১৯ নভেম্বর বিশ্ব টয়লেট দিবস || স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা : টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায়ও তা দরকার

আপডেট: নভেম্বর ১৯, ২০১৯, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

খন রঞ্জন রায়


টয়লেট, টাট্টি, পায়খানা, শৌচালয়, শৌচাগার, ল্যাট্রিন ইত্যাদি শব্দটির সাথে ঘিনঘিন ভাব থাকলেও এটি প্রত্যেক মানুষের অতি প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ। পরিচ্ছন্ন এবং পরিচ্ছন্নতা এখন সমগ্র বিশ্বের সকল শ্রেণি-পেশা মানুষের মাথা ঘামানোর কারণ হয়েছে। মূলে রয়েছে টয়লেট ব্যবস্থা। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিবিড় সর্ম্পক টাট্টিখানার সাথে। মানুষের মলমূত্রের সাথে নির্গত হয় নানান জীবাণু। এই জীবাণু পানি প্রবাহের সাথে ছড়িয়ে পড়ে ড্রেন, খাল, বিল, নালা, জলায়। মানুষের নিত্যসঙ্গী পানি। ব্যবহৃত সেই পানির মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। রোগাক্রান্ত হয়। ক্ষেত্র বিশেষে মহামারি আকার ধারণ করে। মানুষের মৃত্যুরোগ কয়েকটি বিশেষ করে কলেরা, টায়ফয়েড, জন্ডিসের একমাত্র কারণ পানিপ্রবাহ। যদিও দোষ পানির নয়। মনুষ্যর্কীতির। মানুষের মলমূত্রের। সঠিক নিয়মে, নির্ধারিত স্থানে পয়ঃনিস্কাশন করার অভ্যাসই শৌচালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ওয়ার্ল্ড টয়লেট অর্গানাইজেশন, ওয়াটার এইড, সেন্টার ফর আববান স্টাডিজ ইত্যাদি নানা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের গঠনমূলক শ্রমঘন জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের ৪০ ভাগ মানুষ এখনো স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা সুবিধার বাইরে আছে। শুধু ঢাকা শহরে প্রতিদিন ৬৫ লাখ ভাসমান মানুষ উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে। এছাড়া ৬ থেকে ১০ লাখ মানুষ প্রতিদিন নৈমিত্তিক কাজে ঢাকাতে যাওয়া আসা করলেও তাদের জন্য সঠিক ভাসমান টয়লেট ব্যবস্থা গড়ে ওঠে নাই।
সারা বিশ্বের সমগ্র মানুষের স্যানিটেশন কার্যক্রমকে শতভাগ সঠিক ব্যবস্থাপনায় আনতে সচেতনতা সৃষ্টিতে দিবসের উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। চালু হয়েছে বিশ্ব টয়লেট দিবস। ওয়ার্ল্ড টয়লেট অর্গানাইজেশনের শ্রম-ঘাম, মেধা-বুদ্ধি আর জোরালো দাবির ফলাফল এই দিবস। ১৯ নভেম্বর ২০০১ সাল থেকেই টয়লেটকে উপজীব্য করে বিশ্বব্যাপি অতি সাড়ম্বরে পালন হচ্ছে এই দিনটি। বাংলাদেশেও ওয়াশ অ্যালায়েন্স, ডরপ, আশা ওয়াটার এইডসহ নানা সংগঠনের সমন্বয়ে সারা দেশে সভা-সমাবেশ, র‌্যালি, পথসভা, আলোচনা, রচনা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমকে ব্যবহার করে পালন হয় এই দিবস।
জাতিসংঘের সর্তকবার্তা হচ্ছে কোনো মানুষ যেন বনে-বাঁদাড়ে, নদী-খালে, পথে-ঘাটে, রাস্তার পাশে শৌচকর্ম না করে। হিসাবে দেখা গেছে, সারা বিশ্বের প্রায় একশ কোটি মানুষের জন্য উন্নত শৌচাগারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় নি। তারা নিয়ত-প্রতিনিয়ত ঘরের বাইরে মলত্যাগ করে। ঘরের ভিতর তো নয়ই নির্দিষ্ট জায়গাতেও গোপন এই কর্ম সম্পাদনের সুযোগ নেই। খোলা জায়গাকে শৌচাগার বানানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ভারত। এরপরই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, নেপাল এবং চিন। আফ্রিকার দেশসমূহও খুব পিছিয়ে নেই। এক্ষেত্রে অধিক জনসংখ্যার দেশ নাইজেরিয়াই সবচেয়ে এগিয়ে। তাদের বেশিরভাগ মানুষই পায়খানা প্রস্রাবের সময় খোলা আকাশকে বেছে নেয়। যেখানে সেখানে খোলা আকাশকে টয়লেট বানানোর কারণে সর্বত্র সবখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। শুধু টয়লেট ব্যবস্থা অপ্রতুলতার কারণে সারা বিশ্বে প্রতি আড়াই মিনিটে একজন নিরপরাধ শিশুর মৃত্যু ঘটে।
অনেক স্কুল, কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর শৌচাগার না থাকায় শিশু শিক্ষা, নারীশিক্ষার ব্যাঘাত ঘটছে, বিঘ্নিত হচ্ছে। সন্তানকে স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকছেন। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে। ঘরের বাইরে প্রাকৃতিক কাজ সারতে গিয়ে ঘটনা দুর্ঘটনা, ধর্ষণ, লাঞ্ছনার শিকার হওয়া নারীর সংখ্যাতো আমাদের দেশেও কম নয়। পত্র-পত্রিকার খবরে তো প্রায় প্রতিদিনই এ বিষয়ের লোমহর্ষক, অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার খবরে আমরা বিচলিত হই, বিব্রত বোধ করি।
শৌচাগার ও পয়ঃনিষ্কাশন বিষয়টি জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হলেও অনেক ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এমনকি দেশও তেমন ভ্রক্ষেপ করে না। আমাদের দেশেও তো কার্যকর পরিষ্কার পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে শহরের ঘুপচি, গিঞ্জি, কলকোলাহল এলাকা, মার্কেট, স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও। দেখা গেছে ইট, রড, সিমেন্ট, বাঁশ, লতাপাতা, টিনঘেরা থাকলেও ওখানে ঠিকঠাকভাবে টয়লেট করাটা একটা স্বপ্ন। ঢুকতেই দেখা যায়, বড় বালতি গামলায় উপচে পড়ছে উচ্ছিষ্ট ময়লা আবর্জনা, নোংরা জীবাণুর স্তুুপ। ময়লাভর্তি শৌচাগার বা কমোড। সেখানে পানি আছে তো বদনা নেই। বদনা আছে তো খাঁ খাঁ শুকনো, নেই পানি। বিকল্প তো বহুদূর। দুর্গন্ধে নাকচাপা পরিস্থিতিকে আর কী বলা সমীচীন। পায়খানা প্রস্রাব তো আটকা রাখার, দীর্ঘ অপেক্ষার কোনো বিষয় নয়, সুযোগও নেই। স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক বিশেষ করে নারী শিশুদের জন্য বিপজ্জনক এই ব্যবস্থাই কাজ সারতে হয়। এই দৃশ্যতো আমরা হরহামেশা দেখি, সচরাচর মুখোমুখি হই। মানুষের পয়ঃবর্জে সংক্রমণের হার অনেক দ্রুত ঘটে। ঘন ঘন হতে পারে। বার বার হতে পারে।
মানুষের মলত্যাগ অভ্যাসকে যথাযথ স্বাস্থ্যসম্মত, সচেতন ও সহযোগিতা করতে অনেক ধনবান ব্যক্তি, সংগঠন, ক্লাব কার্যক্রম চালাচ্ছেন। পরিবেশ বান্ধব, সাশ্রয়ী নিরাপদ টয়লেট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর গবেষণাও কম হয়নি। জনগণ সুফলও পাচ্ছে। দুর্গম, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য উড়ন্ত শৌচাগার প্রকল্পও চালু করা হয়েছে। চলমান বা অস্থায়ী সহজে পরিবহনযোগ্য শৌচাগার ব্যবস্থাও সভা সমাবেশ জনবহুল স্থানে দেখা যায়। তবে তা অপ্রতুল। ল্যাট্রিন ব্যবস্থাকে সর্বজনীন জনপ্রিয় করতে সারা বিশ্বেই নানা আইডিয়া নিয়ে কাজ করছে। অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানও টয়লেট রেস্তোঁরা, টয়লেটের কমোড, বেসিন আকৃতির আসবাবপত্র, পড়ার টেবিল, চেয়ার, টয়লেট আকৃতির গাড়িও বাজারজাত করা হচ্ছে। টয়লেট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার কলাকৌশলী বিবিধ অনুসঙ্গী, নানা রাসায়নিক আবিষ্কার, বাজারজাত বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ধর্মীয় দিক থেকেও টয়লেট ব্যবহার প্রাণালীর নিরাপদ নিশ্চিত সুখকর অনুভূতি জাগাতে দোয়া-দুরুস, বেদমন্ত্র আদেশ-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। টয়লেটে যাওয়ার নিয়মকানুন কলাকৌশল নিয়েও নানামাত্রিক সফল গবেষণা হয়েছে। এর কার্যকারিতার ফল ভোগও আমরা করছি।
যেখানে নিরাপদ পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা নেই সেখানে পর্যাপ্ত টয়লেট স্থাপন, যেখানে শৌচালয় আছে তার যথাযথ পরিষ্কার রাখা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। টয়লেটের ভিতর গিয়ে এর ব্যবহার বিধি ও সর্তকতার সাথে পালন করার বিষয়টি নজরে আনা জরুরি। এটি যেহেতু গোপনকর্ম, লাজ-লজ্জার বিষয় জড়িত ফলে প্রত্যেককে টয়লেটে ঢুকে দরজা ভালভাবে বন্ধ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। অফিস, আদালত, মার্কেট মলের টয়লেটে কেউ থাকলে বারবার নক করে দরজা ধাক্কা দিয়ে তার বিরক্তের কারণ যেন না হই। একটু ধৈর্য্য ধরতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়, খেয়াল রাখতে হয় যেন অযথা বাড়তি জল টয়লেটের মেঝেয় না পড়ে। কারণে-অকারণে হাত-পা ধোয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে নিজস্ব টয়লেট বাড়ির ভিতরে ল্যাট্টিন হলে ভিন্ন কথা, তবু অপচয় যেন না হয় সেদিকে খেয়াল থাকাটা আদর্শ। নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে টয়লেট ব্যবহার পরবর্তীতে অবশ্যই জীবাণুনাশক সাবান, সোডা, গ্রামে হলে ছাই দিয়ে হাত ভালভাবে ধুয়ে নিতে হবে। অনেকে টয়লেটে বসে ধূমপান করে, ধোয়ার টান না দিলে পায়খানা বের হয় না, জীবনসংহারী মারাত্মক এই বদ-অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে।
জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে পৃথিবীব্যাপি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ওখানে পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থাকে অতি গুরুত্বের সাথে ৬ নং ধারায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণও বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সর্বত্র এবং পর্যাপ্ত টাট্টিখানা গড়ে তোলাকে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করা হয়েছে। বাংলাদেশও এখানে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ। গ্রাম-গঞ্জ, খাল-বিল, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, বাসা, বিনোদন কেন্দ্রসহ সবখানে স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বড় চ্যালেঞ্জ। দিবস পালনের আড়ালে পয়ঃব্যবস্থাপনার শক্তিশালী অর্থনীতি, স্বাস্থ্যের উন্নতি, সামাজিক নিরাপত্তা, নারীর মর্যাদার অপরাপর উন্নতি ঘটবে। সুনির্দিষ্ট এই লক্ষ্যে কাজ হোক নিরন্তর-নিরবধি, আমাদের প্রত্যাশাও তাই।
লেখক: টেকসই উন্নয়ন কর্মী