১৮৭৩ সালে রাজশাহী কলেজ নামে কোন স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়নি

আপডেট: ডিসেম্বর ১২, ২০১৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

আনারুল হক আনা


শিক্ষানগরী রাজশাহীর গৌরবগাঁথার ইতিহাস রাজশাহী কলেজ। একদা ব্রিটিশ বাংলায় কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের পরেই স্থান ছিল রাজশাহী কলেজের। এটা ছিল পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, বিহার, পুর্ণিয়া ও আসামের অধিবাসীদের উচ্চ শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে রাজশাহী কলেজ স্বাধীন বাংলাদেশের এক বিরল ঐতিহ্য।
একটি স্বতন্ত্র কলেজ হিসেবে রাজশাহী কলেজের সূচনা হয়নি। ১৮৭৩ সালের ১ জানুয়ারি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল তৎকালীন বুয়ালিয়া স্কুলে এফএ (ঋঅ-ঋরৎংঃ অৎঃং) ক্লাস যুক্ত হয়ে রাজশাহী কলেজের বীজ উপ্ত হয়েছিল। এফএ ক্লাস সংযোগ হওয়ার ফলে স্কুলটিকে সেকেন্ড গ্রেড কলেজের মর্যাদা দেয়া হয় এবং নামকরণ হয়েছিল বুয়লিয়া হাই স্কুল।
এফএ ক্লাস সংযোজনের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল তারও পূর্বে। ১৮৭২ সালে দুবলহাটির জমিদার হরনাথ রায় স্কুলে এফএ ক্লাস খোলার জন্য বার্ষিক ৫ হাজার টাকা আয়ের সম্পত্তি দান করেন। ১৮৭৩ সালে এফএ ক্লাস যুক্ত হয়ে স্কুলটি সেকেন্ড কলেজের মর্যাদা লাভ করে এবং নাম হয় বুয়ালিয়া হাই স্কুল। ১৮৭৪ সালে পুঠিয়ার রাণী শরৎ সুন্দরী দেবীর আর্থিক সাহায্যে কলেজের জন্য একটি পাকা ভবন নির্মাণ হয়েছিল। রাজশাহী এসোসিয়েশন ১৮৭৫ সাল ফার্স্ট গ্রেড কলেজে উন্নীতকরণের জন্য সরকারের নিকট প্রস্তাব পেশ করে। এ জন্য দিঘাপতিয়ার জমিদার রাজা প্রসন্ননাথ রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রুপি দান করেন। এরপর পৃথক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজশাহী কলেজ স্বনামে অ্যাফিলিয়েশন পায় এবং বিএ ক্লাস খোলা হয়। ছাত্রদের মাসিক ফি নির্ধারণ করা হয় ৩ রুপি। কলেজের অধ্যক্ষসহ শিক্ষক সংখ্যা নিয়োগ পান ৫জন। প্রথম অধ্যক্ষ নিয়োগপ্রাপ্ত হন এফটি ডাউডিং (ঋ.ঞ.উড়ফিরহম ই.অ.)। বুয়ালিয়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাবু হরগেবিন্দ সেন কলেজের অধ্যাপক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এফটি ডাউডিং ১৮৭৯ সালে যোগদান করেন। তাঁর যোগদানের মাধ্যমেই ফার্স্ট গ্রেড কলেজ হিসেবে স্বনামে রাজশাহী কলেজের যাত্রা আরাম্ভ হয়। রাজশাহী এসোসিয়েশনের প্রচেষ্টায় স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের চাঁদায় ৬০ হাজার ৭০৩ টাকা ব্যয়ে নিজস্ব ভবন নির্মাণ হলে  কলেজের শ্রেণিকক্ষ সেখানে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমান দ্বিতল প্রশাসনিক লালভবন স্থাপন হয়েছিল ১৮৮৪ সালে। এর নির্মাণ কৌশল ও অবয়ব কাঠামো ব্রিটিশ পদ্ধতির। তবে কাঠের ফলকগুলো ছিল চিনা মিস্ত্রির হস্তশিল্প। শত বছরে জরাজীর্ণ হয়ে গেলে সেগুলো পরিবর্তন করে করগেট টিন লাগানো হয়। বর্তমান ভবনটি মেইন বিল্ডিং নামে পরিচিত। ভবনের দোতলায় অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের অফিস, শিক্ষক মিলনায়তন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও সভা কক্ষ আছে। নিচতলায় আছে প্রশাসনিক শাখা, হিসাব শাখা, ক্যাশ শাখা, পরীক্ষা শাখা ও ছাত্রী কমন রুম। ২০১৪ সালে ভবনটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়।
