২০০ এতিম ও বৃদ্ধের বাবা শামসুদ্দিন

আপডেট: জুলাই ১, ২০২২, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

আমানুল হক আমান, বাঘা:


২০০ জন এতিম বৃদ্ধের বাবা শামসুদ্দিন সরকার শমেস ডাক্তার। সবাই তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকেন। তার থেকে বয়সে অনেকেই বড় রয়েছেন। কিন্তু তাকে সবাই বাবা বলে ডাকেন।

জানা যায়, ২০০ জনের মধ্যে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া মকবুল হোসেনের বয়স ৭৫ বছর। চার বছর থেকে বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন। তার অবস্থা দেখে স্ত্রী অন্যত্রে চলে গেছে। তার সাত সন্তার রয়েছে। সন্তাররা তার আট বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার পর বাড়ি থেকে বের করে দেন। তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পর তিনি বিভিন্ন হোটেলে কাজ করেন।

বয়সের ভারে হোটেলে কাজ করতে না পেরে এখানে সেখানে থাকতে শুরু করে। তারপর খোঁজ পেয়ে নিজেই চলে আসেন এই বৃদ্ধাশ্রমে। মকবুল হোসেনের বাড়ি নাটোরের দুড়দুড়ি এলাকায়।

তার ৪ মেয়ে, ৩ ছেলে রয়েছে। এখানে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে তিনি শামসুদ্দিন সরকার শমেস ডাক্তারকে বাবা বলে ডাকেন। মকবুল হোসেনের মতো আরো ৬০ জন বৃদ্ধ রয়েছে। এরমধ্যে ৫০ জন নারী বৃদ্ধ ও ১০ জন পুরুষ বৃদ্ধ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ১৪০ জন এতিম। এরমধ্যে ১০৩ জন ছেলে ও ৩৭ জন মেয়ে রয়েছে।

তাদের কারো বা ছেলে-মেয়ে খোঁজ রাখেনা, আবার কারো বা ছেলে মেয়ে উভয়ই না থাকায় তাদের আশ্রয় এখন বৃদ্ধাশ্রমে। এদের মধ্যে কারো বাবা নেই, কারো বা নেই মা, আবার অকালে অনেকেই হারিয়েছে বাবা-মা দুইজনকেই।

একেক জনের জীবনের গল্প একেক রকম। এদের পরিবারের কোনো খোঁজ নেই, এদের মধ্যে কেউ পরিত্যক্ত আবার কেউ দুর্ভাগ্যক্রমে পরিবার বিছিন্ন। এদের পরিবারও নেই, আনন্দও নেই। বাড়ি যেতে চাইলেও বাড়িই তাদের শামসুদ্দিন সরকার শমেস ডাক্তারের এতিমখানা ও বৃদ্ধাশ্রম।

রাজশাহী শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার পূর্বে পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে বাঘা উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের সরেরহাট গ্রাম। এ গ্রামে গড়ে উঠেছে ১৯৮৪ সালে সরেরহাট কল্যাণী শিশু সদন নামে ছোট্ট এতিম খানা। পাশাপাশি ২০১৭ সাল থেকে বৃদ্ধাশ্রম। নাম দেয়া হয়েছে সরেরহাট কল্যাণী শিশু সদন ও মমতাজ আজিজ বৃদ্ধা নিকেতন।

বর্তমানে বৃদ্ধ ও এতিমের সংখ্যা ২০০ জন। এসব এতিম সন্তানরা কেউই তার নিজের নয়। ৩৪ বছরে পৈতৃক ১৭ বিঘা জমি বিক্রয় করে এতিমদের রক্ষা করে চলেছেন।

শামসুদ্দিন সরকার ‘শমেস ডাক্তার’ প্রথমে স্ত্রী মেহেরুন্নেসার মোহরানা বাবদ অর্থে ১২ শতাংশ জমি ক্রয় করে চালু করেন এতিম খানা। আয় বলতে মেহেরুন্নেসার সেলায় ফোঁড়া ও শমেস ডাক্তারের চিকিৎসা থেকে আসা কিছু অর্থ। তাদের রক্ষার্থে আশ্রয়হীনদের ব্যবস্থা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি বাড়ির ভিটা বিক্রি করে নিজেই পরিবার নিয়ে হয়ে পড়েন গৃহহীন। তিনি পল্লী চিকিৎসক পরিবার নিয়ে পড়েন বিপাকে। শেষ পর্যন্ত স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে উঠে আসেন এতিমখানায়।

স্ত্রী মেহেরুন্নেসা শিশুদের দেখা শুনা ও তাদের জন্য রান্না করেন তিন সন্ধ্যা। এখন মেহেরুন্নেসা সেখানকার একজন সেবিকা। বিনিময়ে দুটো খেতে পান মাত্র। এদিকে বৃদ্ধাশ্রমে সার্বিক আর্থিক সহযোগিতা করে আসছেন বিশিষ্ট শিল্পপ্রতি ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। তিনি যতোটুক সহযোগিতা করেন, তা দিয়ে সারা বছর ২০০ জনকে পরিচালনা করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তার পাশাপাশি আরো কেউ সহযোগিতার করলে বৃদ্ধ ও এতিমদের আর একটু ভালভাবে রাখতে পারতেন বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে মকবুল হোসেন বলেন, আমার আট বিঘা জমি সন্তানরা রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার পর বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তারপর আমি বিভন্ন হোটেলে কাজও করেছি। বয়সের ভারে কাজ করতে না পেরে কাজে আর না রাখায় নিরুপায় হয়ে এই বৃদ্ধা নিকেতনে আশ্রয় নিয়েছি। আমি বর্তমানে ভাল আছি। শামসুদ্দিন সরকার শমেস ডাক্তারকে আমি বাবা বলে ডাকি।

গড়গড়ি ইউনিয়নের সরেরহাট সরেরহাট কল্যাণী শিশু সদনের পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন সরকার শমেস ডাক্তার বলেন, নিজের স্ত্রীর, ছেলে-মেয়ের, সরকাররি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে যে, সহযোগিতা পায়, তা দিয়ে ছয় মাস চলে। আর ছয় মাস বিভিন্ন দোকানে বাকি রাখতে হয়।

বছর শেষে ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা ঋণের মধ্যে থাকতে হয়। সরকার ও হৃদয়বান ব্যক্তিদের কাছে সহযোগিতা পেলে অন্তত এই ঋণ থেকে মুক্তি পেতাম। বর্তমানে ৫২ শতাংশ জমির উপর এতিম খানাটি উপজেলা সদর থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার পূর্বে সরেরহাট গ্রামে অবস্থিত।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