‘১০ মিনিটে মিলবে অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয়’

আপডেট: এপ্রিল ২০, ২০২১, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

শাহিনুল আশিক:


পরিচয়হীন লাশ। উদ্ধারের পরেও দীর্ঘ দিন থাকে মর্গে। মর্গের খাতায় নামের জায়গায় লেখা হয় ‘অজ্ঞাত’। পুলিশের কাগজপত্রেও তাই। ঠাঁই হয় মর্গের ফ্রিজে। এক সময় কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অজ্ঞাত মরদেহটি দাফন করে। তবুও থেকে যায় অজ্ঞাত। অথচ স্বজনরা জানে না প্রিয়জনের এমন খবর। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে যায় অপেক্ষায়। শেষ-মেস ভুলে যেতে বসে পরিবারও। কিন্তু মৃত্যুর আগেও এই মানুষটির ছিল পরিচয়, ছিল বাবা-মা ভাই-বোন বা অন্য কোনো স্বজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন- অজ্ঞাতনামা মরদেহের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় পরিবার যেমন তাদের খোঁজ পায় না, তেমনি মামলার রহস্যও উদ্ঘাটিত হয় না। তবে অজ্ঞাতনামা মানুষের মৃতদেহ পাওয়া গেলে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব। তবে মরদেহের ফিঙ্গার প্রিন্ট কমপক্ষে ৬০ শতাংশ মেশিনে সাপোর্ট করতে হবে। তাহলে ওই অজ্ঞাতনামা মরদেহের সব তথ্য পাওয়া যাবে। এমনভাবে অনেক জটিল মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে-রাজশাহী পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পিবিআই রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পিবিআই আবুল কালাম আযাদ জানায়- প্রযুক্তি ব্যবহারে মাত্র ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে পরিচয় পাওয়া সম্ভব। একজন জীবিত ও সতেজ মানুষের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩ সেকেন্ড সময় লাগে। আর মৃত মানুষের ক্ষেত্রে ১০ মিনিট সময় লাগে। যদিও মৃত ওই মানুষটির ফিঙ্গার প্রিন্ট কাজ না করে তাহলে অন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
তিনি আরও জানান, অনেক সময় মরদেহ পঁচে-গলে যায়। সেই ক্ষেত্রে অন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয় আমাদের। সবমিলে মরদেহের ৬০ শতাংশ ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিনে সাপোর্ট করলে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব। এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা রাজশাহীর বেশিকিছু আলোচিত হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করেছেন।
সর্বশেষ শুক্রবার (১৬ এপ্রিল) নগরের অদূরে সিটি হাট থেকে ৩০০ গজ পশ্চিমে একটি ডোবায় ড্রামের মধ্যে লাশ দেখে স্থানীয়রা শাহমখদুম থানায় খবর দেয়। এসময় পুলিশের সর্বোচ্চ চেষ্টায় মেলেনি নিহত ওই তরুণীর পরিচয়। থানা-পুলিশ যখন তার নাম-পরিচয় বের করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ঘটনাস্থলে আসে পিবিআই সদস্যরা। এরপরে আসে ডিবি ও সিআইডি। তারাও পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করে লাশ নিয়ে।
ঘটনাস্থলে পিবিআই কর্মকর্তারা এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন নিজেদের একটি ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে। ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার’ দিয়ে ওই তরুণীর আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করেন তারা। এরপর নির্বাচন কমিশনের তথ্যভা-ার থেকে তাঁর পরিচয়ের পুরো তথ্য নিয়ে আসা হয়। তারা বলছেন, যেসব ব্যক্তির তথ্য নির্বাচন কমিশনের তথ্যভা-ারে আছে, তাদের পরিচয় ঘটনাস্থল থেকেই বের করা সম্ভব।
এরপরে পিবিআই জানতে পারে ওই তরুণীর নাম-পরিচয়। তার নাম শ্রীমতি ননিকা রানী রায় (২৩)। শুরু হয় অনুসন্ধান। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসতে থাকে থলের বিড়াল। ঘটনার পেছনে জড়িতদের খুঁজতে মাঠে নামে পিবিআই সদস্যরা। ওই নিহত তরুণীর বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলায় যান পিবিআই সদস্যরা। এর পরে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়- ওই তরুণীর যোগাযোগ ছিলো কার সাথে।
ওই ব্যক্তিকে শনাক্তে জোর তৎপরতা চালায় পিবিআই। বেরিয়ে আসে পুলিশ কনস্টেবল নিমাই চন্দ্র সরকারের (৪৩) নাম। তার বাড়ি পাবনার আতইকুলার চরাডাঙ্গা গ্রামে অভিযান চালানো হয়। সেখানে না পেয়ে নাটোরের লালপুরে বোন-জামাইয়ের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় নিমাই চন্দ্রকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এক পর্যায়ে জড়িতের কথা স্বীকার করে। এসময় ৫-৬ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছাড়াও নিজে জিআরপি থানায় কর্মরত বলে জানায় পিবিআইকে। এর আগে স্বজনের অসুস্থতার কথা বলে ছুটিও নিয়েছিলেন নিমাই বলে পিবিআইকে জানায়। পরে নিমাইসহ বাকি সহযোগীদের গ্রেফতার করা হয়। একে একে খুলতে থাকে মামলার জট। বেরিয়ে আসে হত্যাকা-ের পেছনের রহস্য।
এসময় গ্রেফতারকৃত নিমাই হত্যাকা-ের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে আসামিরা কে কী কাজ করেছে তাও বলে। পিবিআই জানায়- গ্রেফতারকৃত কবির আহম্মেদ (৩০), সুমন আলী (৩৪) ও আব্দুর রহমানকে (২৫)। হত্যাকা-ের মামলায় আদালতে চালান দেওয়া হবে। এছাড়া রিমান্ড আবেদন করা হবে।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশি কিছু বড় বড় ঘটনার রহস্যও উদঘাটন করেছে। এর উল্লেখযোগ্য ২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর পবায় ১২ বছরের শিশু হাসিনাকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। তিন বছর পরে হত্যাকা-ের রহস্য উদ্ঘাটন করে পিবিআই। হত্যাকা-ের সাথে জড়িত থাকার দায়ে নাজমুল হককে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল নগরের আবাসিক হোটেল নাইসের একটি কক্ষ থেকে মৃত অবস্থায় রাবির ইসলামের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মিজানুর রহমান এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সুমাইয়া নাসরিনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার দেড় বছর পর মুঠোফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে পিবিআই এই হত্যাকা-ের রহস্য উদ্ঘাটন করে। এতে হোটেলের দুই কর্মচারীসহ ছয় আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়।
এছাড়া ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর মা আকলিমা খাতুন (৪৫) ও ছেলে জাহিদুল ইসলাম (২৫) নিজ ঘরে খুন করা হয়। বাগমারা দেউলা গ্রামে হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটন করে পিবিআই। তারা গ্রেফতার করে সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তিকে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা আদালতে আওয়ামী লীগের নেতা আবুল হোসেন ওরফে আবুল মাস্টারকে এ হত্যাকা-ের মূল হোতা হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।