কলেজে ১৮৮১ সালে বিএল ও ১৮৯৩ সালে এমএ ক্লাস খোলা হয়। তবে ১৯৩১ সালের কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ তথ্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক ফজলুল হক। তাঁর যুক্তি হলো, ১৮৮১ সালে বিএল পড়ানো শুরু হলেও অনুমোদন পেয়েছিল ১৮৮০ সালে (দ্র. ক্যালেন্ডার ১ম ভাগ ১৮৯৬, পৃ. ২০৮ ও ক্যালেন্ডার ১৮৮০-৮১,পৃ.১১০)। সম্ভত এমএ ক্লাস অনুমোদন হয়েছিল ১৮৯১ সালে ও সেশন আরম্ভ হয়েছিল ১৮৯২ সালে। কারণ রাজশাহী কলেজ থেকে যে দুজন ছাত্র এমএ পাস করেন তাঁদের নাম পাওয়া যায় ১৮৯৪ সালের গেজেটে। এক বছর এমএ ডিগ্রি দেয়ার কোন বিশেষ ব্যবস্থা থাকলে এটা সম্ভব ছিল।
ক্লাস দুটি ১৬ বছর চালু থাকার পর নতুন বিধি অনুসরণ করে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (ঈধপঁঃঃধ টহরাবৎংরঃু) ১৯০৯ সালে প্রত্যাহার করে নেয়। তখন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন রায় বাহাদুর কুমুদিনী। ক্লাস দুটি বন্ধকে কেন্দ্র করে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তিনি কলমযুদ্ধ চালিয়েছিলেন ১৯২৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত।
জমিদার রাজা পিএন (প্রমদানাথ) রায় বাহাদুরের দান ও সরকারি সহযোগিতায় ১৮৯৪ সালে কলেজের প্রথম হোস্টেল তৈরি হয়। কলেজের মেইনগেটের উত্তরে রাস্তার উত্তর পাশে দক্ষিণমুখি ছিল হোস্টেলটি। ১৯২৩ সাল পর্যন্ত ভবনটি হিন্দু হোস্টেল হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। এরপর টিউটোরিয়াল ও অনার্স ক্লাস অনুষ্ঠিত হতো। পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র হোস্টেল হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। বর্তমানে ভবনটি বিলুপ্ত। তাঁর জায়গায় ২০০৩-২০০৪ সালে গড়ে উঠে রাজশাহী আঞ্চলিক শিক্ষা ভবন।
১৯০১ সালের ১৬ জুলাই বাংলার লেফটেন্টে গভর্নর স্যার জন উডবার্ন কেসিএসআই রাণী হেমন্ত কুমারী বোর্ডিং হাউজ উদ্বোধন করেন। বর্তমানে তা মহারাণী হেমন্ত কুমারী হিন্দু হোস্টেল নামে পরিচিত। একতলা বিশিষ্ট এ হোস্টেলের পূর্ব অংশের ভিতর পাশে উদ্বোধনের শ্বেত ফলকটি এখনও অক্ষত রয়েছে। বর্তমানে হোস্টেলটির মেইনগেটের সাইন বোর্ডে স্থাপনকাল ১৮৯৯ সাল লিখা আছে এবং কোন কোন প্রবন্ধে ১৯০২ সাল পাওয়া যায়। শ্বেত ফলকটির উদ্বোধনের তারিখ ১৬ জুলাই ১৯০১। পুঠিয়ার মহারাণী হেমন্ত কুমারী ১৮ হাজার টাকা ব্যয়ে হোস্টেলটি নির্মাণ করেছিলেন।
মহারাণী হেমন্ত কুমারীই রাজশাহী কলেজ প্রশাসনের আওতায় রাণী হেমন্ত কুমারী সংস্কৃত কলেজ ভবন নির্মাণ করে দেন। এ কলেজের নির্মাণ ব্যয় হয় ১৭ হাজার টাকা। ১৯০৪ সালে কলেজটি চালু হয়েছিল। কলেজটি পরিচালনার জন্য রাণী বার্ষিক ১৭৮০ টাকা আয়ের কোম্পানির কাগজ দান করেন। এখানে বিনা বেতনে ছাত্ররা বেদ, স্মৃতি, পুরাণ, দর্শন, সংস্কৃত ব্যাকরণ, কাব্য ইত্যাদি প্রভৃতি শিক্ষা গ্রহণ করতো। এ কলেজের ছাত্রদের বিনা ভাড়ায় থাকার ব্যবস্থা ছিল। ১৯৪৭ সালের পর কলেজটির ক্রমাবনতি ঘটতে থাকে এবং এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ভবনটিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস স্থাপন হয়। ২০০৪ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস এ ভবনেই ছিল। এরপর ভবনটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। বর্তমানে জায়গাটি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের ক্যাম্পাসভুক্ত।
দিঘাপতিয়ার জমিদার রাজা প্রমথনাথ রায়ের দ্বিতীয় পুত্র কুমার বসন্ত কুমার রায়ের অর্থে ও রাজশাহী এসোসিয়েশনের প্রচেষ্টায় ১৯৩৬ সালে রাজশাহী কলেজের অধীনে বসন্ত কুমার এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট এর ভবন নির্মিত হয়েছিল কলেজের উত্তর পাশে। ১৯৩৬ সালে ইনস্টিটিউট চালু হলেও উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তার বেশ কয়েক বছর পূর্বে। ১৯২০ সালের আগস্ট মাসে কুমার বসন্ত কুমার রায় এ ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দান করেন। বসন্ত কুমার রায় ট্রাস্ট্রের তত্ত্বাবধায়কবৃন্দ  আরো ১ লাখ টাকা প্রদানে সম্মত হন। বসন্ত কুমার রায়ের প্রদত্ত টাকা দীর্ঘকাল জমা থাকার ফলে ১৯৩৩ সালে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। ইনস্টিটিউট স্থাপনের পূর্ব পর্যন্ত এ অংক দাঁড়ায় ৪ লাখ ৫ হাজার ৩০০ টাকায়।  কিন্তু কয়েক বছর চালু থাকার পর ইনস্টিটিউটটি বন্ধ হয়ে যায়। এ ইনস্টিটিউট ভবনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ১৮৮৪ সালে রাজশাহী মাদ্রাসা (রাজশাহী সরকারি মাদ্রাসা) এর জন্য একটি ভবন নির্মিত হয়েছিল। ১৮৯১ সালের কোলকাতা প্রসপেক্টাসে এর নির্মাণ কাল ১৮৮৩ সাল ও ব্যয় ৩৮ হাজার উল্লেখ আছে। তবে ১৯৩৩-১৯৩৪ সালের রাজশাহী কলেজের প্রসপেক্টাসে এর ব্যয়ের পরিমাণ আছে ৪৭ হাজার টাকা। মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য ১৯০৯ সালে স্থাপন হয়েছিল ফুলার হোস্টেল। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক খান বাহাদুর আহসান উল্লার প্রচেষ্টায় পূর্ববঙ্গ ও আসামের গভর্নর স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার (ঝরৎ ইধসভুষফব ঋঁষষবৎ) এর মঞ্জুরকৃত অর্থে হোস্টেলটি নির্মাণ হয়েছিল এবং তাঁর নামানুসারে নাম রাখা হয়েছিল ফুলার হেস্টেল। হেস্টেলটি নির্মাণের জন্য ৭৫ হাজার টাকা মঞ্জুর করা হয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চালু হবার পর এ হোস্টেলই তার প্রথম ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহার হয়। জেলখানার পূর্ব পাশে মাদ্রাসা স্থানান্তরিত হলে  মাদ্রাসা ভবন ও ফুলার হোস্টেল রাজশাহী কলেজ কর্তৃপক্ষের নিকট চলে আসে। মো. নূরুন্নবী এ হোস্টেলের নাম ফুলার মোহমেডান ছাত্রাবাস উল্লেখ করেন। কেমেস্ট্রি ভবনটি পূর্বে হাসাপাতাল কেন্দ্র ছিল। ১৯০৩ সালে ভবনটি রাজশাহী কলেজ ক্রয় করে নেয়। ক্রয়ের পর ৩৫,৮৪৭ টাকা ব্যয়ে ভবনটিকে সংস্কার করা হয়েছিল।
