২৭ জুন

আপডেট: June 27, 2020, 12:10 am

২৭ জুন ১৯৬৬ : কারাগারে বঙ্গবন্ধুর লেখা থেকে, “…. কয়েকজন নাম করা কয়েদি, একজন মোক্তার বাবু, পটুয়াখালী বাড়ি-আর নুরুদ্দিন নামে ডাকাতি মামলার আসামি একজন নতুন কয়েদিকে এখানে আনা হয়েছে। তার বাড়ি গোয়ালন্দ মহকুমায়। ভদ্রলোকের ছেলে, বাড়ির অবস্থা ভাল, লেখাপড়াও জানে। রাত্রে শুয়ে শুয়ে তার গান শুনছিলাম। চমৎকার গান গায়। ভারী সুন্দর গলা। যদি সত্যিই সাধনা করত তাহলে বাংলাদেশের বিখ্যাত গায়কদের অন্যতম গায়ক হতো। আইন মানে না। কথা শোনে না। যথেষ্ট মার খেয়েছে এই কারাগারে এসে। কাউকেই মানে না, যা মুখে আসে তাই বলে। সমস্ত মার্ক কেটে দিয়েছে জেল কর্তৃপক্ষ। কোনো মার্ক পাবে না। তিনমাসে কয়েদিরা ১৮ দিন থেকে ২৩ দিন পর্যন্ত মার্ক পেয়ে থাকে। মানে ভালভাবে জেল খাটলে আইন ভঙ্গ না করলে কয়েদিদের নয় মাস সাড়ে নয় মাসে বৎসর। যত মার্ক শুরুতে পেয়েছিল তা আবার কেড়ে নিয়েছে জেল কর্তৃপক্ষ। পুরা দশ বৎসর খাটতে হবে। ভালভাবে থাকলে সাত বৎসর বা কাছাকাছি জেল খাটলেই খালাস পেত। এখন ওকে পুরা জেল খাটতে হবে। আমাকে বলে, ‘পুরাই খেটে যাব। আর যাবারও ইচ্ছা নাই। মরলেও ভাল হতো। বাবা ভাইরা কোনো খবর নেয় না। ডাকাতি ও খুনের মামলায় জেল হয়ে তাদের ইজ্জত মেরেছি।’ একবার ওর মা ফরিদপুর জেলে দেখতে এসেছিল। তাকেও নিষেধ করে দিয়েছে। ২২ বৎসর বয়সে জেলে এসেছে। স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে গিয়েছে ৭/৮ বৎসর পর্যন্ত কয়েদির খাওয়া খেয়ে, মশার কামড় সহ্য করে। স্বভাবের জন্য অত্যাচার সহ্য করে করে স্বাস্থ্য নষ্ট করে ফেলেছে। সকলেই বলে, ‘লোক সাংঘাতিক’!
আমি বললাম, নুরু কেন জীবন নষ্ট করলে বলতে পার? বাবা-মার মুখে চুনকালি দিলে, বংশের ইজ্জত নষ্ট করলে, কারাগারে কষ্ট করলে, কি লাভ হলো? তোমাকে জেলেও সকলেই খারাপ বলে। যে কয়দিন থাক, ভালভাবে থাক, তাড়াতাড়ি জেল খেটে বাড়ি যাও। বাবা-মার কাছে ফিরে যাও, আর এ পথে পা বাড়িও না।’ বলল, ‘স্যার আমার দুঃখের কথা না-ই শুনলেন। চেষ্টা করব আপনার কথা রাখতে, তবে কি মুখে আর বাবা-মার কাছে যাবো? তাই গোলমাল করে পুরা জেল খাটতে চাই। বাইরে যেয়ে আর হবে কি? মরতে পারলে ভাল হয়।’ আমি বললাম, ‘তোমার জেল থেকে বের হবার পূর্বে (সম্ভাবনা কম) যদি আমি বের হই, তবে দেখা করো। তোমার বাবা ও ভাইকে আমি চিঠি দিব। কিন্তু বের হলে কিছুদিন বাড়ির বাইরে যেতে পারবা এবং ঐ কুপথে আর পা বাড়িও না।’ সে বলল, ‘আপনার কাছে আমাকে নিয়ে নেন।’ আমি বললাম, আমার আপত্তি নাই। ‘তোমাকে আমার কাছে দিবে না। গান গাও নুরু, তোমার গান শুনি, ভাল লাগছে তো আমারও। অনেক গান গাইল, বললাম, বাংলার মাটির সাথে যার সম্বন্ধ আছে সেই গান গাও। আমি বারান্দায় মাটিতে বসে পড়লাম। নুরু ওর সেলের বারান্দার কাছে বসে গান করতে শুরু করল। অনেকক্ষণ গান শুনলাম। পরে আবার হাঁটতে লাগলাম।
… ইংরেজের সময়ও অনেক কাল পর্যন্ত রাজবন্দিদের দরজা বন্ধ করার হুকুম ছিল না।
দরজা বন্ধ কেন? গলা টিপে মারো, তাতেও আমাদের কোনো আপত্তি নাই। শুধু শোষণ বন্ধ কর। জনগণের অধিকার ফেরত দাও।”
[সূত্র : কারাগারের রোজনামচা, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা নং- ১২৮-১৩১]
২৭ জুন ১৯৭২ : বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘শোষক ও সমাজবিরোধীদের স্থান বাংলাদেশে নেই। সব ধরনের নির্যাতন, অবিচার আর শোষণের বিরুদ্ধেই বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটেছে। যারা এগুলো বহাল রাখতে চাইবে, তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। শোষক ও সমাজবিরোধীদের স্থান বাংলাদেশে নেই।’ (দৈনিক বাংলা ২৮ জুন, ১৯৭২)।
২৭ জুন ১৯৭২ : বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে বলেন ‘কৃষক না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না।’ (দৈনিক বাংলা ২৮ জুন, ১৯৭২)।
২৭ জুন ১৯৭৪ : ভুট্টো ১০৭ সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে বাংলাদেশ সফর করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভুট্টোর এই সফরকে অপরিসীম তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেন।