১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন : প্রকৃতি ও পরিধি

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

ড. আবুল কাশেম


ভূমিকা
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত ঘটনাবলির মধ্যে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। পঞ্চাশের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন এবং ষাটের দশকের শেষ নাগাদ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনের মধ্যে সমন্বয়ক হিসেবে ১৯৬২ সালের আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। ‘শিক্ষা আন্দোলন’ হিসেবে বহুল পরিচিত এ আন্দোলনের রাজনৈতিক দিক দিয়েও ইতিহাসে অপরিসীম গুরুত্বের দাবিদার। যেতে পারে, যে ক্রমাগত আন্দোলনে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন, ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বাঙালি রাজনৈতিক এলিটদের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং অবশেষে স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া সে আন্দোলনের প্রারম্ভিকি ১৯৬২ সাল। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে যে দমন-পীড়ন ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক ও রাজনীতিকদের অকেজো করার জন্য বিভিন্ন অযোগ্যকরণ অধ্যাদেশ জারি করেন তাতে পাকিস্তানে বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানে এক চরম রাজনৈতিক শূণ্যতার সৃষ্টি হয়। ১৯৬২ সালের আন্দোলন এ পরিকল্পিত রাজনৈতিক শূণ্যতা ভেঙ্গে গোটা পরিবেশকে চাঙ্গা করে তোলে। ছাত্ররা ছিল এ আন্দোলনের অনুঘটক। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল দেশের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে আবির্ভুত সামরিক শাসনকে আঘাত করা। তাই এ আন্দোলন ছিল সরকারের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির জন্য চক্ষু উন্মিলক।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি পর্যন্ত পাকিস্তানে এক প্রকার সংসদীয় রাজনৈতিক কাঠামো টিকে ছিল। কিন্তু এক দশকের বেশি এ সময়কালে ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত, হানাহানি তথা রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরম দুর্বলতা এতোই প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করা হলেও এর বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ বা প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়ভাবে অনুপস্থিত ছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতায় হতাশ ও ক্লান্ত জনগণ ক্ষণিকের জন্য হলেও সামরিক শাসকের দিকে দৃষ্টি দেয়। বস্তুত এ সময়কাল রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের মৌল কাঠামোর মধ্যেই নিহিত ছিল। কিন্তু বাঙালি জনগণের কাছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের মৌল চরিত্র উদঘাটন ছিল ৬২-র পরবর্তী বাস্তবতা। অতএব সামরিক শাসন ও এর প্রতিক্রিয়াশীল প্রভাব সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ জনগণ তাই আশাও করেছিল কিছুটা। কিন্তু অচিরেই তাঁদের আশাভঙ্গ ঘটে।
১৯৪৭-৫৮ কালপর্বে রাষ্ট্র ক্ষমতায় সমাসীন রাজনৈতিক এলিটরা সাফল্যের পরিচয় দিতে না পারলেও এ সময় বাঙালিদের অর্জনও কম ছিল না। এ সময়ই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তাঁদের স্বাধিকার আন্দোলনের হাতে খড়ি নেয়। প্রথম থেকেই গৃহীত বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে তাঁরা সংগঠিত হয়, প্রতিবাদ করে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের মন্ত্র রপ্ত করে। এ প্রসঙ্গে ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির জাতিসত্ত্বা বিলোপের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়, পক্ষান্তরে ১৯৫৪-র নির্বাচনে বাঙালির ক্ষমতায়নের সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনা ষড়যন্ত্রের যূপকাষ্ঠে বলি হলে আন্দোলনের দীর্ঘতর পথ উন্মোচিত হয়। পঞ্চাশের দশকের এ দুটি ঘটনারই ফলাফল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত এ সময় থেকেই জনগণ চিন্তায়, মননে, প্রথা-প্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা স্পষ্ট রূপ লাভ করতে শুরু করে। কিন্তু ১৯৫৮ সালে ক্ষমতাসীন সামরিক শাসক অচিরেই তার মুখোশ উন্মোচন করে এবং ধর্মকে পাকিস্তান জাতি গঠনের প্রধান বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। আইয়ূব খান তাঁর আত্মজীবনীতেও এ ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন। তাঁর ভাষায়, “একজন মুসলমান হিসাবে আমার একমাত্র ভাবনা হল পাকিস্তানের জনগণকে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শের ভিত্তিতে একত্রিত করা।” তিনি বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে ইসলামি আইন-কানুনের যথার্থ ব্যাখ্যা ও তার প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন। আইয়ূব খানের এ ধরনের চিন্তা প্রগতিশীল ও উদারনৈতিকতাবাদীদের খুব সহজেই আতংকিত করে। বস্তুত ভাষা আন্দোলন-উত্তর কালে প্রগতিশীল ও উদারপন্থী ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীরা ধর্মকে সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফ্যাক্টর বিবেচনা না করে তাকে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। অতএব সামরিক স্বৈরাচারের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে রুখতে রাজনীতিকদের এগিয়ে আসা উচিৎ ছিল। কিন্তু সামরিক আইনের নিষেধাজ্ঞা ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ এবং অযোগ্যকরণ আইন-অধ্যাদেশ (যেমন- EBDO, PODO ইত্যাদি) রাজনীতিবিদদের উপর খড়গ হিসেবে কাজ করে। তদুপরি প্রতিনিয়ত গ্রেফতার ও কারাবাসের ফলে রাজনীতিক্ষেত্রে এক বিরাট শূণ্যতা সৃষ্টি হয়। এ সুযোগে সামরিক স্বৈরাচার তাঁর ‘রেজিমেন্টেশন’ কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হয়। এ ‘রেজিমেন্টেশন’ কর্মসূচির প্রধান হাতিয়ার ছিল তাঁর নিজ মস্তিস্কপ্রসূত মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় মৌলিক গণতন্ত্রীদের হাতে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নের জন্য প্রচুর অর্থ-সম্পদ ও ক্ষমতা প্রদান করা হয়। মৌলিক গণতন্ত্রীরা প্রায় ক্ষেত্রেই ছিল অর্ধশিক্ষিত। স্থানীয় পর্যায়ে এরা ছিল নেতৃস্থানীয়, সুবিধাবাদী চরিত্রসম্পন্ন এবং দুর্নীতিপরায়ণ। গ্রামীণ অশিক্ষিত এবং নিরাসক্ত জনগণের উপর তাঁরা প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রূপান্তরিত হওয়ার পরিবর্তে তাঁরা আইয়ূব খানের স্থানীয় replica-য় পরিণত হয়। আইয়ূব খান এভাবে অনুগ্রহপুষ্ট শ্রেণি সৃষ্টি করে তাদেরকে নির্বাচকমণ্ডলীর মর্যাদা দেন। এভাবে গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থার সমাধি রচিত হয় এবং তদস্থলে এক প্রকার অভূতপূর্ব সর্বাত্মকবাদী সরকার পদ্ধতি চালু হয়।
শিক্ষার অবস্থা
১৯৬২ সালের আন্দোলনকে শিক্ষা আন্দোলন নামেই ব্যাপকভাবে অভিহিত করা হয়। একথা অনস্বীকার্য যে, আন্দোলনের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব ছাত্রদের উপরই বর্তায়। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সরকারের গৃহীত নীতি কি ছিল তা দেখা দরকার। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষা ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের কিছু পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু প্রথম থেকেই পাকিস্তান সরকারের গৃহীত বৈষম্যমূলক নীতির ফলে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ে। পাকিস্তানের সূচনালগ্নে অর্থাৎ ১৯৪৭-৪৮ সালে দেশের মোট প্রাথমিক স্কুল, ওই সমস্ত স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর শতকরা হার ছিল যথাক্রমে ৭৭.৮৯%, ৮০.৯৩% এবং ৭৮.৭৯%। কিন্তু শিক্ষা আন্দোলনের বছর অর্থাৎ ১৯৬২-৬৩ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৮.৯৩%, ৫৭.৬৮% ও ৬৩.৫৪%। মোট অংকের হিসেবে হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের এ সমস্ত সংখ্যাও কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু বৃদ্ধির হার নিঃসন্দেহে পশ্চিম পাকিস্তানেই বেশি ছিল। একই চিত্র মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। ১৯৪৭-৪৮ সালে পাকিস্তানের মোট মাধ্যমিক স্কুল, ওই সকল স্কুলে কর্মরত শিক্ষক ও পাঠরত শিক্ষার্থীর হার যথাক্রমে ৫৭.২৬%, ৫৬.৩৮% ও ৫০.৪৭% ছিল পূর্ব বাংলায়। কিন্তু ১৯৬২-৬৩ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৮.৫০%, ৩৯.৭৪% এবং ৩৭.৪৫%-এ। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্বাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান অনগ্রসরতার চিত্রও সমভাবে হতাশাব্যঞ্জক। ১৯৪৭-৪৮ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে দু’টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। ১৯৫১-৫২ সালেই সেখানে আরো দু’টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পর দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (রাজশাহী) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬১-৬২ সালে উভয় প্রদেশে দু’টি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যার দিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। ১৯৪৭-৪৮ সালে পূর্ব বাংলার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা ছিল ১৬২০ জন (৭১.১৪%)। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৬৫৪ জন (২৮.৭৬%)। কিন্তু ১৯৬২-৬৩ সালে এই সংখ্যা পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৯৪৬৪ (৫৭.০০%) এবং ৭১৪০ জনে (৪৩.০০%)। পরবর্তী বছরগুলিতে পূর্ব বাংলায় এই হার আরও দ্রুতগতিতে হ্রাস পায়।
পূর্ব ও পশ্চিম পাকস্তানের প্রাদেশিক বাজেটসমূহে শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দের হার লক্ষ্য করলেও দেখা যাবে পশ্চিম পাকস্তান সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চেয়ে বেশি বরাদ্দ করেছে। বাস্তবিক ক্ষেত্রে শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার তেমন গুরুত্ব দেয়নি। ১৯৪৮-৪৯ অর্থ বছর থেকে ১৯৬২-৬৩ অর্থ বছর পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জন-অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানের বাজেটে শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দের পরিমাণ পশ্চিম পাকিস্তানের বাজেটে শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দের চেয়ে অনেক কম। বিশেষ করে সামরিক আইন জারির বছর এবং তার পরবর্তী বছর পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পরবর্তী বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসে।
আন্দোলনের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ প্রস্তুতি
শিক্ষাক্ষেত্রে গৃহীত সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি এবং পূর্ব পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান অনগ্রসরতা সত্ত্বেও তিন বছরের সামরিক সন্ত্রাস ও জুলুমের ফলে আন্দোলনের জন্য রাজনৈতিক ইস্যুই প্রাধান্য লাভ করে। এ জন্য পরোক্ষ প্রস্তৃতি ও প্রত্যক্ষ পরিকল্পনাও তৈরি হয়। পরোক্ষ প্রস্তুতি হিসেবে ১৯৬১ সালের শহিদ দিবস উদযাপনের সাংগঠনিক উদ্যোগের উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৬১ সালেল শহিদ দিবসকে সামনে রেখে সামান্য হলেও রাজনৈতিক মহল ও ছাত্রসম্প্রদায় প্রস্তুতি গ্রহণ করে। গোপন কম্যুনিস্ট পার্টি কর্মীদেরকে শহিদ দিবস পালনের নির্দেশ প্রদান করে। কম্যুনিস্ট পার্টি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের দাবি জানায়। ছাত্র সংগঠনসমূহও এ ব্যাপারে অগ্রসর হয়। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে ছাত্রলীগ, ছাত্র শক্তি ও ছাত্র ফেডারেশনের এক যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি জাহান আরা আখতার সভায় সভাপতিত্ব করেন। ছাত্র রাজনীতি সাংগঠনিকভাবে নিষিদ্ধ থাকায় এ সভায় নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদেরকে সরকারের নিকট ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণার দাবি জানাতে বলা হয়। তাছাড়া যথাযথ মর্যাদায় শহিদ দিবস পালনের কর্মসূচিও গৃহীত হয় এবং ছাত্ররা তা যথাযথভাবে পালন করে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে ছাত্রদের ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের বিষয়টি সবিশেষ স্থান পায়।
