২০২০-এ প্রত্যাশা

আপডেট: জানুয়ারি ৭, ২০২০, ১:১৩ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


বছরান্তে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তি। এ বছর ‘‘মুজিববর্ষ” হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম। তাঁর জন্মশতবর্ষের শেষ দিনটি পর্যন্ত তাঁরই আদর্শ ও চেতনার আলোকে অনেক ত্যাগে অর্জিত দেশ পরিচালিত হওয়া কাম্য। জাতির জনক এই দেশটাকে ‘সোনার বাংলা’য় রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। স্বাধীনতার মাত্র তিন বছর সাড়ে সাত মাসের মাথায় বাংলাদেশ ও বাঙালি বিরোধীরা সপরিবার নৃশংসভাবে খুন করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। দেশবাসীর গৌরবময় অর্জনের বিরুদ্ধে শুরু করে তাদের অপতৎপরতা। তারা দেশ আর জনসাধারণের স্বার্থ পরিপন্থি দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়ে দেশকে পাকিস্তানি নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। করে পরনির্ভরশীল। দুর্বৃত্তায়ন-দুর্নীতি আর ঘুস-চাঁদাবাজির অভয়ারণ্যে পরিণত করে। আজকে সেই খুনিদের পথ অনুসরণ করছে সেই অসভ্য-গণবিরোধীরা। তাদের সমূলে উৎপাটন-প্রতিরোধের মধ্যে দিয়ে দেশকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দেয়ার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে “মুজিববর্ষে”র সার্থকতা প্রমাণ করতে হবে।
সচেতন মাত্রই জানেন, এই দেশটা জন্ম নিতে ত্রিশ লক্ষ বাঙালি আত্মোৎসর্গ করেছেন। সাড়ে চার লক্ষ মা-বোন দিয়েছেন সম্মান বিসর্জন। অসংখ্য মানুষের ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস লুটপাট করে পুড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় ধর্মান্ধ দালাল-দোসররা। এই দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা-নেত্রী এবং কর্মচারিদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রে রাজাকারের তালিকা বিতর্কিত করেছে। মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের পর্যন্ত রাজাকার তালিকাভুক্ত করে সরকার, দল ও দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে। করেছে শহিদের আত্মত্যাগকে উপেক্ষা-অসম্মান। এদেরই চক্রান্তে হঠাৎ হঠাৎ এক একটা পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়, শিশু-নারী ধর্ষণ, নির্যাতন করে ছাত্র হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ঘুস-দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়নে হয় যুক্ত। করে দাঙা-হাঙ্গামা। সৃষ্টি করে শান্তির প্রতিবন্ধকতা। এদের নিয়ে, যাদের সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের নিয়ে গড়ে ওঠে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো, শক্তি প্রদর্শনের খতিয়ান। অন্যায় দাবি না মানায় এরা চ্যাঙদোলা করে শিক্ষককে ছুঁড়ে ফেলে পুকুরে-নর্দমায়। নির্যাতন করে পুড়িয়ে মারে মাদ্রাসা-ইশকুলের শিক্ষার্থিনীকে। অথবা ধর্ষিত হয়ে লজ্জায় আত্মহত্যা করে তরুণী। মুক্তিযুদ্ধের দলে পুনর্বাসিত হয় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং সামরিক স্বৈরাচারের দোসর। তারা দলে-সরকারে পদ-পদবি জুটিয়ে করে স্বেচ্ছাচারিতা, দখল করে দুর্বল মানুষের ভূ-সম্পত্তি আর সরকারি জায়গা। সেখানে গড়ে তোলে তাদের সাম্রাজ্য। পরিবেশ দুষণ করতে যতো রকম দুষ্কর্ম রয়েছে, তার সবকিছুর সঙ্গে এই গণবিরোধীরা যুক্ত। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি, নেতা-মন্ত্রী-মেয়রের নীরবতার সুযোগে তারা নদীর বালি তুলে নদী ভাঙনের মুখে ঠেলে দেয় বসতবাড়ি, ঘর-গেরস্থালি। মানুষের বিপর্যয়ে তাদের কিছু আসে-যায় না। সরকার বলছেন, তারা যে দলেরই হোক না কেনো, বিচারের সম্মুখিন করো। কিন্তু কে শোনে কার কথা! যারা আইন প্রয়োগকারী তারা এদের কাছ থেকে বখরা নিয়ে চোর-পুলিশ খেলায় মেতে ওঠে। ২০২০ সালে নিশ্চয়ই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে বিশেষভাবে উদ্যাপনের লক্ষ্যে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। নেই দায়িত্ব। অনেক রক্তে অর্জিত দেশের উন্নয়নে তাদের ভূমিকা শূন্য। এদের কারণে জনগণ বঞ্চিত-লাঞ্ছিত। এরাই সকল শুভ আয়োজনে তোলে বাধার প্রাচীর। সেই প্রাচীর সরাতেই প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তাহীন। ক্লান্তও। খানিকটা বিষণ্ন ও ক্ষুব্ধ। তাঁর পরিপাশর্^ জুড়ে এখন মোসাহেব-খোসামুদের আস্তানা। বঙ্গবন্ধুও সেটা অনুভব করেছিলেন। তিনি বলেওছিলেন, ‘সব পা-চাটার দল’! এদের প্রতিরোধ করতে পারে একমাত্র দেশের জনসাধারণ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই সেটা সম্ভব। তিনি জনগণের ওপর আস্থা রাখতে পারেন। তাঁর নেতৃত্বই পারে “পা-চাটা” আর দেশ ও গণবিরোধী সুবিধাভোগীদের সমূলে উৎপাটন করতে। তাহলেই এই দেশ হবে স্বাবলম্বী। উন্নয়নের শিখরে উপনীত।
