১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন : প্রকৃতি ও পরিধি

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৭, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ

ড. আবুল কাশেম


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ছাত্রদের আন্দোলনের সাফল্য সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, আর তা হলো যে, এ সময় থেকেই ছাত্ররা পূর্ব পাকিস্তানের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি তাদের আন্দোলনের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে।
ইত্যবসরে জুন মাসের প্রথম দিকে সংবিধান জারি করা হয় এবং সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়। রাজনৈতিক দল পূনর্গঠনের ব্যাপারে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। এ ভাবে পরিবেশ রাজনীতিকদের জন্য অনুকূল হলে তাঁরা সদ্য জারিকৃত সংবিধান বিষয়ে এক বিবৃতি প্রদান করেন। এ বিবৃতি ৯-নেতার বিবৃতি নামে খ্যাত। এ বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আইয়ূবীয় সংবিধনের এতো তীব্র ও তীক্ষè সমালোচনা করেন যে, বাস্তবে তা অস্বীকার করারই শামিল। তাঁরা একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য পরামর্শ দেন অথবা বিদ্যমান সংবিধানের গণতন্ত্রায়নের কথা বলেন যাতে দেশবাসী একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিশ্চয়তা পেতে পারেন। জনগণের কাছে বিশেষত ছাত্র সম্প্রদায়ের কাছে এ বিবৃতি অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করে। অনুমান করা কষ্টকর নয় যে, নেতাদের এ বিবৃতি প্রকাশের পেছনে ছাত্রদের চাপ ছিল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে বিবৃতি প্রদান করে নেতাদের অভিনন্দিত করে। ছাত্র প্রতিনিধিগণ বলেন, নেতাদের বিবৃতিতে সে সকল দাবির স্পষ্টতর প্রকাশ ঘটেছে যার জন্য ছাত্ররা বছরের শুরু থেকে আন্দোলন করে আসছে।
শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরোধিতা : তৃতীয় পর্যায়
আন্দোলনের তৃতীয় পর্যায় ছিল শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরোধিতাভিত্তিক। মূলত এ পর্যায়ের জন্য বাষট্টির সমগ্র আন্দোলনকে শিক্ষা আন্দোলন বলে অভিহিত করা হয়। সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে আইয়ূব খান নিজ চিন্তা-চেতনাপ্রসূত রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামো নির্মাণের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দ্রুত কতকগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এগুলোর নিখুঁত বাস্তবায়নের জন্য বহু ক্ষেত্রে কমিশন গঠন করেন যার একটি হল জাতীয় শিক্ষা কমিশন। ক্ষমতা দখলের পরপরই ১৯৫৮ সালের ১২ ডিসেম্বর লাহোরের এক নাগরিক সংবর্ধনায় আইয়ূব খান শিক্ষা কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন। ৩০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সিদ্ধান্তে পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব এস.এম. শরীফকে সভাপতি করে এগার সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় শিক্ষা কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। এ দশজন সদস্যের মধ্যে তিনজন ছিলেন সামরিক বাহিনীর সদস্য। এ ছাড়া একজন আমেরিকান ও একজন ব্রিটিশ নাগরিক কমিশনের উপদেষ্টা সদস্য ছিলেন। অতএব ছাত্র সম্প্রদায়ের ধ্বংস সাধনের লক্ষ্যাভিসারী বিদেশি সা¤্রাজ্যবাদ, বিদেশি একচেটিয়া পুঁজির প্রতিভূ হিসেবে সামরিক সরকারকে ছাত্রদের চিহ্নিতকরণ একেবারে অযৌক্তিক নয়। শিক্ষা কমিশন গঠনের সাথে প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন, ভাষাভিত্তিক জাতিসমূহের স্বকীয়তা ইত্যাদি অস্বীকৃতির বিষয়টি জড়িত। যে অনুষ্ঠানের আইয়ূব খান শিক্ষা কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন সে অনুষ্ঠানে আঞ্চলিকতা, স্বায়ত্তশাসনাধিকার এবং সাম্প্রদায়িকতাকে অসুস্থ মনের ফসল বলে উল্লেখ করে এগুলো সম্বন্ধে তিনি জাতিকে সতর্ক থাকতে বলেন। তিনি ‘এ সকল দুষ্ট ক্ষত থেকে দেশকে মুক্ত’ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। আইয়ূব