২২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস নিয়ন্ত্রণ হোক ব্যক্তিগত গাড়ি পরিবেশ দূষণমুক্ত হবে তাড়াতাড়ি

আপডেট: September 22, 2020, 12:24 am

বছরে একদিন, অন্তত একদিন ব্যক্তিগত সব রকমের গাড়ি পরিত্যাগ করার দিন আজ। গাড়িচালক ও মালিকগণের এই ব্যাপারে সচেতন অনুভূতি উপলব্ধি করার জন্যই এই দিবসের উদ্ভব। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সংকট গাড়িমুক্ত দিবসের ধারণাকে পরিষ্ফুট করে। অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বিস্তর ভাবনায় ফেলে। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের টোলেডো সম্মেলনে ব্যক্তিগত গাড়ি চালানের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। মোটরগাড়ির সাথে নগরজীবনের অঙ্গাঅঙ্গীভাবের ভাবনায় উদ্যোক্তাদের আচ্ছন্ন করে। গাড়ি যদ্দুর কম ব্যবহারের সুবিধা-অসুবিধা, উপকারিতা আর ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হয়। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে আইসল্যান্ডের রিকযভিক, ব্রিটেনের বাথ এবং ফ্রান্সের লা রোসেলে শহর প্রধানরা একদিন গাড়িমুক্ত রাখার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেন। তাতে অণুসমর্থন করে বাস্তবিক অর্থে মাঠে নামেন কিছু সংস্থা, সংগঠন আর সকলকে নিয়ে গড়া এক কনর্সোটিয়াম। তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে এই দিবস পালন শুরু করেন। শুরু হয় গাড়িমুক্ত দিবস ভাবনার প্রতিফলন। প্রথম থেকেই জোরেসোরে। ঢাক ঢোল পিটিয়ে। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে জাতীয়ভাবে শোভাযাত্রার আয়োজন করে। সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে সেখানের এনভায়র্নমেন্ট ট্রান্সপোর্ট এসোসিয়েশন। গাড়ির সাথে পরিবেশের যোগসূত্র ওতপ্রোত। ঘনিষ্ঠ। অতি নিবিড়ভাবে। পরবর্তী বছর ফ্র্যান্স আরো একধাপ এগোয়। সুনির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্বাচন করে। সাহসের সাথে প্রকাশ করে “আমাদের শহর, আমার গাড়ি ছাড়া” ব্যাপক প্রচারণার ফলে জনসাধারণ এগিয়ে আসে। সম্পৃক্ত হয়। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন ভাবনা। আলোড়িত হয় গাড়ির মালিক চালক সকলের প্রাণস্পন্দন। সঞ্চারিত হয় একে অপরের সহানুভূতি। চালানো হয় কূটনৈতিক তৎপরতা। সাফল্যও আসতে থাকে দ্রুত।
২০০০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দিবসটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। তাদের আহবানে ও মাধ্যমে উদযাপন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। পুরো ইউরোপ ছড়িয়ে পরে স্বাস্থ্যকর বার্তা দেওয়া এই দিবস কার্যক্রমের। এই ব্যাপারে গাড়ির মালিক, চালকসহ সর্বস্তরের মানুষের সাড়া পড়ে আশ্চর্যজনকভাবে, ব্যাপক হারে। এই দিবসের উদ্দেশ্যকে আরো বেশি সফল করতে, কার্যকর করতে, সাফল্য পেতে সারা ইউরোপে সংযুক্ত হিসাব পালন করে ইউরোপিয়ান মোবিলিট সপ্তাহ। পরিবেশ পরিবহণ সংস্থা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে সকলকে নিয়ে ২২ সেপ্টেম্বরকে ঘোষণা করে গাড়িমুক্ত দিবস। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। বিরোধীতার মুখোমুখি হতে হয়নি, কেবলই সামনে এগিয়ে চলার শক্তি সঞ্চয় করা। সাথে পত্র-পত্রিকায় সংবাদ মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা। তাদের সহযোগিতা নেওয়া। ওয়াশিংটন পোস্টের মতো প্রভাবশালী পত্রিকা এগিয়ে আসে। সমর্থন জানায়। প্রচারণার নানা কৌশল প্রয়োগ করে। নানা রকমের ও ধরনের বাস্তবভিত্তিক যুক্তি তুলে ধরে নিবন্ধ প্রকাশ শুরু করে। গণপরিবহন উন্নয়নের যুক্তিযুক্ত গতিপথ বাতলে দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সম্মাহিত করে। ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া জনসাধারণকে চলাফেরা করার বুদ্ধি-কৌশল উপকারিতা তুলে ধরে প্রচারণা চালায়। সংক্ষিপ্ত দূরত্বের যাত্রাপথে, বাজারে, অফিসে, কর্মস্থলে হেঁটে যাওয়ার অভ্যাস সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। হাঁটার উপকারিতা নিয়ে এখন প্রায়দিন প্রতিদিন কোনো না কোনো পত্রিকা, মিডিয়া, বিজ্ঞানসম্মত, গবেষণালব্ধ হিসাব নিকাশের লেখাজোকা প্রকাশ করে স্বাস্থ্যসম্মত নিরোগ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করছে। প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। কখন কিভাবে কোথায় কতক্ষণ কাকে নিয়ে ইত্যাদি হাজারো সুপরামর্শের যুক্তিযুক্ত নির্দেশাবলীর জন্য দেশের পত্রিকাগুলি আলাদা পৃষ্ঠা খুলেছে। রঙিন ছবি ছাপিয়ে হাঁটার অভ্যাস গড়তে সংশ্লিষ্ট জনগণকে আকৃষ্ট করছে। সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে। সুস্থ সবল নিরোগ জাতি উপহার দিতে; গড়ে ওঠতে সৃষ্টিশীল সৃজনী দায়বদ্ধতার ভূমিকা পালন করছে।
এত গেল পত্রিকা মিডিয়ার দায়িত্বশীল কর্মকাণ্ড। কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন। বিশেষ করে বেদনাময়, বিরক্তিকর শহরজীবনে। নগরজীবনে হাঁটা চলাচলের স্বস্তিদায়ক পথ, ফুটপাত তো সহসা মেলে না। উন্নত পৃথিবীর দৃষ্টিনন্দন নগরের প্রশস্ত ফুটপাতের ন্যায় বাংলাদেশেও গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। সাধ আর সামর্থ্যরে মেলবন্ধন ঘটানো হয়। দ্রুত নগরায়নের কষ্টদায়ক সুফলে যেটুকু ফুটপাত রাখা হয়, রাখা সম্ভব হয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেরকম দ্রুততায় তা আবার বেদখলে যায়। অবৈধ স্থাপনা, ব্যক্তিগত মালামাল, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে দখলের থাবা আর হকারদের দখলতো নতুন কিছু নয়। বহু পুরাতন সমস্যা। মাঝে মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দূষণমুক্ত করার হুংকার ছাড়লেও তা কাগজে কলমে। বাস্তব বড় কঠিন নির্মম। ক্ষেত্র বিশেষে অসহায়, করতে হয় আত্মসমর্পণ। পথচারীবান্ধব ফুটপাতে পরিণত করার ঘোষণা দাম্ভিক আহবানে সীমাবদ্ধ থাকে। ফুটপাতে হাঁটবেন, উপায়হীন নিরুপায়, নানা বিড়ম্বনা সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এগুতো হয়। সীমাহীন কষ্ট, আর ধৈর্য্য। বিরল ব্যতিক্রম দুই একটি ফুটপাত নাই; তা নয়। তবে আমাদের দেশের শহরের জনসংখ্যার তুলনায় তা একেবারেই নগণ্য, নামমাত্র। আমরা পারি, আমাদের আছে তার নির্দশন জানানোর জন্যই হয়তো; মানুষজনও