১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১: এলো বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ

আপডেট: ডিসেম্বর ১৬, ২০২৩, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ


মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন। রক্তক্ষয়ী দীর্ঘ যুদ্ধের পর এদিন মুক্ত হয় বাংলাদেশ। পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর নির্দেশে এদিন ভোর ৫টা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যুদ্ধবিরতি শুরু করে।
এদিন সকাল ৯টায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের ডিভিশনাল কমান্ডার মেজর জেনারেল গন্ধর্ভ সিং নাগরার বার্তা নিয়ে তার এডিসি ক্যাপ্টেন হিতেশ মেহতা ও ২ প্যারা ব্যাটেলিয়নের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নির্ভয় শর্মা সাদা পতাকা উড়িয়ে মিরপুর ব্রিজের উত্তরপাড় থেকে নিয়াজীর হেড কোয়ার্টারের দিকে রওনা দেয়।
বার্তায় ইংরেজিতে লেখা ছিল, ‘প্রিয় আবদুল্লাহ, আমরা এখন এখানে আছি। আমরা আপনাকে ঘিরে রেখেছি। আপনার খেলা শেষ। আত্মসমর্পণ অথবা ধ্বংস- যে কোনো একটি বেছে নিন। আমরা আপনাকে আশ্বস্ত করছি, আপনি আত্মসমর্পণ করলে আমরা আপনার সঙ্গে জেনেভা চুক্তি অনুসারে ব্যবহার করব। আমি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবেও আশ্বস্ত করছি, আপনার জীবনের ভয় নেই। ইতি মেজর জেনারেল জি সি নাগরা।’
পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজীর চিঠি নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ছত্রিশ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ গাবতলী ব্রিজের পাশে জেনারেল জি.সি নাগরার সাথে সাক্ষাৎ করেন।
১৬ ডিসেম্বর দুপুর ১টার দিকে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার চিফ অফ স্টাফ মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের হেডকোয়ার্টারে চলে আত্মসমর্পণের দলিল তৈরির বৈঠক। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ নিয়াজী, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ। যৌথবাহিনীর পক্ষে ছিলেন মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব, মেজর জেনারেল গন্ধর্ভ সিং নাগরা ও কাদেরিয়া বাহিনীর কমান্ডার কাদের সিদ্দিকী।
সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, আত্মসমর্পণের দলিলে সই করবেন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার, যৌথবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ নিয়াজী।
বৈঠকে ঠিক হয়, আত্মসমর্পণ করলেও তখনই অস্ত্র সমর্পণ করবে না পাকিস্তানি বাহিনী। তখন মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব বলেন, ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে অবশ্যই অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় যুদ্ধবন্দী থাকবে ঠিক, কিন্তু ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে তারা থাকবে সশস্ত্র।
১৬ ডিসেম্বর কলকাতায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে ডেকে ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে থাকার নির্দেশ দেন।
১৬ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টায় কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছান বিমান ও নৌবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ এবং মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার।
এদিন বিকেল ৪টায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ নিয়াজী রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছালে তাকে ২ পক্ষের সেনারা গার্ড অফ অনার দেয়। এরপর বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন। আত্মসমর্পণ দলিলে পাকিস্তানি নৌ-পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার রিয়ার-অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরিফ, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় বিমান বাহিনীর কমান্ডার এয়ার ভাইস-মার্শাল প্যাট্রিক ডেসমন্ড কালাঘানও সই করেন। আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন এ কে খন্দকার। তিনি এ সময় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ভারতের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় ৪র্থ কোরের কমান্ডার লে. জেনারেল ভগত সিং, পূর্বাঞ্চলীয় বিমান বাহিনীর কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরি চাঁদ দেওয়ান ও ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব। আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটল।
আত্মসমর্পণের দলিলে সই হওয়ার পরপরই ঢাকায় উল্লাসে ফেটে পড়ে সাধারণ মানুষ। এখানে-সেখানে মিছিল আর মিছিল। কেউ নাচছে, কেউ বা জড়িয়ে ধরছে একে অন্যকে। রাস্তার ২ পাশে মানুষের সারি। জয়োল্লাসে ফেটে পড়ছে ঢাকা। মুক্তির জয়োৎসবে আবেগে আপ্লুত হয়ে কাঁদছে অনেকে। খোলা ট্রাক, ভ্যান, জিপে করে দোর্দণ্ড প্রতাপে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় যৌথবাহিনীর সদস্যরা। তাদের হাতে চুমু খাচ্ছে মানুষ। কেউ কেউ ভারতীয় বাহিনীর ট্রাকে উঠে পড়েছে। খণ্ড খণ্ড বিজয় মিছিলে মানুষের স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। বিকেল থেকে সারা রাতব্যাপী ঢাকায় বিজয় উল্লাস চলল। এদিন বাড়িতে বাড়িতে রাতভর আলো জ্বলতে দেখা যায়।
১৬ ডিসেম্বর দিল্লিতে লোক-সভার অধিবেশনে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বাংলাদেশের বিজয়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।
১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে খরচের খাতায়। বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি যেন পশ্চিম পাকিস্তানে না ঘটে, সেজন্য নিক্সন প্রশাসন সচেষ্ট হয়ে উঠছে।
এদিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় রাশিয়া ও ভারতকে সংযত হতে হবে।’

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Exit mobile version