১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ হানাদারমুক্ত হতে থাকে দেশের বিভিন্ন স্থান

আপডেট: ডিসেম্বর ১৪, ২০২১, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দেশের বিভিন্ন স্থান হানাদারমুক্ত হয়। পাকসেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বগুড়ার পৌর এডওয়ার্ড পার্কে ওড়ে বিজয়ের পতাকা। এর আগে হানাদার বাহিনি বগুড়া শহরের দখল নিতে ভারি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কয়েক দফা আক্রমণ চালায়। কিন্তু মুক্তিসেনারা বীরত্বের সঙ্গে ওই আক্রমণ প্রতিহত করেন।

১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তান হানাদারদের হটিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে শত শত মুক্তিযোদ্ধা ফাঁকা গুলিবর্ষণ ও উল্লাসের মধ্য দিয়ে জয়পুরহাটের ডাকবাংলোতে প্রবেশ করেন। পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনি ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদররা তখন পালিয়ে বগুড়া ও ঘোড়াঘাটের দিকে ছুটে যায় জীবন বাঁচাতে। জয়পুরহাটের ডাকবাংলো প্রাঙ্গণে প্রথম স্বাধীনতার বিজয় কেতন সোনালি বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার খন্দকার আসাদুজ্জামান বাবলু (বাঘা বাবলু)।

এদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সমবেত করার জন্য সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন ভুলু ও আমিনুল ইসলাম চৌধুরী (মুজিব বাহিনির গেরিলা) উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে টিকতে না পেরে ১৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনি রেলযোগে ঈশ্বরদী অভিমুখে পালিয়ে যায়। ১৪ ডিসেম্বর ভোর রাতে হাজার হাজার জনতা ও বিজয়ী মুক্তিবাহিনি জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে সিরাজগঞ্জ শহর দখল করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

১৪ ডিসেম্বর সকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি দল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে টাঙ্গাইল থেকে বিতাড়িত হয়ে ঢাকার পথে জিরাবো এলাকার ঘোষবাগ গ্রামে এসে পৌঁছালে ঝাঁপিয়ে পড়ে অ্যামবুশ পেতে থাকা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর গেরিলা বাহিনী। উচ্ছ্বসিত কিশোর টিটু সহযোদ্ধাদের নিষেধ উপেক্ষা করে গুলি করতে করতে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন। হঠাৎ একঝাঁক তপ্ত বুলেটের আঘাত ঝাঁঝরা করে দেয় কিশোর প্রাণটিকে। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা দশম শ্রেণির ছাত্র গোলাম মোহাম্মদ দস্তগীর টিটুর রক্তে মুক্ত হয় সাভার।

এদিন ভোর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে পলায়ণপর হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনির বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে চলতে থাকে মরণপণ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। রুপসদী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা পলায়ণপর পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপর গুলিবর্ষণ করতে করতে এগিয়ে যায়। পাকিস্তানিরাও এমএমজি দিয়ে ননস্টপ পাল্টা ফায়ার করতে করতে পিছু হাঁটে।
পলায়ণপর পাকিস্তানি সৈন্যরা ধাওয়া খেয়ে তাদের কাছে থাকা একটি ছোট লঞ্চ দিয়ে তিতাস নদী পেরিয়ে তিতাসের পার ঘেঁষে ঘাগুটিয়া গ্রামে একটি বড় পাকা মসজিদে শক্ত অবস্থান নেয়। তখনো পাকিস্তানি সৈন্যদের অনেকেই নদী অতিক্রম করতে পারেনি। তিতাস নদী অতিক্রমের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে বেশকিছু পাকিস্তানি সৈন্য মারা যায় ও আহত হয়। কিছু সৈন্য তিতাস নদীতে ডুবে মরে।

এদিন পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছ থেকে প্রচুর গুলিসহ পাকা জলপাই রঙের একটি এমএমজি উদ্ধার করে মুক্তিযোদ্ধারা। প্রচ- গোলাগুলিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠে বাঞ্ছারামপুর হোমনার বিরাট এলাকা, কেঁপে কেঁপে ওঠে শান্তশিষ্ট কাজলকালো তিতাস নদীর জল। ১৪ তারিখে যুদ্ধের মধ্যেই উজানচর গ্রামের এক নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে একটি পাকিস্তানি সৈন্যের লাশ নিয়ে যায়। পরে ওই লাশকে ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়ে মনের আক্রোশ মেটায় নারীরা।

এদিন মিত্র-মুক্তিবাহিনী বিজয়ীর বেশে চার দিক থেকে ঢাকার দিকে এগিয়ে আসে। যৌথ বাহিনি তথা ভারতীয় সেনাবাহিনির প্রধান জেনারেল মানেকশ বিভিন্ন ভাষায় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনিকে আত্মসমর্পণের বাণী লিফলেট করে আকাশে ছড়িয়ে দেন। ১৪ ডিসেম্বর বিকেলে ভারতীয় মিগ-২১ জঙ্গি বিমান কোনো ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই ঢাকার নীলাকাশে উড়তে থাকে। প্রচারপত্রে পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, তারা আত্মসমর্পণ করলে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তাদের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ।

একাত্তরের এই দিনে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর শহিদ হন। গেরিলাদের সঙ্গে অপারেশনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের যুদ্ধে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। মহানন্দা নদী পেরিয়ে তিনি একের পর এক শত্রু বাংকার দখল করে যখন প্রবল বিপদ উপেক্ষা করে এগোচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ মাথায় গুলি লাগে তার। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে।

তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী সোনামসজিদ প্রাঙ্গণে ৭ নং সেক্টরের প্রথম সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক এর পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। তার সম্মান ও স্মৃতি রক্ষার্থে শাহাদতস্থল রেহাইচরে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়। মহানন্দা নদীর উপর প্রথম নির্মিত সেতুর নামকরণ করা হয় এই বীর শ্রেষ্ঠর নামে।

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পাকিস্তানি সেনা ও সীমান্তরক্ষীদের দৃষ্টি এড়িয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম এলাকা অতিক্রম করে শিয়ালকোট সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় এলাকায় প্রবেশ করেন। পরে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার মহদিপুরে মুক্তিবাহিনীর ৭নম্বর সেক্টরে সাব সেক্টর কমান্ডার হিসাবে ৩ জুলাই যোগ দেন। তিনি সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হকের অধীনে যুদ্ধ এবং সাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

উল্লেখ্য, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার রহিমগঞ্জ গ্রামে ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর পিতার নাম মৌলভী আব্দুল মোতালেব হাওলাদার ও মাতা মোসাম্মত সাফিয়া বেগম।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনি ও তাদের সাথে রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনি বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে তাদের নির্যাতনের পর হত্যা করে। চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে থাকায় স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাযজ্ঞ সংগঠিত হয়। পরবর্তীতে ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে গণকবরে তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর নিকট আত্মীয়রা মিরপুর ও রাজারবাগ বধ্যভূমিতে স্বজনের মৃতদেহ শনাক্ত করেন।

অনেকের দেহে আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা, কারো কারো শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। যা থেকে হত্যার পূর্বে তাদের নির্যাতন করা হয়েছিল সে তথ্যও বের হয়ে আসে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সংকলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা থেকে জানা যায়, শহিদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট ১ হাজার ৭০ জন।

২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি “শহীদ বুদ্ধিজীবী”দের সংজ্ঞা চূড়ান্ত করা হয়। সংজ্ঞা অনুযায়ী,

“১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত সময়কালে যেসব বাঙালি সাহিত্যিক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, রাজনীতিক, সমাজসেবী, সংস্কৃতিসেবী, চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকা-ের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং এর ফলে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী কিংবা তাদের সহযোগীদের হাতে শহীদ কিংবা ওই সময়ে চিরতরে নিখোঁজ হয়েছেন, তাঁরা শহীদ বুদ্ধিজীবী।”[৫]