খান একাধিক রাষ্ট্র ভাষার ধারণায়ও বিশ্বাস করতেন না। একাধিক ভাষা একটি জাতি-রাষ্ট্র গঠনের অন্তরায় বলে তিনি তাঁর আত্মচরিতে উল্লেখ করেছেন। বাংলা বা উর্দুকে এককভাবে সমগ্র পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়া সম্ভব নয় বিধায় তাঁর মতে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির জন্য পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের একটি মাত্র মাধ্যম থাকা একান্ত আবশ্যক। এ অভিন্ন মাধ্যম তৈরির জন্য বাংলা ও উর্দূ ভাষার অভিন্ন উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করে তিনি একটি অভিন্ন বর্ণমালা তৈরির লক্ষ্যে সেগুলোকে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। ১৯৬০ সালের জানুয়ারি মাসে আইয়ূব খান বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে একটি যৌগিক ভাষা প্রচলনের কথা বলেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে হলেও এ ভাষার অভিন্ন বর্ণমালা থাকবে যাতে সকল মানুষের কাছে তা সহজবোধ্য হয়। বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষা ও ইংরেজির পরিবর্তে এ ভাবে একটি ‘বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবানুগ উদ্যোগের’ অজুহাতে তিনি ‘পাকিস্তানি ভাষা’ প্রচলনের কথা বলেন। মূলত তিনি রোমান বর্ণমালা প্রচলনের দিকে ইঙ্গিত দেন। বস্তুত সামরিক জান্তার শিক্ষা ও ভাষা নীতির পশ্চাতে প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন, স্বাধিকার, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিগত অধিকার দলন এবং অস্বীকারের অপপ্রয়াস লক্ষ্যণীয়।
আসলে শোষণের প্রক্রিয়া ও জাতিগত নিপীড়ন অব্যাহত রাখার জন্য একটি পশ্চাদপদ, আধ্যাত্মিকতাবাদী ও অদৃষ্টবাদী জীবন দর্শন প্রতিষ্ঠা করাই ছিল আইয়ূব খানের উদ্দেশ্য। এ জন্য তিনি মৌলিকগণতন্ত্রকে যেমন Islamic injunctions of conscience থেকে গ্রহণ করেছেন বলে দাবি করেন, তেমনি ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায়ও তৎপর হন।
এ আলোকে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট সম্বন্ধে আলোচনা করা বাঞ্ছনীয়। কয়েক দিন যাবৎ রাষ্ট্রপতির ক্যাবিনেটে বাছাই-এর পর জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট সরকার গ্রহণ করে। ১৯৬০ সালের ৮ জানুয়ারি আইয়ূব খান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের ওপর এক বেতার ভাষণ দেন। এতে তিনি শিক্ষা সংস্কারের চারদফা লক্ষ্য উল্লেখ করেন: ক) রাষ্ট্রের প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতি রেখে জনশক্তি ঠিক রাখা; খ) পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বিজ্ঞান ও কলায় অর্জিত অগ্রগতির সাথে পাকিস্তানের শিক্ষার মান নিশ্চিত করা; গ) উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে চেয়ে যোগ্যতা ও মেধার অগ্রগণ্যতা নিশ্চিত করা; এবং ঘ) ভৌগোলিক দূরত্ব ও বহুভাষিকতাজনিত অসুবিধা সত্ত্বেও একটি মুসলমান জাতি হিসেবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংহতি অক্ষুণ্ন রাখা। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের চরিত্র গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি চরিত্র পদ্ধতি গড়ে তোলা যাতে ভবিষ্যত নেতৃত্বদানের সক্ষম শত-সহ¯্র শিক্ষিত তরুণ-তরুণী পরিকল্পনাসমূহ অনুধাবন করতে ও বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারে।” শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষা নীতির প্রচার করতে গিয়ে আইয়ূব খান ও তাঁর অধঃস্তনরা অনবরত ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক আদর্শবাদী বক্তব্য রেখেছেন।
শিক্ষানীতি সম্বন্ধে প্রথিতযশা সাহিত্যিক আহমদ ছফা যে মন্তব্য করেছেন তা প্রতিধানযোগ্য। তিনি বলেন, পাকিস্তানের ভাগ্যবিধাতারা নিজেদের ঔপনিবেশিক স্বার্থ টিকিয়ে রাখার জন্যই শিক্ষা ক্ষেত্রে এই উগ্র, অসহিষ্ণু এবং অবৈজ্ঞানিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করতে চেষ্টা করেছিল। বাংলাদেশের কিছু ধর্মান্ধ মানুষ এ অঘোষিত শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তনের ব্যাপারে সরকারের সহায়তা করেছে।