একজন মানুষ জীবনভর অন্যায়-বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই করে যে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে গেছেন, তাঁর স্বপ্ন আমরা উত্তর প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ^াসীরা যদি নিজেদের জবাবদিহিতামূলক কাজের মধ্যে দিয়ে পালন না করি, তাহলে এ দেশ কখনোই “সোনার বাংলা”য় রূপান্তরিত হতে পারবে না। আজকে দেশে যে দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম আমরা লক্ষ্য করছি, তা নিশ্চয়ই একটি অপরাধমূলক রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত হয়ে গেছে। দুর্নীতিবাজ-চাঁদাবাজ আর পিঁয়াজের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, সবই দেশ সৃষ্টির চেতনাবহির্ভুত এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। শেয়ার বাজারের আশঙ্কাজনক দরপতন, ঋণ খেলাপির সংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যপণ্য, অসুধে ভেজাল, আইনবহির্ভুত দুষ্কর্ম, নিরাপত্তাহীন সড়ক, ছিনতাই, শিক্ষাঙ্গনে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে নিরীহ ও মেধাবী ছাত্র হত্যা, ধর্ষণ শেষে হত্যা, সরকারি কেনাকাটায় লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সুকৌশলে হ্রাস করা, সেখানে সরকারি তদারকির অভাব ইত্যাদি দেশবাসীকে হতাশ করে। অথচ বঙ্গবন্ধুর দলের সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। সেটা দলের নেতা-নেত্রীরা বোঝেন, তারপরও তাদেরই নিষ্ক্রিয়তা নয়তো সহযোগিতায় এ সব দিব্বি অবাধে চলছে। তাহলে দেশবাসী আর কার কাছে আশ্রয়-ভরসা চাইবে?
কেউ মানুন আর না মানুন, বর্তমান সরকারের উন্নয়নের দৃষ্টান্ত অপ্রতুল নয়। বিদ্যুৎ আজকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংযুক্ত হয়েছে। সরকারের ভাষ্যমতে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সারা দেশ বিদ্যুতের সুবিধা পাবে। দরিদ্র বিধবা ও বার্ধক্য ভাতা প্রদান, দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের শুরুতেই বই তুলে দেয়া, অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, এগুলো উন্নয়নেরই দৃষ্টান্ত। সরকারের মাদক ও ক্যাসিনো বিরোধী কার্যক্রম, অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতকরণ, নিজ অর্থে পদ্মাসেতুর মতো একটি মহাপ্রকল্পের বাস্তবায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সন্তোষজনক। তারপরও কোনো কোনো দলের নেতা- নেত্রীরা নানা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে অভিযোগ দাঁড় করানো তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। তাদের কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই। এই একবার নির্বাচনে যান, আবার নির্বাচন চলাকালে সরকারকে দেষারোপ করে বয়কট করেন। এখন পর্যন্ত জ¦ালাও-পোড়াও আর নিরস্ত্র মানুষের ওপর নিপীড়ন ব্যতীত তারা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো সফল কর্মসূচি দিতে পারেনি। যারা এই দেশটাকে চায়নি, তার সৃষ্টি বিরোধিতা করেছে, তাদের সঙ্গে তাদের রাজনীতিক ঐক্য। তারা নিশ্চয়ই বাংলাদেশ বিরোধী কথা ও কর্মসূচিতেই বেশি মজা পান। বিশে^র যে সব দেশ বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বৈরী ভূমিকা পালন করেছিলো, তাদের সঙ্গেই এদের সম্পর্ক ভালো। উপরন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো তাদের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচির অন্যতম। এদের কারণে দেশ আজকে উন্নয়নের সোপান গড়তে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ওরা চায় না বঙ্গবন্ধুর “সোনার বাংলা” যাতে কেউ গড়তে না পারে। গড়লে, তারা রাজনীতির খতিয়ানে নিজেদের যুক্ত করতে পারবেন না। এ সম্পর্কে দেশের অনেক গুণিজন অনেক তথ্য দিয়ে লেখালেখি করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর “সোনার বাংলা” গড়তে সোনার মানুষ প্রয়োজন। মনে হয়, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেই সোনার মানুষদের অন্যতমা। তিনি অন্তত তাঁর দলের নেতা-নেত্রীদের সে দিকনির্দেশনা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। দেশবাসী তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল। সে ক্ষেত্রে তাঁকে দলের অপরাধপ্রবণদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তাহলে সমগ্র জাতি বঙ্গবন্ধুর “সোনার বাংলা’’ গড়ার কর্মসূচিতে যুক্ত হয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। তহলেই ভিসন ২০৪১ সফল হবে। তার শুভ সূচনা হোক ২০২০ থেকেই।