১০০ টাকায় চোখের চিকিৎসা পাওয়া যায়

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


এযুগে ১০০ টাকায় চিকিৎসা পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। মফস্বল শহরেও যে কোনো ডাক্তারের প্রাথমিক ভিজিট ৫০০ টাকার কম নয়। এজন্য লাইন ধরতে হয়। ডাক্তারের টার্গেট পূরণ হয়ে গেলে লাইনে দাঁড়িয়েও ফিরে আসতে হয়। যাহোক ১০০ টাকায় চোখের চিকিৎসার কথা শুনে ছুটে গেলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ চক্ষু হাঁসপাতালে। আমার চশমায় সর্বোচ্চ পাওয়ার দেওয়ার পরেও চোখে কম দেখছিলাম। ডাক্তার বলেছিলেন ছানি পড়েছে, অপারেশন করতে হবে। ১০০ টাকার একটা টিকিট কিনে চক্ষু হাস্অপাতালের ওয়েটিং রুমে একটা আসন নিয়ে বসে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক পড়লো। কম্পিউটারে দুই চোখ দেখার পর আমাকে ৪টি টেস্ট করতে বলা হলো। টেস্ট করার পর বলা হলো ডান চোখে বেশি ছানি- ওটা আগে অপারেশন করতে হবে। এজন্য ৩ হাজার টাকা থেকে ৯ হাজার টাকা মূল্যের লেন্স আছে, যে কোনোটি নিতে পারেন। আমি বেশি মূল্যের লেন্স চাইলাম এবং অপারেশনের দিন নির্দিষ্ট করে নিলাম।
নির্ধারিত দিনে চক্ষু হাঁসপাতালে হাজির হতেই হাসপাতালের কোঅর্ডিনেটর কাওসার আলী আমাকে স্বাগত জানিয়ে তিনতলার এক কেবিনে জায়গা করে দিলেন। অপারেশনের পূর্বে কয়েকটা ওষুধ খেতে হলো তারপর অপারেশনের টেবিলে নিয়ে যাওয়া হলো। ডান চোখের কোণে একটা ইনজেকশন ও মলম দিয়ে অবশ করার পর ২০/২৫ মিনিটের অপারেশন হলো। এরপরে চোখে ব্যান্ডেজসহ রাতে ওই কেবিনে কাটাতে হলো। খুব সকালে একজন নার্স এসে ব্যান্ডেজ খুলে চোখ মেলতে বললেন। বুঝতে পারলাম দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়েছে। এরপর শোনানো হলো বিধিনিষেধের ফিরিস্তি। পুরো একমাস কালো চশমা ব্যাবহার করতে হবে, ২১দিন চোখে পানি লাগানো যাবেনা, লেখাপড়া থেকে বিরত থাকতে হবে, ১২ ঘণ্টায় ১৩ ড্রপ দিতে হবে একমাস,ওষুধ চলাকালে হার্টের ওষুধ খাবেন না। চক্ষু হাঁসপাতালের ডাক্তার নার্সরা বেরসিক না বেশি রসিক বুঝতে পারলাম না। ওরাতো জানতো আমি একজন সাংবাদিক। প্রায় তিনযুগ ধরে প্রতিদিন ৪টি দৈনিক পড়ি, ২/৩টি নিউজ লিখি, ল্যাপটপে কম্পোজ করি, অবসরে কম্পিউটারের সাথে দাবা খেলি, মোবাইলে ফেসবুক দেখি। সুতরাং এই বিধিনিষেধ আমার জন্য নির্যাতন বৈকি। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম আমার ছোট ছেলে কর্তৃক মোবাইলে দেয়া তিন সহস্রাধিক বিভিন্ন শিল্পীর বাংলা ও হিন্দি গান শুনে সময় কাটাবো। বিধিনিষেধ অন্তে আমাকে চক্ষু হাঁসপাতাল থেকে হাঁসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে করে আমার বাড়িতে পৌঁছে দিলেন কাওসার আলী। এছাড়া চক্ষু সার্জন ডা. ময়েজউদ্দিন সহকারী শহিদুল ইসলাম, রবিউল ইসলাম, লতিফাসহ নার্সদের মার্জিত ব্যবহার প্রশংসনীয়।
আমি ২০০৮ দাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চিকিৎসা সহায়তা কেন্দ্রের সভাপতি ছিলাম। এসময়ে ৪টি চক্ষু শিবিরের আয়োজন করি। দিনাজপুর বিএনএসবি চক্ষু হাঁসপাতালের ডাক্তারদের সহযোগিতায় এখানে ছানী রোগী শনাক্ত করে তাদের বাস ভাড়া করে দিনাজপুর নিয়ে যেতাম এবং অপারেশন শেষে একই বাসে করে পরদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফিরে আসতাম। এভাবে ৪৮০ জনের ছানী অপারেশন করিয়েছি। রোগীদের কাছ থেকে একটি পয়সাও নেয়া হয়নি। বাসভাড়া ও অন্যান্য খরচ আমরা স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভিক্ষা করে সংগ্রহ করেছি। অর্থ সংগ্রহ যেমন ছিল কষ্টকর তার চেয়ে বেশি কষ্টকর ছিল প্রায় ৩৫০ কি.মি. পথ বাসে যাওয়া এবং আসা। বিশেষত রোগীদের জন্য বড়ই কষ্টকর। এই কষ্টের অবসান করেছে চাঁপাইনবাগঞ্জ চক্ষু হাঁসপাতাল। এ যে কতবড় উপকার তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এখানেও বিনা পয়সায় ছানি অপারেশন হয়, তবে কোনো দাতা সংস্থা যোগান দিলেই তা সম্ভব। ইতঃমধ্যে এভাবে দেড় সহস্রাধিক রোগীর ছানি অপারেশন হয়েছে। দিনাজপুর বিএনএসবি হাঁসপাতালকে যেমন জার্মানির একটি সংস্থা বিন পয়সায় লেন্স সরবরাহ করে তেমনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ চক্ষু হাসপাতাল পেলে নিয়মিত ছানি অপারেশন পেতে পারে গরিব মানুষ।
