২৯ জুন

আপডেট: June 29, 2020, 12:13 am

২৯ জুন ১৯৬৬ : বঙ্গবন্ধুর লেখা থেকে, “…বৃষ্টি হতেছে, মুষল ধারে। যখন বৃষ্টির খুব প্রয়োজন ছিল তখন হয় নাই, এখন যখন বৃষ্টির প্রয়োজন নাই তখন খুব হতেছে। বন্যায় দেশের খুবই ক্ষতি হয়েছে। চাউল তেল ও অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়েই চলেছে। মোনায়েম খান সাহেবের বক্তৃতায় পেট ভরে যাবে সকলের। তিনি বলেন, আল্লাহর তরফ থেকে বন্যা হয়েছে। কষ্টের ভিতর দিয়ে খোদা লোককে পরীক্ষা করে থাকেন। কি আর বলা যায়। বন্যা কনট্রোল করতে পারে আজকাল দুনিয়াতে। অনেক দেশে করেছেও। একটু চক্ষু খুলে দেখলে ভাল হয়। ভদ্রলোকের দোষ কি? কিই-বা জানেন আর কিই-বা বলবেন।

 

খান সাহেব এদিক দিয়ে ভাল লোক, স্বীকার করেন যে তিনি নূরুল আমীন সাহেবের হুকুমে গুন্ডামি করে বেড়াতেন। এখন তিনি লাট হয়েছেন। ভাল কথা। ‘গুন্ডার পরে পান্ডা। পান্ডার পরে নেতা, এইতো হলো নেতার ডেফিনেশন।’

 

হঠাৎ পেট দিয়ে রক্ত পড়লো অনেক ফিনকি দিয়ে, চেয়ে দেখলাম, সবই লাল। ব্যাপার কি? পাইলস তো সেরে গিয়াছে, অনেক আগেই, প্রায় তিন বৎসর হলো। পেটে কোনো অসুখ নাই। তাই মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আবার সকাল দশটায় একবার পায়খানায় যাই। দেখি আবার রক্ত, বুঝলাম আবার পাইলস হয়েছে। কিন্তু চিন্তা করে লাভ কি? ভুগতে তো হবেই। ডাক্তার সাহেব এলেন। বললেন, ঔষধ দিতেছি। ঔষধ পাঠাইয়া দিলেন। খুব সাবধানে থাকি আমি জেলে। শরীর রক্ষা করতে চাই, বাঁচতে চাই, কাজ আছে অনেক আমার। তবে একটা ছেড়ে আর একটা ব্যারাম এসে দেখা দেয়।
কাল জাতীয় পরিষদ থেকে বিরোধী দল একই দিনে দুইবার পরিষদ কক্ষ বর্জন করে-স্পিকারের রুলিংয়ের প্রতিবাদে। আমার মনে হয় বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের এই পরিষদ থেকে পদত্যাগ করাই উচিত। এই পরিষদের যা ক্ষমতা তাতে এর সদস্য হওয়ার অর্থ কি? দুনিয়াতে পার্লামেন্টের যে কনভেনশন আছে তার ধারে কাছ দিয়েও এরা যায় না।

 

প্রেসিডেন্ট, সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে রেখে একটা পরিষদ করেছে দুনিয়াকে দেখানোর জন্য। বিরোধী দলের নেতাকে বলতে দেয় না স্পিকার, এই প্রথম শুনলাম।

 

আজ তো আমার দেখা হওয়ার কথা নাই, এর মধ্যে জমাদার সাহেব এসে বললেন, চলেন আপনার, ‘সাক্ষাৎ’। তাড়াতাড়ি যেয়ে দেখি আমার স্ত্রী আসে নাই। তার শরীর অসুস্থ কয়েকদিন ধরে। ছেলেমেয়েরা এসেছে। ছোট ছেলেটা আমাকে পেয়ে কিছু সময় ওর মায়ের কথা ভুলে গেল। ছেলেমেয়েরা ওদের লেখাপড়ার কথা বলল। আমার মা খুলনায় আছে, অনেকটা ভাল। ছোটখাট অনেক বিষয় বলল। অনেক আবদার। আমার কষ্ট হয় কিনা! ছোট মেয়েটা আমার কাছে কাছে থাকে, যাতে ওকে আমি আদর করি। বড় মেয়েটা বলছে, আব্বার চুলগুলি একেবারে পেকে গেল। বড় ছেলে কিছু বলে না, চুপ করে থাকে। লজ্জা পায়। আমার কোম্পানির ম্যানেজার এসেছিল, ব্যবসা সম্বন্ধে আলোচনা করতে। বললাম যে, যারা আমাদের ব্যবসা দেয় তাদের আমার কথা বলতে, নিশ্চয়ই ব্যবসা দিবে। ছোট ছেলেটার, তার মার কথা মনে পড়েছে। তাড়াতাড়ি বললাম, তোমরা যাও না হলে ও কাঁদবে।

 

ছেলেমেয়েরা চলে গেল। দেখলাম ওরা যেতেছে। মনে পড়ল নিশ্চয়ই রেণুর শরীর বেশি খারাপ নতুবা আসতো। সামান্য অসুস্থতায় তাকে ঘরে রাখতে পারত না।” [সূত্র : কারাগারের রোজনামচা, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা নং- ১৩৩-১৩৫]