১০ এপ্রিল

আপডেট: এপ্রিল ১২, ২০২০, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

১৯৬৪ সালের ১০ এপ্রিল চট্টগ্রামে দেওয়া একটি ভাষণে বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেমের অসাধারণ পরিচয় পাওয়া যায়। ইত্তেফাক পত্রিকায় এই ভাষণের যে অংশবিশেষ ছাপা হয়েছে তা এ রকম, ‘এই দেশ আমার, এই মাটি আমার, এই নদী আমার। এই দেশের সত্যিকার মুক্তির জন্য, এই মাটির আজাদীর জন্য, এই বাতাসকে নির্মল করার জন্য, এই নদীতে জোয়ার আনার জন্য আওয়ামী লীগ সংগ্রাম করিয়া যাইবে। শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু ফাঁসির রক্তের প্রতি ফোঁটা হইতে লক্ষ লক্ষ মুজিব জন্মগ্রহণ করিয়া সংগ্রাম জোরদার করিবে।’
১৯৬৬ সালের ১০ এপ্রিল ৬ দফা দাবী নিয়ে বঙ্গবন্ধু দিনাজপুরে জনসভা করেন। জনসভা শেষে বঙ্গবন্ধু ৬ দফার ব্যাখ্য নিয়ে রাজশাহীতে জনসভা করার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে বাংলাদেশের প্রথম সরকার (মুজিবনগর সরকার) গঠিত হয়েছিল মেহেরপুরে বৈদ্যনাথতলায়। এই সরকার গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনই। আমাদের সংবিধানের ১৫০ (২) অনুচ্ছেদের ৭ম তফসিলে এই সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি সন্নিবেশিত আছে। সেখানে শেষ পৃষ্ঠায় বলা আছে ‘এতদ্বারা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি থাকিবেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রজাতন্ত্রের উপ-রাষ্ট্রপতি থাকিবেন এবং রাষ্ট্রপতি প্রজাতন্ত্রের সকল সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হইবেন’ …. ‘আমরা আরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে কার্যকর হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।’ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার তারিখ থেকেই বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং সেদিন থেকে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন এই স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি।
কেন বঙ্গবন্ধুকেই প্রথম রাষ্ট্রপতি করা হলো এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে? এর উত্তর রয়েছে আরেকটু পেছনে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে যে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল সেই নির্বাচনে পাকিস্তানের জনগণ সরকার গঠনের ‘ম্যান্ডেট’ দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী আমাদের মতো ‘আউটক্লাসড’ দের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা দিতে চায়নি। যুদ্ধ যখন অনিবার্য হয়ে যায় এবং জনগনের ম্যান্ডেট যেহেতু আগে থেকেই ছিল, সেহেতু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই মুজিবনগর সরকার গঠন সহজ হয়ে যায় এবং সেই সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আর কোন অবকাশ থাকে না। তারপরও একটি মামলা হয়। অষ্টম সংশোধনী মামলায় [আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ ৪১ ডিএলআর, ১৯৮৯ (এডি) ১৬৫] মুজিবনগর সরকার কর্তৃক গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট সংবিধানের মূল সূচনা (এবহবংরং ড়ভ ঃযব ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ) হিসেবে আখ্যা দেয়।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়। যা প্রবাসী সরকার নামে খ্যাত। এই সরকারের কাঠামো ছিল নিম্নরূপঃ
রাষ্ট্রপতি- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানে কারাগারে বন্দী), সৈয়দ নজরুল ইসলাম- উপ-রাষ্ট্রপতি (অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও সর্বাধিনায়ক), তাজউদ্দিন আহমেদ -প্রধানমন্ত্র¿ী, এম. মনসুর আলী-অর্থমন্ত্রী, এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান-স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পূর্ণবাসন মন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহম্মেদ-পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী।
এছাড়াও প্রধান সেনাপতি হিসেবে এম এ জি ওসমানী এমএনএ, চিফ অফ স্টাফ-আব্দুর রব, বিমান বাহিনীর প্রধান-একে খন্দকার দিগকে সরকারী অংশ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। এটিই বাংলাদেশে প্রথম গণপরিষদ (সংসদ) এর অধিবেশন। এই দিন সকাল দশটার সময় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে চেয়ারম্যান নির্বাচন ও শপথ গ্রহণ এবং শোক প্রস্তাবের পরে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কীয় প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘জনাব স্পীকার, আজ স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, এর সঙ্গে সঙ্গে আমি চারটি স্তম্ভকে স্মরণ করতে চাই, যে স্তম্ভকে সামনে রেখে আমাদের দেশের সংবিধান তৈরি করতে হবে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা গণতন্ত্র দিতে চাই এবং গণতন্ত্র দিতেই আজ আমরা এই পরিষদে বসেছি। কারণ, আজ আমরা যে সংবিধান দেব, তাতে মানুষের অধিকারের কথা লেখা থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ জনগনের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এমন সংবিধানই জনগনের জন্য পেশ করতে হবে। আজ এখানে বসে চারটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য এমন সংবিধান রচনা করতে হবে, যাতে তাঁরা দুনিয়ার সভ্য দেশের মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।’ [সূত্র: দৈনিক বাংলা, ১১ এপ্রিল, ১৯৭২]