এই মফস্বল শহরে অতি স্বল্প মূল্যে সহজে সুলভে চোখের চিকিৎসা পাওয়ার জন্য যাদের অক্লান্ত চেষ্টায় এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে তাদের মহান অবদানকে স্বীকার না করে পারা যায়না। তাদেরই একজন প্রয়াত প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম। সারা জীবনটাই তিনি সাদামাটা ভাবে কাটিয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হলেও তিনি সবসময়ই ছিলেন সাধারণ মানুষের কাতারে। তারই উদ্যোগে এখানে প্রথম গড়ে ওঠে ডায়াবেটিক হাঁসপাতাল এবং পরে চক্ষু হাঁসপাতাল। এদুটি প্রাতিষ্ঠান গড়ার জন্য তিনি দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে অর্থ সংগ্রহ করেছেন এবং প্রতিষ্ঠিত করে ছেড়েছেন। অথচ তিনি কোনো পদ পদবি গ্রহণ করেননি। কন্ঠশিল্পী আব্দুল জাব্বারের একটি গানের কলি ,”প্রতিদিন কত খবর আসে, কাগজের পাতা ভরে- জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে’ এর মতই তিনি অগোচরেই থেকে গেছেন। এমনি আরেকজন মানুষ প্রকৌশলী খাদেমুল ইসলাম ফিকসন। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ২০০০ সালে জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখা কমিটি গঠিত হয়। সাধারণ সম্পাদকের হাল ধরেন খাদেমুল ইসলাম। ওই বছরেই শহীদ সাটু হলে চক্ষু চিকিৎসার প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয় .২০০৩ সালে তৎকালীন পৌর মেয়র মইনুদ্দিন মন্ডল পৌরসভাধীন দেড় বিঘা জমি রেজিস্ট্রি মূল্যে দান করেন। সমতির নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৯ সালে সেখানে একটি দোতালা ভবন তৈরি করে চিকিৎসা চলতে থাকে। ২০১৫ সালে সরকারের অনুদানে ১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যায়ে নির্মিত হয় ৬তলা বিশিষ্ট এক বিশাল ভবন। সাধারণ সম্পাদক খাদেমুল ইসলাম ২৪ ঘণ্টা মিস্ত্রিদের সাথে থেকে নিরলস শ্রম দিয়েছেন। তাকে নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেছেন বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষঞ্জ ডা. আয়াজউদ্দিন আয়াজ এবং সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রয়াত প্রফেসর তরিকুল ইসলাম। খাদেমুল ইসলাম একনাগাড়ে ১৭ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি সাধারণ সম্পাদক না থাকলেও সংগঠনের প্রতি রয়েছে তীক্ষœ নজর এবং অকৃত্রিম ভালবাসা।
তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন ৩/৪ শত রোগী হয়। রোগীদের ফি , প্যাথলজি টেস্ট, ও অপারেশন বাবদ মাসিক কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা আয় হয়। তা থেকে প্রতিষ্ঠানের ৩৫ জন কর্মকর্তা কর্মচারীকে বেতন ভাতা প্রদান সহ অন্যান্য খরচ করতে হয়। যৎসামান্য যা সঞ্চয় হয় তা দিয়ে প্রয়জোনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এমন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান জেলায় জেলায় গড়ে উঠুক এই প্রত্যাশা করি। তবে পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা কমিটিকেও স্বচ্ছ ও সেবামূলক মনোভাবের হতে হবে।
লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট