২৬ জুন

আপডেট: June 26, 2020, 12:41 am

২৬ জুন ১৯৪৯ : ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তির পর সরাসরি আওয়ামী লীগের কর্মিসভাতে যোগ দেবার জন্য রওনা হন শেখ মুজিবুর রহমান। একটি খোলা জিপে শেখ মুজিবুরের সাথে ছিলেন তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান, শামসুল হক, ইয়ার মোহাম্মদ খান প্রমূখ।

২৬ জুন ১৯৬৬ : কারগারে বঙ্গবন্ধুর লেখা থেকে, “ভোর রাত থেকেই মাথা ভার ভার লাগছিল। বিছানা ছাড়তেই মাথার ব্যথা বেড়ে গেল। আমার মাথায় যন্ত্রণা হলে অসহ্য হয়ে উঠে। অনেকক্ষণ বাইরে বসে রইলাম, চা খেলাম, কিছুতেই কমছিল না। ওষুধ আমার কাছে আছে, ‘স্যারিডন’, কিন্তু সহজে খেতে চাই না। আবার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুলে বেশি লাগে তাই অনেকক্ষণ বাইরে যেয়ে হাঁটতে লাগলাম। বাতাসে ভালই লাগছিল। ব্যথা একটু কম কম লাগছিল।

আজ তো রবিবার। কয়েদিরা কাপড় পরিষ্কার করবে। ঠিক করেছি, স্যারিডন সহজে খাব না। মেট ও পাহারা কাহাকেও কিছু বললাম না। প্রায় দশটার দিকে আরাম লাগছিল। বাইরে থাকতে মাথা ব্যথায় অনেক সময় কষ্ট পেতাম। স্যারিডন দুই তিনটা খেয়ে চুপ করে থাকতাম। আধা ঘণ্টা পরেই ভাল হয়ে যেতাম। আবার কাজে নেমে পড়তাম। রেণু স্যারিডন খেতে দিতে চাইত না। ভীষণ আপত্তি করত। বলত, হার্ট দুর্বল হয়ে যাবে। আমি বলতাম, আমার হার্ট নাই, অনেক পূর্বেই শেষ হয়ে গেছে। বাইরে তার কথা শুনি নাই। কিন্তু জেলের ভিতর তার নিষেধ না শুনে পারলাম না।
ডিপুটি জেলার সাহেব এলেন। কিছু সময় পরে জমাদার সাহেব তার ফৌজ নিয়ে হাজির। আমার ঘর তালাশ করবে। কোনো কিছু বেআইনি লুকাইয়া রাখি কি না? এটা জেলের নিয়ম। রাজবন্দিদের ঘরগুলি সপ্তাহে একবার করে তালাশি দেওয়া হয়ে থাকে। তবে আমার ঘর তালাশি বেশি করে না। এসে দেখে যায়। কারণ জানে বেআইনি কাজ আমি করি না। আর বেআইনি জিনিস আমার কাছে থাকে না। তবে আসলেই আমি নিজেই বলি বের হয়ে যেতেছি, আপনারা তালাশ করে দেখে নিন। ইচ্ছা করলে এরা শরীর তল্লাশি করতে পারে, তবে জেলা ও ডিপুটি জেলার ছাড়া অন্য কেহ পারে না। সিপাহিরা ঘরের ভিতর আসল না, শুধু জমাদার সাহেব ভিতরে এসে ঘুরে গেলেন।

আমি বললাম, ‘প্রত্যেক সপ্তাহে আসেন কিছুই পান না। একবার বলবেন, আমি কিন্তু বেআইনি মাল রেখে দিব।’ এরা খোঁজ করে কোনো চিঠিপত্র বাইরে পাঠাই কিনা? কোনো অস্ত্রপাতি আনি কিনা বাইরে থেকে, যা দিয়ে পালাতে পারি রাজবন্দি অস্ত্রপাতি আনে এ খবর আমার জানা নাই। তবে অনেক সময় চিঠিপত্র পাওয়া গেছে রাজবন্দিদের কাছ থেকে। এরা এক সেল থেকে অন্য সেলে যোগাযোগ রাখে। এক এরিয়া থেকে অন্য এরিয়ার সাথেও যোগাযোগ রাখে। যখন জেল কর্তৃপক্ষ অথবা সরকারের সাথে বোঝাপড়া করতে চায় তখন যাতে একসাথে করতে পারে। সেজন্যই যোগাযোগটা করে। আজকাল তাহাও করে না। কারণ বিচার কোথায়?

জমাদার চলে গেলেন। ডিপুটি জেলার সাহেব বসলেন কিছু সময়। আমার সহকর্মীদের উপর সরকারের এই ব্যবহারের কথা বললাম। আওয়ামী লীগ কর্মীদের ও মানিক ভাইকে যে অবস্থায় রেখেছে দুষ্ট প্রকৃতির কয়েদিদেরও সেভাবে রাখা হয় না। এদের বলে লাভ নাই জানি, কারণ, গ্রেপ্তার করে জেলগেটে পৌঁছাইয়া হুকুম দিয়ে যায়-কোথায় কাদের রাখা হবে।… [সূত্র : কারাগারের রোজনামচা, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা নং- ১২৫-১২৮]