ঝামেলাপূণর্, বিব্রতকর, হয়রানিমূলক রাস্তাঘাট, ফুটপাত ব্যবহারে নিরুপায় হয়ে অভ্যস্ত দিনযাপন করছে। নিয়তির কাছে সপে দিয়েছে জীবনবোধ। গাড়িমুক্তি দিবসের সাথে হাঁটার অধিকার প্রতিষ্ঠা পুরোপুরি নির্ভরশীল। লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনেক সংগঠন আন্দোলন পর্যন্ত করে, করে যাচ্ছে। হাঁটাপথের বাধা দূর করার চেষ্টা তদ্বির নিয়ত প্রতিনিয়ত করেছে। যাঁদের দ্বারা এই কাজ করা সম্ভব, তাঁদের যেন মাথা ব্যথা হয় সেদিকটিও সচেতনভাবে তুলে ধরার মানবিক মানসিক শক্তি-সাহস অর্জনের বুদ্ধিমত্তা দেখাচ্ছে। গণপরিবহন ব্যবস্থার দূরাবস্থাও যেন দূর হয় সেদিকটিও উদ্বেগের সাথে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যথাযথভাবে তুলে ধরছে। যান্ত্রিক বাহনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ধুয়াবিহীন স্বল্প খরচের সাইকেল নির্ভর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টিকে যুক্তিযুক্ত বলেন। এক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যময় নিরাপদ প্রশস্ত, আলাদা লেইনের ফুটপাত নির্ধারণ করার বিকল্প নেই। আধুনিক নগর পরিকল্পনার সমুন্নত ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যক্তিগত গাড়ির লাগাম টানতেই হবে। বায়ু-দূষণ, শব্দ দূষণ, যানজট নিরসনে মেট্রোরেল, আন্ডারপাস, ইউলুপ,এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার ইত্যাদি সহায়ক প্রকল্প যতই ভূমিকা রাখুক না কেন; নির্মল, স্বাস্থ্যকর, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন ভোগের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। যথেচ্ছ ব্যবহার পরিমিত করা। ক্ষেত্র বিশেষে বিধিনিষেধ আরোপ করা।
সত্তরের দশক থেকে ইউরোপ ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর জোরালো পদক্ষেপ নিলেও আমরা যথারীতি পিছিয়ে। জনগুরুত্বের এই দিবস বেসরকারিভাবে কিছু সংস্থার সমন্বয়ে ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশে মজার মজার নানা কার্যক্রমে আয়োজন হয় বটে তবে তা সীমিত আকারে। পৃথিবীর চারশতাধিক শহরের সাথে যানজটপ্রবণ প্রায় পরিত্যক্ত ঢাকা শহরের একটি কিয়দংশ এলাকায় উদযাপন হয় এই দিবস। তাও নামকাওয়াস্তে। দায়সারাভাবে। পর্যাপ্ত প্রচার প্রচারণার অভাবে দেশের জনসাধারণের মাঝে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। অথচ মানুষের জীবনজীবিকা, সুস্বাস্থ্য, মানবিকতা, গতিময়তা, ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ, প্রকৃতি, বিশুদ্ধ জীবনাচারসহ জীবনধারনের সকল উপকরণ নির্ভর করে এই দূর্ষণ-বিদূষণের কাণ্ডকারখানায়।
আজকের ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত বিশ্ব দিবসের মূল লক্ষ্যই হল ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। গণপরিবহণে যাতায়াত উৎসাহ বোধ করা। দূষণে-দখলে বিপর্যস্ত রাস্তাঘাট ফুটপাত নির্ভরতার সাথে উপভোগ করা। আসুন আমরা সকলে মিলে সেই কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করি। দূষণ, দখল, গাড়িমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করি।
লেখক: টেকসই উন্নয়নকর্মী

khanaranjanroy@gmail.com