সামরিক শাসনের আওতায় পূর্ববর্তী দু’বছরের তুলনায় ১৯৬১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনে অধিকতর ব্যাপক কর্মসূচি পালন ছাত্রদের সামরিক শাসন উপেক্ষা করার মানসিক প্রস্তুতিরই ইঙ্গিত দেয়।
১৯৬১ সালে উদযাপিত রবীন্দ্রজন্মশত বার্ষিকীর অনুষ্ঠানও বাষট্টির আন্দোলনের পূর্ব প্রস্তুতির পর্যায়ে পড়ে। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও উদারনৈতিক সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সরকারের রক্তচক্ষু, সরকারি প্রচারযন্ত্রের বিরোধিতা এবং সরকারপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীদের বিষোদগার উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন যথাক্রমে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জনাব এস এম মুরশেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. খান সারওয়ার মুরশিদ। এ কমিটির উদ্যোগে চারদিনব্যাপি কর্মসূচি গৃহীত হয়। এতদ্ব্যতীত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগেও দুদিন-ব্যাপি বাঙালির ভাষা-সাহিত্যভিত্তিক স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অগ্রসেনানী ছাত্রসমাজ এ উভয় কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে অংশ নেয়। এতে অভিন্ন উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ অগ্রযাত্রায় বাঞ্ছিত সাফল্য লাভের ইঙ্গিত তারা লাভ করে।
কিন্তু ১৯৬১ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ ও কম্যুনিস্ট পার্টির মধ্যে অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠক এ ব্যাপারে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক শাসনজনিত রাজনৈতিক শূন্যতায় ভবিষ্যৎ আন্দোলনের কর্তব্য নির্ধারণের জন্য অনুষ্ঠিত উক্ত গোপন বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে অংশগ্রহণ করেন শেখ মুজিবর রহমান ও তফাজ্জল হোসেরন মানিক মিয়া এবং কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিত্ব করেন মণি সিং ও খোকা রায়। বিশদ আলোচনার পর সামরিক শাসনের অবসান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সমস্ত রাজবন্দিদের মুক্তি, ২১ দফা মোতাবেক পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসন, ছাত্রদের শিক্ষার অধিকার, শ্রমিক কৃষক ও অন্যান্য শ্রমজীবী জনগণের জরুরি দাবি দাওয়া পূরণ প্রভৃতির ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তুলতে উভয় সংগঠনের মধ্যে এক কর্মসূচিগত ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলন শুরু জন্য সামরিক আইন প্রত্যাহার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী বিবৃতি প্রদান করবেন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করবে। এ আলোচনা সভায় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন শুর করারও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক শূণ্যতায় ছাত্ররা বিকল্প রাজনৈতিক এলিটের মর্যাদায় উন্নীত হয়। বাস্তবিক অর্থেই আন্দোলন শুরুর প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি সম্বন্ধে আওয়ামী লীগ ও কম্যুনিস্ট পার্টির ঐকমত্য স্থাপন এবং শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতার ধারণা উপস্থাপন পূর্ব পাকিস্তানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রগতিশীল ও উদার ভাবধারাসমৃদ্ধ তরুণ ছাত্র সমাজকে উদ্দীপিত করে।
(চলবে)