হৃদয়ের টানে নয়

আপডেট: মার্চ ৩, ২০২১, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


শ্রদ্ধা,স্নেহ, ভালবাসা, মমতা, উদারতা, ক্ষমা প্রভৃতি চাইলেই পাওয়া যায়না। কারণ এসব কিছুর সাথে সম্পর্ক রয়েছে অর্থ ক্ষমতা ও স্বার্থের। এসব উপাদান যাদের হাতে উপরের অনুভুতিগুলো তাদেরই দখলে। কথাগুলো কাঠখোট্টা মনে হলেও আসলে নির্ভেজাল সত্য। সমাজে শ্রদ্ধা কারা পায়? ক্ষমতাবান সমাজপতি যাদের মানুষ শ্রদ্ধা করে। সমাজ সেবকরা শ্রদ্ধার পাত্র। বিদ্বান ব্যক্তিরা শ্রদ্ধা পান। প্রাশাসনিক ক্ষমতায় বসে আছেন যারা, তারাও শ্রদ্ধা পান। কোটিপতিরাও শ্রদ্ধা পান। তবে শ্রদ্ধা বস্তুটি কে কী ভাবে প্রদর্শন করেন ভয়ে না ভক্তিতে, তোষামদ করার জন্য, না উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য, সম্মান মিশ্রিত না কপটতা মিশ্রিত তা একটু গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলেই বোঝা যায়। যার উদ্দেশে করা হয় তিনিও বোঝেন।
শ্রদ্ধা ছাড়াও অন্যান্য কোমল অনুভুতি, প্রেম, ভালবাসা, উদারতা, ক্ষমা প্রাত্যেকটি ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য। আর বলা যায় এসব অনুভুতি এককভাবে প্রদর্শিত হয়না। হয় উভয় পক্ষের আদান প্রদানের ভিত্তিতেই। বিনিময় কম বেশি হতে পারে, তবে বিনিময় থাকতেই হবে। শ্রদ্ধা চাইলে স্নেহ দিতে হবে। ভালবাসা চাইলে ভালবাসতে হবে। উদারতা পেতে চাইলে সহ্যশীল হতে হবে। ক্ষমা পেতে চাইলে নত হতে হবে। এ ধরনের বিনিময় না থাকলে কোমল অনুভূতি নির্বাসিত হয়। সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠে। একবিংশ শতাব্দীতে এই বিনিময় কমে গেছে। সংঘাত বেড়ে গেছে। এর পেছনে যে কারণটি কাজ করছে তা হলো সমাজব্যাপি ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য।
এ বৈষম্য শুধু সমাজে নয়, পরিবারেও দেখা দিয়েছে। বৈষম্য নতুন কথা নয়। যুগে যুগে ছিল। আছে, থাকবে। কিন্তু মাত্রাগত পার্থক্য প্রবল হয়েছে। আগে একান্নবর্তী পরিবার ছিল। পরিবারের প্রধানের দাপট ছিল। সেই সুবাদে সুযোগ সুবিধা বেশি গ্রহণ করতো। তারপরেও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি ছিল দায়িত্ববোধ। তখন অভাব থকলেও চাহিদা ছিল কম। পরস্পরের প্রতি ছিল সহমর্মিতা। তাই একসূত্রে গাঁথা ছিল পারিবারিক জীবন। এখন যেমন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি চাহিদাও বেড়েছে। সেইসাথে বেড়েছে অধিকার সচেতনতা, স্বার্থান্ধতা। ক্রমে ক্রমে পরিবারের বন্ধন আলগা হয়েছে, বিচ্ছিনতা বেড়েছে। সহানুভূতি সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ নির্বাসিত হয়েছে। এসব পরিবর্তনের জন্য ওই অর্থ সম্পদই দায়ী। বাবা-মা ও ছেলেমেয়েদের সম্পর্কটাও আর্থিক ভিত্তির উপর নির্ভরশীল। জন্মদাতার লালন পালন ভালবাসা এবং জন্মদাত্রীর দশমাস দশদিন গর্ভধারণের যন্ত্রণাকে আজ স্বার্থ বলে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। তাদের যে হৃদয়ের টান ও মহিমাকে নিঃস্বার্থ বলে বিবেচিত করা হয়না। অর্থের উপর নির্ভর করে সম্পর্কের উষ্ণতা ও শীতলতা। গরিব বাবা-মায়ের সন্তান বড় কর্মকর্তা হলে বাবা-মায়ের পরিচয় হয় সার্ভেন্ট অথবা বৃদ্ধাশ্রমে। এছাড়া দাদা-দাদী, নানা-নানী, চাচা-চাচী, মামা-মামী, খালা-খালু, ফুফা-ফুফুর সাথে সম্পর্ক থাকে অর্থের বিচারদ-ে। গরিব আত্মীয় সম্মান মর্যাদা কোনোটাই পায়না। আপন ভাই বোনের ক্ষেত্রেও একই মানদ-ে বিচার হয়। তাই স্নেহ ভালবাসার মত যতগুলি কোমল অনুভূতি আছে সেগুলোর ব্যবহার শুন্যের কোঠায় নেমে এসেছে সমাজ জীবনে ও পারিবারিক জীবনে। এ সব অনভূতি অনুভব করার জায়গাটি অর্থবান্ধব হয়ে উঠেছে।
অনুভূতির বিনিময় আবার সবার সাথে সবার হয়না। এখানেও প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে শ্রেণি তথা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি। নিশ্চয়ই ধনীর দুলাল গরিবের দুলালীকে ভালবাসা দেবেনা। যদি দেয় তবে জানতে হবে গরিবের দুলালীটি অপরূপা। তারপরেও সন্দেহ থাকবে সে ভালবাসা নিছক আবেগ না দেহ সম্ভোগের শঠতা। সমানে সমান না হলে উদারতা দেখানো যায়না। যেটা হয়, সেটা উদারতার অবয়বে আসলে অনুকম্পা। যদি অসহায় বা দুর্বলের পক্ষ থেকে সেই উদারতা প্রদর্শন করা হয় সেটা হবে উদারতারুপী নিরুপায়তা। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা যাকনা কেন ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শ্রেণিভিত্তিক সমাজে এসব কোমল অনুভূতি ক্ষমতাবানদের একচেটিয়া দখলে। তারাই উদারতা দেখাতে পারে, দানশীল মহানুভব হতে পারে, শ্রদ্ধা সম্মানের পাত্র তারাই হতে পারে। স্নেহ ভালবাসা লালন পালন সব তারাই করে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায় আমার তথা গরিবের কতটুকু অধিকার প্রাপ্য এবং দেবার ক্ষমতা কতটুকু তা কালো অক্ষরেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে নয়।
এক্ষেত্রে চিরক্ষমতাসীন বা আমলাদের কথাই ধরা যাক। সেখানে ন্যায্য দাবি নিয়ে যদি উপস্থিত হন এবং ঋজু সোজা করে বলেন, কাজটি করে দিতে হবে। তাহলেই হয়েছে। আপনি বেয়াদব। ভদ্রতা শেখেননি। আপনার কাজ হবেনা। আপনাকে আবনত মস্তকে গিয়ে কুর্নিশ করতে হবে। আপনার ন্যায্য দাবি জানানোর ফাঁকে ফাঁকে স্যার হুজুর বলতে হবে। অপরপক্ষ থেকে পালটা অনুভূতি প্রকাশ না করলেও। কিন্তু তারপরেও যদি কাজ না হয় তাহলে আপনার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন অব্যাহত থাকবে কি আপনি স্বাধীন দেশের স্বাধীনচেতা নাগরিক হিসেবে ? এ হিসেবটা আমলাদের অজানা থাকার কথা নয়। তবুও ওইটুকু পেলেই খুশি হন। ওইটুকু পাবার জন্য লোকারণ্যেও বলতে সঙ্কোচ বোধ করেন না। তাতে অনুভূতিটুকু শ্রদ্ধার সাথেই জানাক অথবা ভয়ে ঘৃণার এবং শঠতার সাথেই জানাক। স্যার বলতেই হবে। সালাম দিতে হবে। যদি অপরপক্ষ থেকে শান্তি বর্ষণের ইচ্ছে না থাকে তবুও। তাই এসব কোমল অনুভূতি প্রকাশের ব্যাপারটি আসলে আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এতে হৃদয়ের টান নেই।
লেখক-সাংবাদিক ওকলামিস্ট