১৯৭১-এর ২৬৫ দিন

আপডেট: ডিসেম্বর ২৫, ২০১৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

রাজিউদ্দীন আহ্মাদ


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ছয়. মানুষের অব¯থা
দেখতে দেখতে সময় এগিয়ে চলেছে। এদিকে আমার কাজ প্রায় গুছিয়ে নিয়েছি। তখন বোয়ালিয়ায় নানির বাড়িতে এসে কটা দিন জিরিয়ে নিচ্ছি। চুরি করে লোকচক্ষুর আড়ালে নিচু ভলিউমে রেডিওতে খবর ও তখনকার দেশাত্মবোধক গান শোনা, খাওয়া-দাওয়া আর তাশ খেলা। এই সময়ে চমৎকার কিছু গানের জন্ম হয়েছিল যা আজও বাঙালির মনকে মাতিয়ে তোলে। এমনি করে এক-দেড় সপ্তাহ কাটিয়েছি।
একদিন খবর এলো, প্রশান্ত মহাসাগরে অব¯থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ খবর শোনার পরে দেশের প্রতিটি মানুষের চেহারা মলিন হয়ে গেছিল। শরীরের ভেতর থেকে প্রত্যেকের প্রাণটি বেরিয়ে এসে যেন মাথার উপর শূন্যে ভাসমান। খাওয়া-দাওয়া ব›ধ। পুরো একটা দিন এই দমব›ধকরা অব¯থার মধ্যে কাটানোর পর যখন আবার খবর এলো যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারত মহাসাগরে অব¯থানরত তাদের রেড ফ্লিটের অষ্টম নৌবহরের মুখও বাংলাদেশের দিকে ফিরিয়েছে এবং তারপর সপ্তম নৌবহর তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে ফিরে যেতে উদ্যত তখন বাঙালি ধড়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন আর নেই, ১৯৯১ সালে তাকে ধ্বংস করা হয়। আমরা অনেকেই আজ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার অবদানের কথা ভুলে যেতে পছন্দ করি! কিন্তু আমি কখনও ভুলব না।
মানুষের আর্থিক অব¯থাও তখন করুণ। কাজ নেই, উপার্জনও নেই। অনিশ্চয়তাকে সক্সিগ করে মানুষ দিন কাটাচ্ছে জড় বস্তুর মতো, কিন্তু মুক্তিবাহিনী পেলে তা নিয়ে তাদের ব্যস্ততা মনে রাখার মতো। মুক্তিবাহিনীর জন্য খাবারের অভাব হতো না। তাদের নিরাপত্তারও ব্যব¯থা হতো নিখুঁতভাবে। আসলে তখন সকলের মধ্যে একটা দ্বিমুখী অনুভূতি কাজ করছিল বলে আমার বিশ্বাস। কবে সমাধান হবে কেউ জানে না, দিন কীভাবে কাটবে সে সম্পর্কেও কারও কোনো ধারণা নেই। কোটিখানেক লোক ইতোমধ্যেই ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আর কতো জন যেতে পারবে?
রাজশাহী ফিরে এলাম, এবারে ঢাকা যাবার প্ল্যান। একাই যাব ঢাকা। যু™েধর শেষের দিকের ঘটনা এটা যদিও সেই সময় জানতাম না যে সেটাই যু™েধর শেষের দিক।
সাত. যু™েধর মধ্যে পরীক্ষা দিলাম
লুকিয়ে কাজ করতে হোলে জানতে হয় কার কাছ থেকে লুকাতে হবে। ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ বা ছাত্ররা সকলেই তো আমাদের পক্ষের মানুষ নাও হতে পারেন! আমার এক রুমমেটই তো এনএসএফ (আইয়ুব খান-মোনেইম খানের লেঠেল বাহিনী)-এর সদস্য ছিল। আর, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল তাবলিকিদের মূল ঘাঁটি। অবশ্য, তাবলিক করলেই যে পাকিস্তানের সমর্থক হবে, এমন কোনো কথা নেই তবে, সম্ভাবনা বেশি। এদিকে ইউনিভার্সিটির হলে থেকে কাজ করে চলেছি। তাই সতর্কতা ছিল আমাদের জন্য সব চেয়ে বড় অস্ত্র। সময়মতো তৈরি হয়ে ক্লাশের উদ্দেশ্যে বের হতে হতো প্রতিদিন। ফিরে আসব কি না তার কোনো ঠিক ছিল না। আমার আরেক রুমমেট, ফৌজুল আকবর, শুরু থেকেই নিখোঁজ Ñ যু™েধ যোগ দিয়েছেন। তাই এর মধ্যে পরীক্ষা যখন আরম্ভ হলো তখন পরীক্ষাও দিতে হলো। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না।
