হেপাটাইটিস রোগ দ্রুত বৃদ্ধির সম্ভাব্য কারণ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

ডা. আব্দুর রশিদ মন্ডল:


প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়। ২০১১ সাল থেকে ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তখনই বুঝতে হবে যখন কোনো বিষয়ে কিছুটা ভালো-মন্দ আলামত দেখা দেয় তখন সেটার উপর মানুষ বেশি বেশি ঝুঁকে পড়ে। যেমন- বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস, বিশ্ব হার্ট দিবস, বিশ্ব অ্যাজমা দিবস, বিশ্ব মা দিবস, বাবা দিবস ইত্যাদি পালন করে থাকে। অনুরূপভাবে ২০১১ সালের ২৮ জুলাই থেকে গোটা বিশ্বে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালন হয়ে আসছে।
২৮ জুলাই ২০২১ সোনার দেশ পত্রিকায় ‘তারেক মাহমুদ’- এর একটি প্রতিবেদন পড়লাম। প্রতিবেদনের বিষয় হলো- রাজশাহী বিভাগে হেপাটাইটিস-বি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তথ্যসূত্রে আরও বলা হয়েছে যে, রাজশাহী বিভাগে ৩ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। এই বিভাগে আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। আর রাজশাহী জেলায় ৩০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ৩০ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। এই হিসাব অনুমাননির্ভর হলে আসল সংখ্যা হয়তো আরও অনেক বেশি হবে এবং ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। যেহেতু বিশ্বব্যাপি এই ব্যাধি একটি আতঙ্কজনক মহাব্যাধি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে এই রোগের প্রবণতা আরও অনেক বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস মুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু হেপাটাইটিস বা লিভার রোগ কী কারণে এত বেশি বৃদ্ধি হচ্ছে, এ বিষয় কিছু বলা হয়নি। শুধুমাত্র বলা হয়েছে (ঠরৎধং) ভাইরাসজনিত কারণে এবং সচেতনার অভাবজনিত কারণের কথা বলা হয়েছে। ইংল্যান্ড প্রবাসী লিভার রোগ চিকিৎসক ডা. অপূর্ব চৌধুরী এই হেপাটাইটিসকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন এবং বলেছেন যে জীবাণুর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস দুইটির কারণেই হেপাটাইটিস হয়। পাঁচ ধরনের ভাইরাসের কারণে পাঁচ ধরনের হেপাটাইটিস হয়। অ ই ঈ উ এবং ঊ এদের মধ্যে প্রধান এবং এই তিন ধরনের ভাইরাস এর হেপাটাইটিস বেশি হয় (অইঈ) তিনি আরও বলেছেন যে, মল মূত্রের মাধ্যমে এবং পানি অথবা খাবারের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। অথবা খাবারের মাধ্যমে মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। এই হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস অথবা ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশের পর খরাবৎ বা যকৃত অথবা সহজ ভাষায় কলিজা আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। অথচ এই লিভারের কাজ হলো খাবারের মাধ্যমে যে সব রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করে তার ফিল্টার করা এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান সরবরাহ করা। খাবারের মুল উপাদান কার্বহাইড্রেট, ফ্যাট, প্রটিন ভাঙ্গাসহ রক্তের বিভিন্ন উপাদানে সরবরাহ করাই লিভারের কাজ। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, শরীরে ৫০০ এর উপরে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদনের ক্রিয়া-বিক্রিয়ার খেলা সম্পাদন করে থাকে। এই লিভার কত বড় ঠরঃধষ অর্গান। এই লিভার রোগের চিকিৎসা গবেষণায় কয়েকজন বিজ্ঞানী যেমন ঝঃবঢ়যবহ ঋরহধংঃড়হব এই ভাইরাসগুলিকে আলাদা করায় ১৯৭৭ সালে নভেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, তাদের দ্বারা আবিষ্কৃত ঠধপপরহব এর সাহায্যে হেপাটাইটিস রোগী পূর্বের স্বাস্থ্য ফিরে পায়না। নানান ধরনের জটিল অবস্থা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। লিভার সিরোসিস অ্যাবসেস, পানি জমা, পচে যাওয়া, ক্যান্সার ইত্যাদির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। অপরদিকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শাস্ত্রের আবিষ্কারক শ্যামুয়েল হ্যানিম্যান তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ফলে জগতবাসীকে যে তথ্য দিয়ে গেছেন, তা নির্ভুল এবং বিজ্ঞানসম্মত। তিনি তিনটি মায়াজমকেই মূলতঃ ব্যাধিসমূহের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে সে আলোচনায় এখন যাচ্ছিনা। হ্যানিম্যানসহ অনেক বড় বড় মণীষী হোমিও চিকিৎসক, জন্ডিস বা কামলা রোগকেই লিবার রোগের প্রাথমিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই জন্ডিসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্টেজই লিভার রোগের মূল কারণ বলা হয়। আর এই জন্ডিস রোগ সৃষ্টি হওয়ার মূলে বিবেচক ঔষধ সমূহ যেমন: নাপা, প্যারাসিটামল বা অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এই ওষুধগুলি ব্যবহার এবং অতি ব্যবহারের ফলে যকৃত যন্ত্রটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যখন ছোট কিংবা বড় কারো প্রকৃতির সময় বিবেচনায় একটু জ্বর ঠান্ডা দেখা দেয় তখন সাথে সাথেই উপরোক্ত ওষুধগুলি সেবন করে, শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে নিয়ে বেশ স্বস্তি বোধ করে। কিন্তু এটা তো কোনো নির্মল আরোগ্য নয়। জ্বর একটি উপসর্গ মাত্র। জীবন এবং জীবনী শক্তিকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এর সৃষ্টি হয়। বিনা ওষুধেই ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করলেই জ্বর আরোগ্য হয়ে যায়। এতে যকৃত যন্ত্রটির উপর কোনো চাপ পড়ে না। জ্বর হলে তখনই সারাতে হবে মর্মে যত ওষুধ দরকার তা সেবন করে তাপমাত্রা কমাতে হবে। বার বার এমন করতে গিয়ে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে লিভারে দুরারোগ্য ব্যাধির সৃষ্টি হচ্ছে এবং আগামী দিনে এ রোগের প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে। নবজাতক থেকে শুরু করে প্রায়ই শিশু একাধিক বার জন্ডিসে আক্রান্তের কারণে স্বাভাবিক রুচিহীনতায় ভুগে। প্রতিটি মা তার শিশুকে নিয়ে যে অভিযোগ করে থাকেন তা হলো- খাবারে রুচি নেই এবং ৫/৭ দিন পরেও পায়খানা হয়না। তখই বুঝতে হবে যে, শিশু বার বার জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল এবং দ্রুত শরীরের তাপমাত্রা কমানোর জন্য বারবার বিবেচক ওষুধ, নাপা, প্যারাসিটামল ইত্যাদি বেশি বেশি প্রয়োগ করা হয়েছিল। এতে তাদের লিভার দুষিত হয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সকলকে সতর্কতার সাথে রাখতে হবে যে, ভবিষ্যতে যাতে শিশুদের দুরারোগ্য লিভার রোগে আক্রান্ত হতে না হয়। মনে রাখতে হবে যে, আলোচিত লিভারের রোগগুলির সন্তোষজনক কোনো চিকিৎসা আজ পর্যন্ত আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। অল্প সময় কিংবা কিছু বেশি সময় ধুঁকে ধুঁকে রোগ যন্ত্রণা ভোগ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়। লিভার পরিবর্তন খুবই ব্যয়বহুল এবং সন্তোষজনক সমাধান নয়। তাও কতটুকু সম্ভব আমার জানা নেই। কয়েকজন সুদর্শন যুবক যারা আমার বেশ পরিচিত লিভার রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ দেশ ছাড়াও ভারত, সিঙ্গাপুর এবং থাইল্যান্ডে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করেও কোনো আরোগ্যের দেখা পাননি। মৃত্যুই তাদের সকল যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করে দিয়েছে।
লেখক: হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক