বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন

আপডেট: December 5, 2019, 1:11 am

মো. তাজেমুল হক


আজ ৫ ডিসেম্বর। আজকের এ দিনটি একটি বিশেষ কারণে বিশিষ্ট এবং শোকাবহও বটে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের দীক্ষাগুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃৃত্যুদিন আজ। তাঁকে নিয়ে খুব আলাপ আলোচনা হতে দেখিনা কিন্তু বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের শেষ ৩০ বছর এবং বিভক্ত ভারতে প্রায় ২ দশকের উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ। তাঁকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র বলা হয়েছে, একথা যে খুবই যথার্থ তা তাঁর জীবনী পর্যালোচনা করলে বুঝা যাবে। বঙ্গদেশের অবিসাংবাদিত এই নেতা শুধু বঙ্গদেশ নয়- সমগ্র পাক-ভারতীয় রাজনীতিতে রেখেছিলেন অত্যন্ত সৎ নির্ভিক এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা। আজকে আমাদের রাজনৈতিক সংকটের দিনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক আদর্শ আমাদের রাজনীতির জন্য দিক নির্দেশনা হতে পারে। তিনি একাধারে লব্ধ প্রতিষ্ঠ ব্যারিস্টার, বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, যশস্বী বক্তা এবং তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান। চাঁদেরও কলঙ্ক থাকে। তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু ক্লেদ বা সংকীর্ণতার উর্ধে ছিলেন তিনি সবসময়। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বহু জায়গায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক জীবনের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।
নদীর গতিপথ যেমন সরল রৈখিক নয়- মানুষের সমাজ জীবনও তেমনি বাঁকে বাঁকে গতিপথ পরিবর্তন করে। মানুষ তার স্থানিক এবং কালিক সীমায় সীমাবদ্ধ থেকে অতীত এবং ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতিতে আগমনেরও একটি ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে নবাবী আমলের পতনের পর ধীরে ধীরে সমগ্র ভারত বর্ষের রাজনৈতিক ক্ষমতা ইংরেজের হাতে চলে যায়। মুসলমানরা অভিমান ও ঘৃণাবশতঃ ইংরেজ সংশ্রব থেকে দূরে সরে যায়। শুধু তাই নয়- তারা বিজাতীয় বিদেশি ভাষা ইংরেজি শিক্ষা থেকেও দূরে থাকে। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চাকরি-বাকরিসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন প্রবর্তন হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দুরাই জমিদার হয়। মুসলমানরা খুব সামান্যই জমিদারি পরিচালনার সুযোগ পায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুসলমানরা হয় হিন্দু জমিদারের প্রজা। হিন্দু মহাজনের ঋণের জালে তারা আটকা পড়ে যায়। ধর্মীয় বিধি-নিষেধের কারণে তারা মহাজনী কারবারেও যেতে পারেনি। শিক্ষা-দীক্ষায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে, চাকরি ক্ষেত্রে, অর্থবিত্তে তারা অনেক পেছনে পড়ে যায়।
ভারতবর্ষে মুসলমানদের এমন দুর্দিনে ভারতের মুসলিম নেতারা চিন্তিত হন এবং ভারতের ১০ কোটি সংখ্যালঘু মুসলমানের অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তারা মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন। এমনি এক প্রেক্ষাপটে ভারতের রাজনীতিতে মুসলিমলীগ সহ অন্যান্য মুসলিম সংগঠনের অভ্যুদয় ঘটে। এসময় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতিতে আগমন। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের শিক্ষা শেষে তিনি তাঁর মায়ের ইচ্ছা অনুযায়ী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ পাশ করেন ১৯১৩ সালে। সে বছরই উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি লন্ডন চলে যান এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত হন বি.সি.এল ডিগ্রি। ১৯১৮ সালে তিনি গ্রেস ইন থেকে ব্যারিস্টার হন। একই বছর তিনি দেশে ফিরে কলকাতা হাই কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এসময় তিনি ২৬ বছর বয়সের তরুণ ব্যারিস্টার। সে সময় ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল।
দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছিল জটিল। এমতাবস্থায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯২১ সালে তিনি কলকাতার খিদিরপুর শিল্প এলাকা থেকে লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। এসময় অ্যাসেম্বলিতে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা করেন তাতে প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ এবং রাজনীতিকরা বিশেষ করে যুব সম্প্রদায় খুবই অনুপ্রাণিত হয়। ব্রিটিশ সরকার পার্লামেন্টে হুইপিং বিল উত্থাপন করলে তিনি তীব্র ভাষায় এর বিরোধিতা করেন। ইংল্যান্ডে লেখা-পড়া করার সময় অক্সোফোর্ডের শিক্ষা এবং ব্রিটিশ রাজনীতির যে সম্যক পরিচয় তিনি পান তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে এবং এর ফলে দেশে ফিরে তিনি স্বাধীনতা, দেশ প্রেম এবং স্বীয় সমাজের উন্নয়নের জন্য তাঁর মনে এক গভীর আকাক্সক্ষা জন্ম নেয়। তাঁর ব্যক্তিত্বে এবং কর্মদক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে- এমনকি কংগ্রেস নেতারাও তাঁকে ভালবাসতেন।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে স্বরাজ পার্টির ডেপুটি লিডার পদে মনোনিত করেন। চিত্তরঞ্জন প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন এবং মনে করতেন হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা সম্ভব নয়। ১৯২৪ সালে কলকাতা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে স্বরাজ পার্টির বিপুল বিজয় হয়। দেশবন্ধু সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ডেপুটি মেয়র পদে নির্বাচনে সহায়তা করেন। উল্লেখ্য, এর আগে কলকাতা সিটি কর্পোরেশনের এত উচ্চ পদে কোনো মুসলমান অধিষ্ঠিত হননি। কলকাতা সিটি কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়র হওয়ার পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতার বঞ্চিত এবং অবহেলিত মুসলমান সমাজের উন্নয়নের কাজে হাত দেন এবং বহু লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন।
১৯২৬ সালে কলকাতায় ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেধে যায়। পরিস্থিতি ছিল হিন্দুদের পক্ষে কেননা কলকাতার অধিবাসীদের মধ্যে শতকরা ৭৮ জন ছিল হিন্দু। তাছাড়া কলকাতা পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তা থেকে সর্বনিম্ন কর্মচারী পর্যন্ত প্রায় সবাই ছিল হিন্দু। যার ফলে মুসলমানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হলো বেশি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী জীবনের নিরাপত্তার কথা না ভেবে দাঙ্গা-বিধ্বস্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে দাঙ্গা থামাতে লাগলেন এবং হিন্দু-মুসলমান সবাইকে ধৈর্য্য ধরে শান্তি রক্ষার জন্য কাজ করতে অনুরোধ জানালেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সবাইকে দাঙ্গার কবল থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও হিন্দু সম্প্রায়ের একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কুৎসা রটনা করে।
১৯২৭ সালে তিনি ডেপুটি মেয়র পদে ইস্তফা দেন। ১৯২৩ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিভিন্ন যুব আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি খিদিরপুর এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ায় ডক শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। এসময় তিনি ব্রিটেনের ট্রেড ইউনিয়নের আদলে দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলি সংগঠিত করতে থাকেন। ১৯২৭ সালে তিনি লেবার ফেডারেশন গঠন করেন। এভাবে পাটকল, কাপড় কল, সিমেন্স অ্যাসোসিয়েশন প্রভৃতি সংস্থায় তিনি ২৭ টি ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করেন। সে যুগে আন্দোলন ছাড়া ন্যায্য দাবি দাওয়া আদায় করা সম্ভব ছিল না। ১৯২৬ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার ফলে সব মুসলমান শ্রমিকরা সোহরাওয়ার্দীর ট্রেড ইউনিয়নে যোগ দিতেন। ১৯৩১ সালে উত্তরবঙ্গে ভয়াভহ বন্যা হলে তিনি বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। এবং রিলিফের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
এখানেই তাঁর মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। একই বছর সিরাজগঞ্জে মাওলানা ভাসানির উদ্যোগে কৃষক সম্মেলন হলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী তা উদ্বোধন করেন। ১৯৩২ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিখিল ভারত মুসলিম কনফারেন্সের প্রথম সভায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সাথে তিনি অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৩ সালে ভারত শাসন আইন সংস্কার কল্পে লিনলিথগো কমিশন গঠিত হলে মুসলিম কনফারেন্সের প্রতিনিধি হিসাবে তিনি লন্ডনে যান। ১৯৩৫ সালে বিভিন্ন সংস্কার সংবলিত ভারত শাসন আইন পাস করা হয়। এর পূর্বের দৈত্য শাসনের পরিবর্তে অ্যাসেম্বলিতে সম্পূর্ণ নির্বাচিত প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করা হয় এবং হিন্দু ও মুসলমানের জন্য আলাদা নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৩৫-৩৬ সালে বিভিন্ন সম্বেলনে যোগদান করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভারতের স্বাধীনতার জন্য জনমত গঠনের প্রয়াস পান।
১৯৩৬ সালে তিনি খাজা নাজিমুদ্দিনকে সভাপতি করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং তিনি হন এ দলের জেনারেল সেক্রেটারি। এসময় বাংলায় মুসলিম লীগের অবস্থা মোটেও ভাল ছিল না। মুসলিম লীগের নেতারা জিন্নাকে বোঝালেন দলকে শক্তিশালী করতে গেলে সোহরাওয়ার্দীকে দলে আনা প্রয়োজন। পরে মোহাম্মদ আলী জিন্নার বিশেষ অনুরোধে এবং ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে সোহরাওয়ার্দী তার দলবল সহ মুসলিমলীগে যোগদান করেন এবং তিনি হন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তন হলে প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্বশাসন দেওয়া হয় এবং তারই ভিত্তিতে ১৩৩৬ সালে সারা ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলায় মুসলমানদের জন্য ছিল বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে ২৫০ টির মধ্যে ১১৯ টি আসন। নির্বাচনে ফজলুল হকের কৃষক প্রজাপার্টি এবং মুসলিম লীগের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী সারা বাংলার আনাচে কানাচে ঘুরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে মুসলিম লীগ প্রার্থিদের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন। এ নির্বাচনে মুসলিম লীগ ৩৯ টি আসনে বিজয়ী হয়। সে সময় বাংলায় শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের বিপুল জনপ্রিয়তার বিপরীতে নড়বড়ে মুসলিম লীগের এ বিজয় অনেক বড় বিজয় এবং এটি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কর্মতৎপরতার জন্যই একমাত্র সম্ভব হয়েছিল বলে সে সময়ের নির্বাচন বিশ্লেষকদের ধারণা। শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিজে দুটি আসনে বিজয়ী হন। এ নির্বাচনে এ.কে. ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি সংখ্যাগরিষ্ট আসন পায় এবং ১৯৩৭ সালের এপ্রিলে এ.কে. ফজলুল হক মুসলিম লীগের সাথে কোয়ালিশান মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং তিনি হন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। এ মন্ত্রিসভায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে শ্রম, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। শ্রম মন্ত্রী হিসেবে তিনি লেবার ওয়েলফেয়ার অ্যাক্ট ও ম্যাটারনিটি বেনিফিট অ্যাক্ট সংসদে পাস করিয়ে নেন। পরে ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও এ আইনের প্রবর্তন করা হয়। এ সময় এ.কে. ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এক যোগে বাংলার কৃষক সমাজের উন্নয়নে কাজ করতে থাকেন এবং বাংলার ঐতিহাসিক ঋণ সালিশি বোর্ড, মানি লেন্ডার্স অ্যাক্ট, বিভিন্ন প্রজাস্বত্ব আইন ও বেঙ্গল টেনেন্সি অ্যামেন্ডমেন্ট বিল আইন সভায় পাস হয়। ১৯৪৩ সালে শেরে বাংলার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার (অর্থাৎ শ্যামা হক মন্ত্রিসভা) পতন হলে খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে পুনরায় মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। এ মন্ত্রিসভায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। এ সময় ১৯৪৩ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বাংলায় দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এ দুর্ভিক্ষ অবশ্য শুরু হয় খাজা নাজিম সরকার ক্ষমতায় বসার আগেই।
অনেকে মনে করেন, এ দুর্ভিক্ষ বাংলা ১২৭৬ সালের মম্বন্তরের চেয়েও ব্যাপক ও ভয়াবহ ছিল। কিন্তু ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক কারণে হয়নি। এজন্য দায়ি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধনীতি। ভারতে ব্রিটিশ সরকার যতটা সম্ভব চাল কিনে বাংলার বাইরে গুদামজাত করে রাখে। জাপানিরা যেন কোনো যানবাহন না পায় সে জন্য সব নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল অথবা ধ্বংস করা হয়েছিল। আন্তঃজেলা, আন্তঃপ্রদেশ খাদ্য সরবারহের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। এ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন বাস, ট্রাক, রেল রিকুইজিশন করে যুদ্ধের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হচ্ছিল। যার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। যাও বা ছিল অতি মুনাফা লোভিরা সুযোগ কাজে লাগিয়ে চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে গিয়েছিল। এমনি এক চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী দায়িত্বভার পেলেন। কিন্তু তিনি বিচলিত হলেন না। তার দূরদর্শিতা এবং কর্মদক্ষতা দিয়ে তিনি এ বিপদ উতরে গেলেন। তার কাজের শুরুতেই তিনি মানুষকে ভয় না পেয়ে আশ্বস্ত করতে একটি বেতার বার্তা দিলেন। অন্য প্রদেশ থেকে খাদ্য আমদানির জন্য তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি যোগাড় করলেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের দুজন দক্ষ অফিসার সঙ্গে নিয়ে তিনি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য একটি কর্ম-পরিকল্পনা তৈরি করলেন। খাদ্যে উদ্বৃত্ত প্রদেশগুলি থেকে খাদ্য ক্রয়ের জন্য তিনি পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন প্রদেশে অফিসার পাঠালেন। কিন্তু যানবাহনের অভাবে সেগুলো আসতে অনেক বিলম্ব হল। তাই তিনি পার্শ্ববর্তী প্রদেশ উড়িষ্যা, বিহার, মধ্যে প্রদেশ ও আসাম থেকে খাদ্যশস্য কেনার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
এ ভাবে তাঁর সমস্ত কর্মী বাহিনী নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শহরের সামর্থবান মানুষ, যাদের খাদ্য কেনা পয়সা ছিল তাদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেন। গরিব মানুষ যাদের খাদ্য কেনার পয়সা ছিল না, যেমন গ্রামের মানুষ তাদের জন্য লঙ্গরখানা খোলা হল। যারা অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে আমশয়, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলো তাদের বিনা পয়সায় চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল খোলা হলো। তিনি নিজে চব্বিশ ঘণ্টা ঘুরে ঘুরে এসব কাজ তদারকি করতেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কঠোর সমালোচকরাও স্বীকার করেছে কর্মবীর সোহরাওয়ার্দীর পক্ষেই কেবল এ ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে।
বাংলায় মুসলিম লীগের রাজনীতি তখন দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে খাজা গ্রুপ এবং সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ। সোহরাওয়ার্দী গ্রুপে ছিলেন তুখোড় বাগ্মী আবুল হাশিম এবং প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ ও কর্মীরা। ১৯৪৬ সালে সারা ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগের অভাবিত বিজয় অর্জিত হল। বলা বাহুল্য মুসলিম লীগের এ বিপুল বিজয়ে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ১৯৪৬ সালে ৩ এপ্রিল ৩ নম্বর ওয়ালেসলি লেনস্থ মুসলিম লীগ অফিসে পালামেন্টারি পার্টির সভায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সর্বসম্মতিক্রমে পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা নির্বাচিত হন এবং তিনি হন বাংলার প্রধানমন্ত্রী।
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দেড় বছরের প্রধানমন্ত্রীত্বকালীন বিনা বিচারে কাউকে আটক করা হয়নি এবং স্বাধীনতা বিপ্লবী মাস্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলার আসামি যারা দীর্ঘ দিন আন্দামানে কারাভোগ করছিল তাদের মুক্তিদান তার আমলের একটি অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ পদক্ষেপ। ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগস্ট ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলো। ভারত হলো স্বাধীন। ভারত বিভক্ত হয়ে জন্ম নিলো নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান। পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পর জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তানে চলে এসে মন্ত্রিসভায় যোগদান করতে অথবা রাষ্ট্রদূত, গভর্নর যে কোনো পদ গ্রহণ করতে অনুরোধ জানান। তখন ভারতীয় মুসলমান এবং পাকিস্তানে হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুঃসময় চলছে। সুযোগ সন্ধানীরা ওঁৎ পেতে ছিলো।
সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন শুরু হলো। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ, বাড়ি দখল কোনো কিছুই বাদ গেল না। ভারতের মুসলমানরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে সব কিছু ফেলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে পালাতে শুরু করলো। অন্যদিকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হিন্দুরাও প্রাণ ভয়ে শূন্য হাতে পাড়ি দিলো ভারতে। চতুর্দিকে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা। এমতাবস্থায় কলকাতার মুসলমানরা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তানে না যেয়ে তাদের পাশে থাকতে অনুরোধ জানালেন। মানব দরদী এই নেতা নিজের শান্তি নিরাপত্তার কথা না ভেবে মন্ত্রিত্বের লোভে প্রলুব্ধ না হয়ে ভারতেই থেকে গেলেন এবং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ালেন । তিনি পাকিস্তান কর্তৃপক্ষকে এই জবাব দিলেন যে, তিনি ভারতীয় মুসলমানদের একটা ব্যবস্থা না করে পাকিস্তানে যেতে পারেন না। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে মহাত্মা গান্ধী দাঙ্গা-বিধস্ত এলাকা পরিদর্শনের জন্য কোলকাতায় এলেন। দাঙ্গায় কিছু মুসলমান এলাকায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখে তিনি শিউরে উঠলেন। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করার অনুরোধ জানালে সোহরাওয়ার্দী ততক্ষণাৎ রাজি হলেন।
(চলবে)
লেখক: অধ্যক্ষ (অব.) চক্কীর্তি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