১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস এ সময়ে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষ যত্ন

আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০২১, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

ড. রুমি শাইলা শারমিন:


দেড় বছর সময় ধরে আমাদের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন ঘটেছে। করোনা পরিস্থিতির জন্য আমরা কেউ-ই আগে থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা জীবন যাপন মানিয়ে নিতে চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করেছে শিশুরাও। শিশুরা একদিকে যেমন নিয়মিত স্কুল, খেলার মাঠ, সহপাঠী বন্ধু, শিক্ষকের আদর ও শাসন থেকে বঞ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে পারিবারিকভাবে আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাওয়া আসা, মেলামেশা বা বন্ধু বান্ধবদের সাথে খেলাধুলা থেকেও দূরে থাকতে হয়েছে। মোটকথা, করোনা পরিস্থিতি শিশুদের কে স্বাভাবিক স্বতস্ফূর্ত জীবনের পরিবর্তে চার দেয়ালের আবর্তে একটি বন্দি জীবন এনে দিয়েছিলো। যেখানে শুধুই ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা মোবাইল কে সঙ্গী করে অনলাইন ভিত্তিক পড়াশুনা চলেছে। আর খেলাধুলা বা সময় কাটানো বলতেও সেই মোবাইল গেম অথবা কম্পিউটার গেম অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের সাথে সম্পৃক্ত ছিল অধিকাংশ শিশুরা। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে। আবার নতুন করে তাদের পারিপার্শ্বিকতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। লক্ষ্য রাখতে হবে যে, বিভিন্ন সময় জীবনের এই পরিবর্তনগুলোর সাথে শিশুদের হঠাৎ করে মানিয়ে চলা এত সহজ নয়। শিশুরা বড়দের মতো নিজের সমস্যাগুলো বুঝিয়ে বলতে পারে না। এমনকি নিজেও ঠিক বুঝতে পারেনা যে তার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো নেই। সহজে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেক সময় তাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখা যায়। মনোযোগের অভাব ঘটে, অল্পতেই রেগে গিয়ে খিটখিটে মেজাজ দেখাতে পারে। শিশুর একঘেয়েমি লাগে, বিষণœতা গ্রাস করে। তাই এ সময়ে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ যতœ নেয়া দরকার।
খেয়াল রাখতে হবে, অজান্তেই আমরা যেন তাদের মানসিক নির্যাতনের কারণ হয়ে না যাই। শৈশবে আবেগীয় বিষয়ের বিকাশ ঘটে। তাই এ সময়ে অবহেলা নয়। শিশুর বেড়ে ওঠার সময় যে সমস্ত নেতিবাচক আচরণ আমরা না বুঝে করে থাকি সেগুলোই শিশুর প্রতি মানসিক নির্যাতন। শিশুর সাথে জোরে কথা বলা, কড়া নির্দেশ দেওয়া, রুক্ষ মেজাজ দেখানো, শিশুর প্রতি অমনোযোগী হওয়া, তার মনের কথা না শোনা, মতামতকে গুরুত্ব না দেয়া, কঠিন সমালোচনা করা, লজ্জা দেওয়া, সন্দেহ করা, ভয় বা হুমকি দেখানো, ক্রমাগত দোষারোপ করা, অন্যের সাথে তুলনা করা- এরকম অসংখ্য বিষয়গুলো শিশুর প্রতি মানসিক নির্যাতন। শারীরিক শাস্তি, প্রহার এ ধরনের শারীরিক নির্যাতনও মানসিক নির্যাতনে পরিণত হয়। তাই আমাদের যথেষ্ট সজাগ হতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে দুই থেকে ১৪ বছরের ১০০ কোটি শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
শিশু বিকাশের আবেগ অনুভূতি সম্পর্কে অভিভাবক বা শিক্ষকের অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় পারিবারিক ভাবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুরা বঞ্চিত হয় সঠিক মানসিক যতœ থেকে। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত শিশুরা কারখানার মালিক কর্তৃক এবং গৃহকর্মী শিশুরা গৃহকর্ত্রী কর্তৃক বঞ্চিত হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, যে সব বাবা-মা নিজেরাও শৈশবকালে অবহেলা পেয়েছেন বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের অজ্ঞতা তারা সন্তানের উপর বা শিশুকর্মী’র উপর আরোপ করছেন। এছাড়াও শিশু বিকাশের ধাপগুলো সম্পর্কে অনেক অভিভাবক জানেন না। আবার কিছু অভিভাবক রয়েছেন শিশুদের অপরিপক্ক আচরণ সহজে মেনে নিতে চান না। মানসিক নির্যাতন কখনো কখনো শারীরিক নির্যাতনের মতো বা তার চেয়েও ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে নজর না দিলে বুদ্ধিমত্তার সঠিক বিকাশ হয়না, সৃজনশীলতা হারায়, পারস্পারিক সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে না, সামাজিক জ্ঞানের বিকাশজনিত সমস্যা হয়। স্বাভাবিক কথোপকথন করতে শেখে না। ফলে নিঃসঙ্গতাকে বেছে নেয়। কম বয়সে স্বাভাবিক আচরণে বাধা পেলে পরবর্তীতে স্বনির্ভর হতে পারে না। মাদকাসক্ত সহ অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে যেতে পারে এবং কেউ কেউ আত্মহননের পথও বেছে নেয়। এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক কালের একটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা উল্লেখ করছি। মোটা বলে লজ্জা দেয়ার কারণে খাওয়া কমাতে কমাতে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামিনকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছি আমরা। অবুঝ ও অসচেতন মানুষ জানতেই পারে না যে শিশুদের কে সমালোচনা করলে বা কালো, খাটো, মোটা নানা কারণে বডি শেমিং করলে শিশুর মানসিক বিপর্যয় কতটা বেড়ে যায়! শিশুদের কষ্ট বা লজ্জা দেওয়ার উদ্দেশ্যে যারা করে থাকেন তাদের এটি একটি মানসিক ব্যাধি। এই মানসিক ব্যাধি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। এই ব্যাধি নির্মূলে দ্রুত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হোক এটাই আমাদের কাম্য।
এমন অনেক অভিভাবক রয়েছেন শুধু ভালো খাবার খাওয়ানো ও ভালো ভালো শিক্ষক দিয়ে পড়ানোর পেছনে অগাধ টাকা পয়সা খরচ করে থাকেন সন্তানের উন্নত জীবনের জন্য। অথচ সারা বছর সন্তানটির সাথে একান্তে কথা বলা বা সময় দেওয়ার কথা চিন্তা করেন না। পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হলে অপমান করেন, মারধর করেন। এতে শিশুর মানসিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে ২০১১ সালে হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিপত্র এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আদেশ জারি করেছে। ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৭০ ধারাতেও শিশুকে আঘাত বা অবহেলাসহ মানসিক বিকৃতির শিকার হলে তাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা হয়েছে। শিশুদের প্রতি যে আইন রয়েছে পাশাপাশি বাবা-মা, অভিভাবক, শিক্ষক, প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন ও আন্তরিকতা বেশ জরুরি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৯% অভিভাবক মনে করেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুর জন্য শাস্তির বিধান থাকা দরকার। আসলে নির্যাতন, শাস্তি, অবহেলায় যে ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে সে সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকে গেছে অভিভাবকের মধ্যে। তাই আইন থাকলেও শিশুর মানসিক বিকাশে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অভিভাবক এবং শিক্ষকদের জন্য সভা-সেমিনার, কাউন্সিলিং প্রয়োজন। অভিভাবক এবং শিক্ষক পজিটিভ প্যারেন্টিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। তাহলে শিক্ষাদান পদ্ধতি শিশুদের জন্য আনন্দময় হয়ে উঠবে। শিশুদেরকে ইতিবাচক আচরণে উৎসাহিত করতে হবে। শিশুদের না-বলা কথাগুলো শোনার চেষ্টা করতে হবে। আবেগ, অভিমান চাওয়া-পাওয়া বুঝতে হবে। অতি শাসন বা অতি আদর নয়, তাদের আত্মসম্মানের জায়গাতে আমাদের ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট থেকে অভিভাবকগণ প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। প্রচার মাধ্যমগুলো থেকে এ বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানগুলো নিয়মিত শোনা যেতে পারে। এ বিষয় সম্পর্কিত ভালো বই পড়া বা অনুকরণীয় অনুসরণীয় বাবা-মায়ের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন কোনটা করণীয় কোনটা বর্জনীয়। সেভাবে সন্তানকে গড়ে তুলতে হবে।
মনে রাখতে হবে- প্রতিবন্ধী শিশু, গৃহকর্মী শিশু, শ্রমজীবী শিশু, আমার ঘরের শিশু সন্তান- প্রত্যেকেই এক একটি আগামী দিনের সম্ভাবনাময় পরিপূর্ণ মানুষ। শিশুদের প্রতি আমাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। শিশু সংবেদনশীল সমাজ গঠনে আমাদের সকলের দায়িত্ব রয়েছে। আইনের পাশাপাশি বাবা-মা, শিক্ষক, অভিভাবক, সমাজকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী সকলের নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্তরিক হতে হবে। শিশুদের অধঃস্তন না ভেবে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। করোনাকালে এমনিতেই প্রতিটি শিশুর কিছু না কিছু মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় ঘটেছে। শিশুর শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ঘটুক, সকল রকম পরিস্থিতির সাথে সঠিকভাবে খাপ খাইয়ে চলতে শিখুক – এ ব্যাপারে শিশুদের প্রতি আমরা আরও সচেতন দৃষ্টি দেবো। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক: সাইকোলজিস্ট, কবি, কলামিস্ট