ফুলার হোস্টেলের সূচনায় রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী মাদ্রাসা ও রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের মুসলমান ছাত্ররা থাকতো। ১৯২৩ সালের জুলাইয়ে রাজশাহী কলেজের ছাত্রদের জন্য কলেজের পশ্চিম পাশে ৬ ব্লকের হোস্টেল তৈরি হলে ব্লক-এ মুসলমান ছাত্রদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। ফলে রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা ফুলার হোস্টেল থেকে এখানে চলে আসে। প্রায় একই সময়ে পিএন (প্রমদানাথ) হিন্দু হোস্টেল থেকে হিন্দু ছাত্ররা চলে আসে অন্য ৫টি ব্লকে। এর কিছুকাল পর কলেজিয়েট স্কুলের মুসলমান ছাত্ররা ফুলার হোস্টেল ছেড়ে দেয়। ১৯৫৫ সালে ফুলার হোস্টেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট হস্তান্তর করলে মাদ্রাসার ছাত্ররা বিকে এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউটে চলে যায়। পরবর্তীতে বর্তমান সরকারি মাদ্রাসা চত্বরে নিজস্ব ভবন তৈরি হলে মাদ্রাসার ছাত্ররা সেখানে চলে আসে। বর্তমানে ফুলার হোস্টেল রাজশাহী কলেজের একাডেমিক ভবন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
হিন্দু-মুসলমান ৮ জন ছাত্রীর অভিভাবকের অনুরোধ এবং রাজশাহী এসোসিয়েশন ও জেলা মুসলিম এসোসিয়েশনের বার বার দাবির প্রেক্ষিতে পৃথক ক্লাস ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৯৩১ সালে ছাত্রী ভর্তি করা হয়। কিন্তু সরকার ছাত্রীদের জন্য পৃথক ক্লাসের অনুমোদন না দেয়ায় পরবর্তী বছর ছাত্রী ভর্তি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর রাজশাহী এসোসিয়েশন ও অধ্যক্ষ প্রভুদত্ত শাস্ত্রীর প্রচেষ্টায় ১৯৩৩ সালে সহশিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়।  এ বছর ছাত্রী ভর্তির সময় ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছিল এবং মোট পাঁচ জন ছাত্রী ভর্তি হয়। এর মধ্যে ৪ জন কোলকাতা থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে আসে। আব্দুল মালেক খান তাঁর প্রবন্ধে তথ্য দেন, রাজশাহী কলেজে তাঁর ফুপু আখতারুল নেসা খানমকে আইএ ক্লাসে ভর্তি করা হয়েছিল। আখতারুল নেসা খানমের পিতা মৌলানা বয়েন উদ্দিন আহমেদ। বাড়ি ছিল দরগাপাড়া। তাঁর সঙ্গে আরো ৩ জন ছাত্রী ছিল। তাঁদের মধ্যে ২ জন হিন্দু ও ১ জন খ্রিস্টান।
১৯০৯ সালে রাজশাহী কলেজসহ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সকল কলেজে আইএসসি কোর্স চালু হয়। ১৯০৭ সালে যারা এফএ ভর্তি হয়েছিল ১৯০৯ সালে তাঁদের ফাইনাল পরীক্ষা আর্টস ও বিজ্ঞানে ভাগ করে দেয়া হয়। এর ফলে দেখা যায়, এ কলেজ থেকে যে ছাত্রটি ইন্টারমেডিয়েট অফ সায়েন্স পাস করে তাঁর নাম অবিনাশচন্দ্র দত্ত।
মো. মুজিবুর রহমানের প্রবন্ধে পাওয়া যায়, বলিহার জমিদারের দানের অর্থে ১৯১০ সালে নাটোর রোডের উত্তরে একটি লাল রঙের ভবন তৈরি হয়। ছাত্রদের কমন রুমের উদ্দেশ্যে ভবনটি নির্মিত হয়েছিল। এর চার কোণে অবস্থিত চারটি কক্ষে স্থাপন করা হয়েছিল কলেজের লাইব্রেরি। পরে লাইব্রেরিটি আধুনিক শিক্ষক মিলনায়তনে স্থনান্তরিত হয়েছিল। এরপর বর্তমান মিলনায়তন নির্মাণ হলে এর নিচতলাই লাইব্রেরিটি স্থানান্তর হয়।