প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির কেউ না কেউ নিখোঁজ হন Ñ পাকসেনারা উঠিয়ে নিয়ে যায়। হলগুলোতে ছাত্রের সংখ্যা আস্তে আস্তে কমতে থাকলো Ñ সকলেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। এক সময় হলে থাকাটা আর নিরাপদ থাকলো না। হল থেকে গিয়ে মেডিকেল কলেজে আমার দূর সম্পর্কের এক খালার বাসায় আশ্রয় নিলাম। তিনি ও খালু উভয়েই ডাক্তার। তাঁরা আমাকে পেয়ে খুশিই হয়েছিলেন কারণ আমার খালুটি ছিলেন বিহারি। তাঁরা ভয়ে ভয়ে থাকতেন, কখন মুক্তিবাহিনীর লোকেরা এসে হামলা চালায় Ñ বাংলাদেশের বিপক্ষে অব¯থান না নিয়েও লাঞ্ছিত হতে হয়। না, তাঁদের কিছুই হয় নি। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবার পরে আমি যখন তাঁদের বাসা থেকে চলে এলাম তখন আমার খালুটি ভয়ে ইংল্যান্ড চলে যান এবং বহুদিন পরে দেশে ফেরেন একজন কার্ডিয়াক সার্জেন হিসেবে এবং বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ওপেন হার্ট অপারেশন করেন। তাঁর নাম ডাক্তার নবী আলম খান।
আট. ভয়াবহ একটা ঘটনা
এই সময়ের একটা ঘটনা। এই পুরো সময়ের মধ্যে সবচাইতে বেশি ভয় পেয়েছিলাম সেদিন।
আমার এক ব›ধুর মামা ভীষণ অসু¯থ হয়ে পড়লেন। হার্টের অসুখ। সেই সময়ে দেশে সত্যিকারের হার্ট স্পেশালিস্ট ছিলেন না বললেই চলে। সেই ব›ধুর সক্সেগ আমিও মামার দেখাশোনায় লেগে গেলাম। হার্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একজন ডাক্তার ছিলেন পুরানা পল্টনে Ñ তাঁকে নিয়ে আসা হলো। তিনি এসে দেখে-শুনে প্রেসক্রিপশন করে দিলেন এবং বলে গেলেন যে, পরশু পর্যন্ত যদি রুগি বেঁচে থাকেন তবে তাঁকে যেন খবর দেওয়া হয়। এমন ধরনের কথাতে আমার ভিষণ রাগ হয়েছিল, কিন্তু বয়স্ক মানুষ বলে কিছু বলি নি। ওষুধ আনতে নিউ মার্কেট গেলাম সাথে একটা সিরিঞ্জও নিয়ে এলাম, এবং আমিই ইনজেকশনটা দিয়ে দিলামÑ এ কাজটাও আমি ১৯৬০ থেকেই পারতাম। ইনজেকশন দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মামা ঘুমিয়ে পড়লেন। তখন আমি আর আমার ব›ধু একটু বাইরে গেলাম হাটতে। স›ধ্যা থেকেই কারফিউ।
অল্প একটু হেঁটে সক্সকরের কাছে পৌঁছেছি, স›ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে। রাস্তায় কোনো জনমানব নেই। হঠাৎ ধানমন্ডি ক্লাবের দিকের কোনো গলির দিক থেকে এক সেপাইয়ের বাঁশির শব্দ শুনলাম। একটু দেখেই আমরা দুজনেই দৌড়। মামার বাড়িটি ছিল ২৭ নম্বর রোডের মাঝামাঝি থেকে একটু দূরে। আমরা আর পিছন ফিরে তাকাই নি। কতো জোরে দৌড়িয়েছিলাম জানি না। দৌড়ে মামার বাড়ি পৌঁছে গেট খোলার জন্য অপেক্ষাও করি নি, এক লাফে প্রাচির ডিক্সিগয়ে ভেতরে পড়লাম। স্বাভাবিক অব¯থাতে যা আমাদের দুজনের মধ্যে কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। যখন দৌড়াচ্ছিলাম তখন যে অনুভূতি তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো বিদ্যা আমার নেই তবে মনে হচ্ছিল, পেছনের দিকটা যেন ঠা-া হয়ে জমে যাচ্ছে। মাথার দিক থেকে পিঠের দিক দিয়ে শীতল কী যেন ক্রমেই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
প্রাচিরের ভেতরে পড়ে বেশ কিছুক্ষণ আমরা অসাড় শুয়ে কিংবা বসে ছিলাম, তারপরে দুজনেই উঠে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলাম, এবং এ কথা বাড়ির আর কাউকেই বলি নি।
অদ্ভুত ঘটনা, যখন আমরা চিন্তা করছি যে এ যাত্রা মামা বেঁচে গেলেন তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি মারা গেলেনÑ এটা ডাক্তার সাহেবের সেই পরশু দিনই ছিল। এই ডাক্তারটিকেউ পাকসেনারা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল ১৬ ডিসেম্বরের একদিন কি দুদিন আগে।
এই সময়ের আরেকটি ভীতিকর অনুভূতি ছিল পাকসেনাদের প্রপেলার প্লেন দিয়ে ঢাকার যেখানে-সেখানে বোমা ফেলা। প্রতি রাতেই এ ঘটনা ঘটত। এই প্লেনের শব্দ পেলেই আমরা সকলেই বড় আতক্সিকত হয়ে পড়তাম, কারণ তারা সিভিলিয়ানদের বাড়ি, হাসপাতাল, মসজিদ, এতিমখানা জাতীয় জায়গায় বোমা ফেলে ভারতকে দায়ি করার এক কৌশল নিয়েছিল। প্রমাণ করতে পারে নি একটাও কিন্তু এতে সকল নিরীহ মানুষ ভিত হয়ে পড়েছিল। এখানে উল্লেখ করতে হয় যে, দু-চারটা বোমারু বিমান যা ঢাকায় তারা রেখেছিল তা শুরুর দিকেই সব ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল।
নয়. শেষের তিন দিন
তখনও জানতাম না আমাদের এ অনিশ্চয়তা আর কতো দিন চলবে, তবে মনে হচ্ছিল পাকবাহিনীর আয়ু শেষের দিকে। চারিদিক থেকে খবর আসছিল তাদের পতনের। প্রতিদিন খবর আসতো নতুন নতুন এলাকা মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এই সময় প্রায় নির্ভয়ে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আতশবাজি দেখতাম। প্লেনের শব্দ শোনার সক্সেগ সক্সেগ ভীত পাকসেনারা এন্টি-এয়ারক্রাফট গান থেকে শত শত গুলি ছুঁড়তো যা আতশবাজির মতো দেখাতো। পরের দিন থেকে ওই সব প্লেন থেকে লিফলেট ফেলা শুরু হলো যাতে পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হতো। হাতিয়ার ডাল দো …।
এই নদীমাতৃক দেশে পাকসেনারা সত্যিই বিপাকে পড়েছিলÑ এদের অধিকাংশই সাঁতার জানতো না। রাস্তাঘাটের অব¯থা পশ্চিমা শাসকরাই করে রেখেছিল করুণ। পশ্চিম পাকিস্তানের মতো এ অংশেও যদি তারা কিছু উন্নয়ন করে রাখতো, রাস্তাগুলো যদি আরেকটু ভাল হতো, তবে ২৬৫ দিনের মাথায় তাদের অমনভাবে পরাজয় মেনে নিতে হয়তো হতো না। বহু জায়গা ছিল যেখানে তারা ট্যাক্সক নিয়ে তো দূরের কথা জিপ নিয়েও পৌঁছাতে পারে নি।
তারপর ১৬ ডিসেম্বর Ñ সেই কাক্সিক্ষত দিন, অনিশ্চয়তার সমাপ্তি। পাকসেনারা আত্মসমর্পণ করেছে। সকাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ (মুজাফ্ফর) ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)র আভ্যন্তরীণ কর্মিরা ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভূগোল বিভাগের মাঠে অব¯থান নিয়েছিলাম মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। আমাদের গর্বিত মুক্তিযো™ধারা সকাল থেকেই আসতে শুরু করলেনÑ সারা দিন ধরেই তা চলল। অনেকের সক্সেগ যু™ধ শুরু হবার পরে প্রথম দেখা হলো। অনেকে ফেরেন নি। আনন্দের আর বেদনার মিলিত শুর বেজে চলেছিল সেদিন দিনভর।
সেই দিন ছুটপড়া এক পাকসেনা (সম্ভবত পাঞ্জাবি) প্রাণভয়ে তার ইউনিফরম খুলে ফেলে কেবল একটা আন্ডারওয়ার ও গেঞ্জি পরে দৌড়িয়ে যাচ্ছিল ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশ্যে। ছোট ছোট ছেলেরা তাকে ধরে ফেললো শহিদ মিনারের সামনে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম তাকে বাঁচাতে, কিন্তু পারি নি। ছোট ছোট হাতের কিল-ঘুসিতেই অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই লম্বা-চওড়া সৈনিকটি মারা গিয়েছিল। ফুটপাথের উপর তার মাথা আর নিথর দেহটি পড়ে ছিল রাস্তায়, কিন্তু তারপরেও কিল-ঘুসি চলেছিল আরও কিছুক্ষণ। শেষে যখন ছোটদের সেই বাহিনী নিশ্চিত হলো যে সৈনটি মারা গেছে, তখন তাদের মধ্যেকার একেবারে ছোট এক সদস্য সেই মৃতের মুখে প্র¯্রাব করে দিল। এতো ছোট ছোট ছেলেদের অত কিছু বুঝার কথা নয়, কিন্তু তাদের চোখে-মুখে যে ঘৃণা সেদিন দেখেছিলাম তা কোনো দিন ভুলব না।
লেখক: স্থপতি