২০১৪ সালে হলেও পাঠচক্রের যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালের ৩০ নভেম্বর তারাশঙ্করের লেখা ‘কবি’ বইটি দিয়ে এবং ২৬ আগাস্ট /২২ তাদের ১০০ তম পাঠচক্র হয়েছে জন মিল্টনের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ প্যারাডাইস লস্ট দিয়ে। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক সহ বিখ্যাত লেখকদের বই নিয়ে পাঠচক্র সম্পন্ন করেছেন। সবই তাদের প্রচ- ধৈর্য্য ও নিরলস প্রচেষ্টার ফসল। প্রতিটি অনুষ্ঠান হয় অতি সাধারণ ও আড়ম্বরহীন। অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে মাঝে মাঝে ছোট খাটো প্রকাশনা বের করা, বৃক্ষরোপন, চা দোকানের শিশু শ্রমিকদের পুজা পার্বণে নতুন পোশাক উপহার দেওয়া, পাঠচক্রে অংশ গ্রহণকারীদের বই দিয়ে পুরস্কৃত করা। তাদের আর্থিক যোগানদাতা তারা নিজেরাই। তাদের নিজস্ব কোনো ঘর বা ক্লাব সেটাও নেই। শত অনটনের মধ্যেও তাদের মনে কোনো ক্লেশ নেই। তাসের অক্লান্ত প্রচেষ্টা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাদের সংগঠনের নামটিও বিচিত্র। হৃদয়ের পৃথিবী এ দুটি শব্দের সমন্বয়ে নতুন শব্দ সৃষ্টি করেছে হৃথিবী এবং তাদের কার্যক্রম হচ্ছে রথ। এই নিয়ে হয়েছে হৃথিবী রথ। ১০০ তম অনুষ্ঠানটি হয়েছিল বারোঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সভাকক্ষে। সেদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন কয়েকজন অধ্যাপক, গবেষক, ডক্টর, লেখক, সাংবাদিক ও জেলা শিল্পকলা একাডেমীর কালচারাল অফিসার। সেইদিনই বারঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সদয় হয়ে তাদের নিয়মিত ব্যবহারের জন্য ভবনের একটি ঘর বরাদ্দ করেন। এমন একটি উন্নত ও সৃজনশীল সংগঠন টিকিয়ে রাখার জন্য সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের এগিয়ে আসা উচিৎ।
লেখক : সাংবাদিক