১৯১৫ সালে কলেজ চত্বরের পূর্বপাশে ৫৭ হাজার ১৪৫ টাকা ব্যয়ে একটি লাল রঙের দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এ ভবনে স্থাপন করা হয়েছিল ফিজিক্স ল্যাবরেটরি। তার সঙ্গে ছিল একটি ওয়ার্কশপ। ওয়ার্কশপে স্থাপন করা হয়েছিল দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন মেশিন। এ মেশিন থেকে আলো, পাখা, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা ইত্যাদিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। ১৯৩৬ সালে রাজশাহী শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার পর ল্যাবরেটরির বিদ্যুৎ উৎপাদন মেশিনের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়।
১৯২৪ সালে ১ হাজার ছাত্রের জন্য দোতলা বিশিষ্ট ৬ টি ব্লকের হোস্টেল নির্মাণ করা হয়। যাতে খরচ হয় ৮৭ হাজার রুপি। নিউ হোস্টেলের এ, বি, সি, ডি, ই, এফ ব্লক চত্বরের উত্তর-পূর্ব অংশে তিনতলা বিশিষ্ট নিউ ব্লক ভবন নির্মিত হয়। ২০১০ সালে এ ৭ টি ব্লক ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠর নামে নামকরণ করা হয়। এ ব্লক-বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ভবন, বি ব্লক- বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ভবন, এফ ব্লক- বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ভবন, নিউ ব্লক- বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ভবন, সি ব্লক- বীরশ্রেষ্ঠ  মো. রুহুল আমিন ভবন, ডি ব্লক- বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ভবন, ই ব্লক-বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ ভবন। অধ্যক্ষের বাসভবনটি কলেজ ক্যাম্পাসের দক্ষিণে। ১৯২৭ সালে ভবনটি নির্মিত হয়। ক্যাম্পাসের পূর্ব দিকে আছে শিক্ষকদের জন্য ২টি তিনতলা আবাসিক ভবন।
১৯৬৪ সালে হেমন্তকুমারী হিন্দু হোস্টেলের বিপরীতে রাস্তার উত্তর পাশে ৫৬ আসনের একটি দোতলা ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ছাত্রী হোস্টেলটি চারতলাই উন্নীত করা হয়। এ হোস্টেলের পূর্ব পাশে অবস্থিত বিকে এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিকে হোস্টেল হিসেবে ব্যবহার হতো। কলেজের মহাপরিকল্পনা ১৯৮৫ অনুসারে ২০০৬ সালে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে হোস্টেলটি ভেঙ্গে দ্বিতীয় ছাত্রী নিবাস নির্মিত হয়। এ হোস্টেলের নাম দেয়া হয় রহমতুননেছা ছাত্রী নিবাস। হোস্টেলটি নির্মাণে ব্যয় হয় এক কোটি এগার লাখ টাকা। শয্যা ১০০টি। ১২ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে নির্মাণাধীন এ হোস্টেলের ভিত্তিপ্রস্তর ফলকে দেখা যায়, ১২ মার্চ ২০০৫ তারিখে মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনু এম.পি- এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২২ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে মেয়রই উদ্বোধন করেন।
সম্প্রতি ৭০ টি পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চারতলা বিশিষ্ট একটি একাডেমিক কাম এক্সামিনেশন ভবন নির্মিত হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান একাডেমিক কাম এক্সামিনেশন ভবন।
সরকারের সহযোগিতায় ১৯৯৩ সালে কলেজের নিজস্ব পরিবহণ ব্যবস্থা চালু হয়। ২৭/৯/২০০০ তথ্যানুসারে ১৯৯৩ সাল থেকে রাজশাহী কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত। পূর্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রি সমূহ প্রদান করা হত। ২০০০ সালে রাজশাহী কলেজে ২২টি বিষয়ে পাঠদান করা হত। অনার্স ও পাস কোর্সে প্রদানকৃত ডিগ্রিসমূহ ছিল: বিএ, বিএসএস, বিএসসি ও বি.কম। ¯œাতকোত্তর ডিগ্রিসমূহ হল : এমএ, এমএসএস, এমএসসি ও এমকম। কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষসহ শিক্ষকের পদের সংখ্যা ছিল ১৯২টি। তন্মধ্যে ১৭০ জন ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদান করতেন।
বর্তমান এ কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড রাজশাহীর আওতায় উচ্চ মাধ্যমিক সনদ (এইচএসসি) প্রদান করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ডিগ্রিসমূহ: বিএ (পাস), বিএসএস (পাস), বিএসসি (পাস), বিবিএস (পাস), বিএ(অনার্স), বিএসএস (অনার্স), বিএসসি (অনার্স), বিবিএস (অনার্স), এমএ, এমএসএস, এমএসসি, এমবিএস।
মোট ৪টি অনুষদে ২৪টি বিষয়ে পড়ানো হয়। কলা অনুষদে ৮টি, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ৪টি, বিজ্ঞান অনুষদে ৮টি, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ৪টি বিষয়। বিষয়সমূহ বাংলা, ইংরেজি, আরবী, ইসলামী শিক্ষা, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, সমাজকর্ম, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, মনোবিজ্ঞান, প্রাণি বিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, ভূগোল, পরিসংখ্যান, হিসাব বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং, সংস্কৃত, উর্দু। এরমধ্যে সংস্কৃত ও উর্দু বিষয়ে শুধু ডিগ্রি পাস কোর্স আছে। অন্যান্য সকল বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স পড়ানো হয়।
কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ২৬ হাজার, শিক্ষকের সংখ্যা ২৪৫ জন, কর্মচারী আছেন ১১১ জন। কলেজ চত্বরে আছে ১১টি একাডেমিক ভবন, ১টি প্রশাসনিক ভবন, ১টি লাইব্রেরি ভবন, ১টি বিএনসিসি ভবন, ১টি কেন্দ্রীয় মসজিদ, ১টি শহিদ মিনার, এ কলেজের নিউ হোস্টেলে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে নির্মিত শহিদ মিনারের মডেল, ১টি ব্যায়ামাগার ইত্যাদি।
রাজশাহী কলেজের প্রতীকে আছে কাছাকাছি ৪টি বৃত্ত। ভিতর থেকে বাইরে বৃত্তগুলো যথাক্রমে সত্য, সুন্দর, পবিত্রতা ও বিশ্বজনিনতার নিদর্শন। বৃত্তের ভিতরে একটি উন্মুক্ত বইয়ের উপর একটি প্রদীপ শিক্ষা জ্ঞান ও আলোকিত মানুষের প্রতীক। উন্মুক্ত গ্রন্থ হলো জ্ঞান ও প্রদীপ শিখা হলো আলোকিত মানুষ। একটি ফিতার বন্ধন হলো বন্ধুত্ব ও পরমতসহিষ্ণুতার প্রতীক।
লেখক: শ্রমিক
যধয়ঁবৎপপ@মসধরষ.পড়স