১৫৯তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় : ‘বাঙালি লেখকগণের শীর্ষস্থানীয়’

আপডেট: মার্চ ১, ২০২১, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

মো. সফিকুল ইসলাম:


প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বির্নিমাণে আজীবন নিবেদিত ছিলেন। বন্ধুপ্রতীম ঐতিহাসিককে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ‘যুগশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক’ স্বীকৃতি দিয়ে নির্দ্বিধায় বলেন, ‘বাঙ্গালা ইতিহাসে তিনি যে স্বাধীনতার যুগ প্রবর্ত্তন করিয়াছেন সেজন্য তিনি (অক্ষয়কুমার) বঙ্গসাহিত্যে ধন্য হইয়া থাকিবেন (ভারতী, জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৫)।’ বাংলার ইতিহাসচর্চার জনকখ্যাত অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব অক্ষয়কুমার বিজ্ঞানসম্মতপদ্ধতিতে বাঙালি জাতির ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ। আজ ১ মার্চ, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের ১৯৫৯তম জন্মদিন।
অক্ষয়কুমারের অক্ষয়কীর্তি বাংলার ইতিহাসচর্চার অন্যতম প্রধান পাদপীঠ ‘বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ (পূর্বেকার ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’)। বাংলাদেশের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক মিউজিয়াম ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ‘বরেন্দ্র মিউজিয়াম মিউয়িাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। তিনি সু-দীর্ঘ দুইদশক মিউজিয়ামের পরিচালক পদে কাজ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ সঞ্চয় করে গেছেন সহযাত্রীদের সহযোগিতায়। মিউজিয়ামে প্রথম ৩২টিসহ শ্রেষ্ঠ প্রত্ননিদর্শনগুলো সংগৃহীত হয়েছে অক্ষয়কুমারের যুগে। বাঙালি বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠাতা কুমার শরৎকুমার রায়ের অর্থায়নে পাহাড়পুর মহাবিহার, নওগাঁর মাহিসন্তোষ, গোদাগাড়ীর প্রদ্যূ¤েœশ্বর দিঘী ও তৎসংলগ্নসহ দেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থল উৎখনন ও প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহের প্রধান স্থপতি ছিলেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়।
বাংলার ইতিহাসচর্চার মহান সাধক অক্ষয়কুমারের জন্ম ১৮৬১ সালের ১ মার্চ, তৎকালীন নদীয়ায় (বর্তমান কুষ্টিয়া)। অক্ষয়কুমারের পরিবারের পূর্বপুরুষের বাস ছিল রাজশাহীতেই। ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ায় বসতি শেষে রাজশাহীর মানুষ আবার রাজশাহীতেই ফিরে আসেন সগৌরবে। এখানেই শিক্ষা-বসতি, বিয়ে-সাদী-সংসার, ওকালতি, সাহিত্যকর্ম, বাংলার ইতিহাস রচনা, ঐতিহাসিক হয়ে ওঠা, কবিগুরু ও কুমার শরৎকুমার রায়ের সাথে নিবিড় বন্ধুত্বে কাজ করা, প্রতœনিদর্শন সংগ্রহ, রাজশাহীর হাজার বছর আগের ভাস্কর ধীমান ও বীতপালের অনুসন্ধান, রেশম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, নাট্যচর্চা, ক্রিকেটার, চিত্রকর, শিক্ষা-সাহিত্য-ইতিহাস-সাংস্কৃতিক কর্মে নেতৃত্ব ও একচ্ছত্র অধিনায়ক, শিক্ষা-পরিচর-সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, উত্তরবঙ্গ সাহিত্য পরিষৎ-এর প্রতিষ্ঠা এবং সম্মিলনের সভাপতি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদৎ-এর রাজশাহী শাখা প্রতিষ্ঠা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদৎ সহকারী-সভাপতি, বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের সপ্তম অধিবেশনের ইতিহাস শাখার প্রথম সভাপতি, রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার, প্রথম বিশ^যুদ্ধের জন্য বাঙালি তরুণদের বাছাই ও বাঙালি পল্টন গঠন, লোকাল বোর্ড ও ডিষ্ট্রিক বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী, রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক, বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, রাজশাহী ছাত্রসভা, কলিকাতা স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনে জড়িত থাকা, ব্রিটিশ-রাজ সরকার প্রদত্ত ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদক (১৯১৫), সিআইই (CIE, Companion of the Order of the Indian Empire, 1920) সম্মাননা লাভ এবং সর্বোপরি বাংলার ইতিহাসচর্চার জনকের খ্যাতিলাভের গৌরব রাজশাহীর মাটিতেই পেয়েছেন। মৃত্যুর পর শেষকৃত্য হয় রাজশাহীতেই। বাংলার এই অমর সন্তানের দেহভস্মের ছাই এই পদ্মাতেই বিলীন হয়েছে।
১৮৭৮ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা, ১৮৮০ সালে রাজশাহী কলেজ হতে এফএ পাশ করেন, উভয় পরীক্ষাতে তিনি রাজশাহী বিভাগের মধ্যে প্রথম হন। এরপর, ১৮৮৩ সালে কলিকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ, ১৮৮৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বিএল পাশ করে ওই বছরই আইনজীবী হিসেবে রাজশাহী কোর্টে যোগদান করেন। ১৯৩০ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সাথে অক্ষয়কুমার এই পেশায় জড়িত ছিলেন।
অক্ষয়কুমারের বিচিত্র বিষয় নিয়ে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তখনকার শ্রেষ্ঠ পত্রপত্রিকায় দুইশতাধিক প্রবন্ধ অবিচ্ছিন্নভাবে লিখে এবং বহু গ্রন্থ রচনা করে বাংলার ইতিহাসচর্চা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহযোগিতায় ও পরামর্শে অক্ষয়কুমার ১৮৯৯ সালে ৫ জানুয়ারি রাজশাহী মহানগরীর ঘোড়ামারা থেকে প্রকাশ করেন ‘ঐতিহাসিক চিত্র’, এটি ইতিহাসভিত্তিক বাংলার প্রথম ত্রৈমাসিক পত্রিকা। অক্ষয়কুমারের গ্রন্থ : ‘সমরসিংহ’ (১৮৮৩ খ্রি.), ‘সীতারাম রায়’ (১৮৯৮ খ্রি.), ‘সিরাজদ্দৌল্লা’ (১৮৯৮ খ্রি.), ‘মীরকাসিম’ (১৯০৬ খ্রি.), ‘ময়না’ (১৯০৬ খ্রি.), ‘গৌড়লেখমালা’ (১৯১২ খ্রি.), রমাপ্রসাদ চন্দ প্রণীত ‘গৌড়রাজমালা’ সম্পাদনা (১৯১২ খ্রি.), ‘সমরসিংহ’ (১৮৮৩ খ্রি.), ফিরিঙ্গি বণিক (১৯২২ খ্রি.), ‘অজ্ঞেয়-বাদ’ (১৯২৮ খ্রি.) ইত্যাদি। মৃত্যুর পর প্রকাশ হয়, ‘রানী ভবানী’, ‘গৌড়ের কথা’, ‘সাগরিকা’, ‘উত্তরবঙ্গের পুরাতত্ত্ব সংগ্রহ’ গ্রন্থ।
বাংলাভাষায় জনপ্রিয় প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে : বাঙ্গালী, বাঙ্গালীর আদর্শ, বাঙ্গালীর ইতিহাস, বঙ্গ-পরিচয়, বাঙ্গালা ভাষার লেখক, বাঙ্গালীর বল (সমালোচনা), বাঙ্গালীর জীবন-বসন্তের স্মৃতি নিদর্শন, বঙ্গভাস্কর্য-নিদর্শন, মধ্যযুগে বঙ্গদেশ, মানব সভ্যতার আদি উদ্ভবক্ষেত্র, দেশের কথা, বক্তিয়ার খিলজির বঙ্গ-বিজয়, উত্তর-বঙ্গের পুরাতত্ত্ব সংগ্রহ, প্রত্নবিদ্যা, বরেন্দ্র-খনন-বিবরণ, গৌড়কবি সন্ধাকর নন্দী, কান্তকবির স্মৃতি-সম্বর্দ্ধনা, ধীমানের ভাস্কর্য্য লালন ফকির, কাঙ্গাল হরিনাথ, পাহাড়পুর, পৌ-্রবর্দ্ধনের সংক্ষিপ্ত পুনরাবৃত্ত, বাঙ্গালীর জীবন-বসন্তের স্মৃতি, ইত্যাদি। অক্ষয়কুমারের লেখাসমূহ নিয়মিত ছাপা হতো; জ্জ সাহিত্য, ভারতী, প্রদীপ, হিন্দু রঞ্জিকা, গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা, বঙ্গদর্শন, প্রবাসী, বঙ্গবাণী, ভারতবর্ষ, দি মডার্ন রিভিউ, দি জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি, দি রূপম, দি বেঙ্গল পাষ্ট এন্ড প্রেজেন্ট, ইত্যাদিতে।
বিরল প্রতিভাধর বাঙালি অক্ষয়কুমার ৬১ বছর রাজশাহীর মাটিতে বসবাস করে বহুমাত্রিক কাজ করে গেছেন। প্রখ্যাত লেকক শ্রীভবানীগোবিন্দ চৌধুরী যথার্থই বলেন, ‘রাজসাহীতে যাহা কিছু অক্ষয়, তাহাতেই অক্ষয়কুমার ছিলেন’ (ভারতবর্ষ, ‘অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়’, বৈশাখ, ১৩৩৭, পৃ. ৮২৫)। তিনি যেমন ছিলেন রাজশাহীর প্রাণ, তেমনি রাজশাহী ছিল তাঁর প্রাণেরও অধিক। পুরাতত্ত্ববিদ রাজেন্দ্রলাল আচাযের্র অভিমত, জ্জ‘অক্ষয়কুমারের লেখার মত প্রাণস্পর্শী লেখা দেখিয়াছি বলিয়া স্মরণ করিতে পারি না। সে লেখার উচ্ছ্বাস জাতির মর্ম্মকথার উচ্ছাস ছিল। অতলবিস্মৃত ঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করিবার মত তুরী-ভেদী-নাদ তাঁহার লেখার মধ্যে বাজিয়া উঠিতজ্জসে লেখা নাচাইত, দোলাইতজ্জস্মম্ভিত করিয়া দিতজ্জআমরা কি ছিলাম, কি হইয়াছিজ্জআবার কি করিতে পারিজ্জসে লেখা সেইদিকে পাঠকের চিত্ত আকর্ষণ না করিয়া ছাড়িত না ; সময়ে সময়ে সে লেখা উপরে উপরে যতখানি প্রকাশ করিত, ভাবাইয়া তুলিত তাহার অপেক্ষা অনেক বেশি (ভারতবর্ষ, ‘বাঙ্গালার ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়’, মাঘ, ১৩৪৪, পৃ. ২৮০।’
লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়।