১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন : প্রকৃতি ও পরিধি

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৭, ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

ড. আবুল কাশেম


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে নতুন করে আন্দোলন শুরুর প্রয়োজন ছিল না। কেননা পূর্ব থেকেই আন্দোলনের প্রবাহ বিদ্যমান ছিল। শুধুমাত্র পরিবেশের পার্থক্যের কথা বলা যেতে পারে। বছরের প্রারম্ভে একটি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধাচারণ করে ছাত্ররা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়, আর বছরের মাঝামাঝিতে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলনের রেশ তখনও চলছিল। আইয়ূব খানের মন্ত্রিসভায় যোগদানকারী ফজলুল কাদের চৌধুরীর চট্টগ্রাম আগমন ‘প্রতিহত’ করতে গিয়ে ছাত্ররা যে পুলিশি অত্যাচারের সম্মুখিন হয় তার প্রতিবাদে প্রদেশ-ব্যাপি শিক্ষা ধর্মঘট পালিত হয়। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এস.এম. হায়দার আলীর সভাপতিত্বে ভাষা আন্দোলন-উত্তর সর্ববৃহৎ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্কুল ছাত্ররাও যোগদান করে। সভায় গৃহীত প্রস্তাবসমূহ চট্টগ্রামের ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দি, কাইউম খান, গাফফার খান প্রমুখ রাজনীতিবিদের মুক্তি দাবি এবং সংবাদ, ইত্তেফাক ও পাকিস্তান অবজারভার ইত্যাদি দৈনিক পত্রিকাকে সরকার কর্তৃক কালো তালিকাভুক্তির নিন্দা করা হয়।
এভাবে দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্দোলনের মোমেন্টামকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। আন্দোলন পরিচালনার সাংগঠনিক কাঠামো থেকে মনে হয় কলেজ ছাত্ররাই এ আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে। ¯্নাতক (পাস) কোর্সকে তিন বছর মেয়াদি কোর্সে রূপান্তর কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল তাৎক্ষণিকভাবে। তাই প্রথমে ‘ডিগ্রি স্টুডেন্ট ফোরাম’ গঠিত হয় যা অনতিবিলম্বে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফোরাম’-এ উন্নীত হয়। কিন্তু অচিরেই এ সাংগঠনিক কাঠামোটি বিস্তারিত হয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে রূপলাভ করে।
১২ আগস্ট তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার বিভিন্ন কলেজের ছাত্র প্রতিনিধিরা এক বিবৃতির মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল ও জনগণের আকাক্সক্ষার অনুবর্তী একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিসহ একটি ১৫-দফা দাবিনামা প্রকাশ করে। দুবছর মেয়াদি ¯্নাতক কোর্স পুনঃপ্রবর্তন, সকল স্তরে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি বিষয়ে টেক্সট বই-এর সংখ্যা হ্রাস, শিক্ষা খাতে অধিক বরাদ্দ, ছাত্র বেতন হ্রাস, কলেজ শিক্ষায় পূর্বতন ব্যবস্থা বহাল ইত্যাদি ১৫-দফার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৬ আগস্ট তারিখে প্রদেশব্যাপি ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। এ দিন কর্মসূচি শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় যা ছিল তৃতীয় পর্যায়ের আন্দোলন শুরুর পর প্রথম সভা। ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি আব্দুল ওয়াজেদ মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার রিপোর্ট অনুসারে কোনো বক্তা রাখা হয়নি। তবে এতে কতোগুলো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যা পূর্বোক্ত ১৫-দফার অনুরূপ। বস্তুত পরবর্তী একমাস সমগ্র প্রদেশব্যাপি ছাত্র ধর্মঘট চলতে থাকে। এ ধর্মঘট অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিল স্বতঃস্ফুর্ত। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয় গেটে অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দেয়। কিন্তু সরকার উক্ত এলাকায় স্বাভাবিক জনচলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ঢাকা জেলার প্রশাসক ছাত্রদেরকে ও তাদের অভিভাবকদেরকে এ নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির কারণ হতে পারে বলে হুমকি প্রদান করেন। ফলে ছাত্ররা কৌশলগত পশ্চাদপসরণ হিসেবে ১০ সেপ্টেম্বরের অবস্থান ধর্মঘটের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে ১৭ সেপ্টেম্বর প্রদেশব্যাপি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের কর্মসূচি দেয় এবং তা সফল করার জন্য প্রস্তুতিও গ্রহণ করে। সরকার ছাত্রদেরকে আন্দোলন থেকে নিরস্ত করার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে ছাত্রদের অসন্তোষের বিষয়সমূহ আলোচনার ঘোষণা দেন। কিন্তু তা ছাত্রদের কাছে কালক্ষেপণের কৌশল ছাড়া বেশি কিছু মনে হয় নি। ১৭ সেপ্টেম্বর কোনো পূর্ব ঘোষণা ব্যতিত ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। স্বতঃস্ফুর্তভাবে ঢাকায় কর্মসূচি পালনকালে আইন-শৃংখলা প্রয়োগকারী সংস্থা আন্দোলকারীদের ওপর গুলি চালালে দুজন নিহত হয়। ঠিক দশ বছর আগে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ছাত্র-জনতার যেমন রক্ত ঝরেছিল, অনুরূপভাবে ১৯৬২ সালে শিক্ষার দাবিকে নিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে মানুষ হত্যা সকল মহলকে বিমূঢ় করে দেয়। ১৭ সেপ্টেম্বরের পর ছাত্রদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি প্রদান ও তা যথাযথভাবে প্রতিপালিত হলেও ছাত্ররা নেতৃত্বের অভাব বোধ করেছিল। এমনকি তারা আন্দোলনের নেতৃত্ব রাজনৈতিক নেতাদের কাছে হস্তান্তরের কথাও চিন্তা করে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রদের দাবির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাতীয় রূপ ধারণকারী এ আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য সোহরাওয়ার্দী ও ‘নয় নেতার’ প্রতি আহ্বান জানায়। উল্লেখ্য, আগস্ট মাসে সরকার করাচিতে সোহরাওয়ার্দীকে মুক্তি প্রদান করে। সোহরাওয়ার্দী ছাত্রদের দাবিসমূহ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিবিদসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে পর্যবেক্ষণ করেন। ছাত্র নেতাদের উপরিউক্ত আহ্বানের প্রেক্ষিতে তিনি সেপ্টেম্বর মাসের শেষ নাগাদ ছাত্রদের দাবির সম্ভাব্য সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সোহরাওয়ার্দী প্রাদেশিক গভর্নরের সাথে সাক্ষাৎ করে শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট স্থগিত করার পরামর্শ দেন। এ ভাবে একদিকে রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শ, অন্যদিকে সমগ্র প্রদেশব্যাপি প্রতিবাদের মুখে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়ন স্থগতি করা হয় এবং সমগ্র আন্দোলন পর্যালোচনা, ছাত্র আন্দোলনের প্রকৃতি নির্ধারণ, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের মূল্যায়ণ এবং ছাত্র স্বার্থের অছাত্র সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণের জন্য একটি বিচার বিভাগীয় তদন্তানুষ্ঠানের সরকারি ঘোষণা দেয়া হয়। তাছাড়া সরকার শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বেশ কতগুলো সুপারিশ স্থগিত ঘোষণা করে এবং রিপোর্টটি নিরীক্ষা করে ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত অসুবিধাসমূহ দূরীভুত করা হবে বলে ঘোষণা দেয়। পক্ষান্তরে ২৮ সেপ্টেম্বর ছাত্রদের উদ্যোগে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত প্রথম ছাত্র-জনসভায় ১১-দফা দাবি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ধারাবাহিক ধর্মঘটের পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়।
উপসংহার
১৯৬২ সালের সরকার বিরোধী আন্দোলনের ব্যাপ্তিকাল ছিল জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। তিনটি পর্যায়ে এ আন্দোলনকে বিভক্ত করা এবং শেষ পর্যায়টি যেহেতু সরকারের শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত তাই সমগ্র আন্দোলনকেই শিক্ষা আন্দোলন নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে যা ঐতিহাসিকভাবে ভ্রান্তিমূলক। যে তিনটি পর্যায়ের কথা বলা হয়েছে তার সময়গত ধারাবাহিকতা অস্পষ্ট নয় এবং উদ্দেশ্যেরও কোন পার্থক্য নেই। ইস্যু আলাদা আলাদা হলেও একটি পর্যায়ের আবশ্যিক পরিপূরক হিসেবে অপরটি আরম্ভ হয়েছে। অতএব আন্দোলনটিকে এর সামগ্রিকতায় বিবেচনা করাই বিধেয়। তাহলে এর রাজনৈতিক প্রকৃতি অনুধাবন সহজতর হয়। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনীতিবিদের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। তবে আন্দোলন শুরু করার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রস্তুতিও ছিল। এ প্রস্তুতির একটি অংশ সোহরাওয়ার্দী নিজে, কেননা তাঁকে দিয়ে রাজনৈতিক বিবৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত ছিল। প্রস্তুতির অপর অংশটি হলো ছাত্রদের মাধ্যমে আন্দোলনের সূত্রপাতের সিদ্ধান্ত। আওয়ামী লীগ ও কম্যুনিস্ট পার্টি তাদের নিজেদের ছাত্রফ্রন্ট যথাক্রমে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ নেতৃত্বে আন্দোলনের সূচনা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ নেতৃত্বই সমগ্র আন্দোলন পরিচালনা করে। দ্বিতীয় পর্যায়ের সংবিধান বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৃতীয় পর্যায়ের আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। বস্তুত রাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালনকারী ছাত্ররা সামরিক সরকার সম্বন্ধে কোন দুর্বলতা প্রদর্শন করেনি। বরং সামরিক শাসকরা ১৯৫৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে সুস্থ রাজনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত করার জন্য সামরিক আইন জারি করে রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখল করে। এহেন ক্ষমতাধর সামরিক জান্তা ঔপনিবেশিক শোষণের প্রক্রিয়াকে স্থায়িত্ব দান করার জন্য গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সহজলভ্য ও সার্বজনিন শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের লক্ষ্যাভিসারী প্রকৃতি পরিগ্রহ করে। বস্তুত শিক্ষার জন্য আন্দোলন এবং গণতন্ত্র ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে ছাত্ররা অভিন্ন মনে করেছিল। তাই ১৯৬২ সালের আন্দোলনকে শুধুমাত্র সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা আন্দোলন না বলে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, জাতিগত নিপীড়ন ও শোষণের অবসানের আন্দোলন বলাই অধিকতর যুক্তযুক্ত। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগকে বাঙালি জাতীয়বাদী চেতনার উদ্বুদ্ধ একটি প্রগতিশীল সংগঠনে রূপান্তরিত করা এবং এর পর থেকেই বাঙালি জাতীয়বাদী আন্দোলন বেগবান হয়। ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটে এবং তা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির দাবি আদায়ের প্রধান সংগঠনে পরিণত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যূত্থান এবং ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ ঘটে এবং শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসে।
এভাবে গভীর বিশ্লেষণে শিক্ষা আন্দোলন বলে বহুল খ্যাত ১৯৬২ সালের আন্দোলনটির রাজনৈতিক প্রকৃতি নির্ধারণ সম্ভব এবং পরবর্তী ইতিহাসের ওপর প্রভাব বিবেচনা করে বলা যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এর প্রভাব বিস্তৃত ছিল।
লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।