উপরিউক্ত আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে, সরকারের প্রস্তাবিত শিক্ষা নীতির একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রিক পরিধি আছে। প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাদমুখি শিক্ষা নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক জান্তার চিন্তা ও উদ্দেশ্য অনুসারে সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রকে পুনর্গঠিত করা যা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী ইতিহাসের সম্পূর্ণ বিপরীত।
সরকারের ছাত্র রাজনীতি সংক্রান্ত অবস্থান সম্বন্ধে পূর্বেই আলোকপাত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত শিক্ষা নীতিতে ছাত্র রাজনীতিরও বিরুদ্ধাচারণ করা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলায় ছাত্র রাজনীতির উত্থান হলেও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলের গোড়াতেই ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অগ্রগতিতে ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে তাদের অপ্রতিহত প্রভাব স্থাপিত হয়। ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করলে ছাত্রদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের আলোকে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টেগ্রিটি রক্ষার জন্য সেগুলোকে পার্টিজান পলিটিক্স চর্চার ক্ষেত্র হতে দেয়া উচিত নয়।
সরকারের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে শিক্ষা সংকোচনের মাত্রা ছিল অত্যাধিক। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সংকোচনমূলক শর্তাদি আরোপের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অর্থায়নের একই শর্ত আরোপ করা হয় মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও। সরকারি সিদ্ধান্তে বলা হয় প্রতিটি স্কুলের শতকরা ৬০ ভাগ ব্যয় সংগৃহীত ছাত্র বেতন থেকে এবং শতকরা ২০ ভাগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নির্বাহ করবে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও সরকার শিক্ষা সংকোচন নীতি গ্রহণ করে। ¯্নাতক পর্যায়ে পাসকোর্স ও অনার্স কোর্সের সময়গত পার্থক্য বিলোপ করা হয়।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সম্বন্ধে উপরিউক্ত ব্যবস্থাবলি গ্রহণ ও প্রয়োগের ফলে নি¤্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আগত শিক্ষার্থীর ওপর অতিশয় আর্থিক চাপ পড়ে। সরকার যে সংকোচনমূলক নীতি অনুসরণ করে সমাজের উচ্চ শ্রেণির উপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে একটি এলিট শ্রেণি সৃষ্টির পরিকল্পনা নেয় তার প্রমাণ আইয়ূব খানের নিজের বক্তব্যেই পাওয়া যায়। ক্ষমতা দখলের পরপরই শিক্ষা কমিশনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তিনি বলেন, “অতীতে আমরা শিক্ষাকে সাক্ষরতার আলোকে দেখতে অভ্যস্থ হয়েছি। দুর্ভাগ্যবশত গত এগার বছরে সাক্ষরতা বৃদ্ধি করতে পারিনি। …এ কমিশনের কাজ হবে পাকিস্তানের জন্য যথোচিত শিক্ষা ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা। আমরা আমাদের পায়ের নিচে ঘাস গজাতে দিতে পারি না।”
১৯৬০ সালে শিক্ষা কমিশন রিাপার্ট গ্রহণের সমসাময়িক কালেও তিনি বলেন, “আমাদের উচ্চ শিক্ষা হওয়া উচিৎ উন্নতমানের শিক্ষা। আমরা সংখ্যা চাইনা, কম লোক নিয়েই আমাদের চলবে।” এতদ্ব্যতীত শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দকে শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগের সাথে তুলনা করা হয়েছিল। পক্ষান্তরে ছাত্ররা শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে সরকার শিক্ষাকে যে ভাবে বিনিয়োগ-উৎপাদন তত্ত্বের ভিত্তিতে বর্ণনা করেছে তাতে শিক্ষা আর নাগরিকদের জন্য মৌলিক অধিকার পদবাচ্য থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ সম্বন্ধে কটূ মন্তব্য ছাত্রদের ক্ষুব্ধ করে। ১৯৬১ সালে সরকার মুক্ত চিন্তার পরিপন্থী যে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও চালু করে তাকে ছাত্র-শিক্ষকরা কালো আইন বলে আখ্যায়িত করে।
(চলবে)