২৯ মার্চ : সরদহ পুলিশ একাডেমিতে বিদ্রোহ || জেলা প্রশাসকের আত্মসমর্পণ

আপডেট: মার্চ ২৯, ২০১৭, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

ওয়ালিউর রহমান বাবু


পাকিস্তান সরকারের পক্ষত্যাগ করা রাজশাহীর চারঘাট থানার মীরগঞ্জ ইস্টপাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) প্লাটুন হেড কোয়ার্টারের বাঙালি নায়েক সুবেদার সিরাজ উদ্দিন লস্কর ১৯৭১ এর ২৮ মার্চ তার অধিনস্থ বিওপি থেকে অস্ত্র নিয়ে পরের দিন ২৯ মার্চ মীরগঞ্জ উপস্থিত হয়ে স্বাধীনবাংলার পতাকা তুলে চারঘাট বাজারে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। জনাব লস্করের দেয়া তথ্যে জানা যায়. তিনি ল্যান্স নায়েক মনোহার আলী ও অন্য পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে চারঘাট বিওপিতে এসে জানতে পারেন, বিওপি কমান্ডার ও হাবিলদার ভারত আক্রমণ করবে মনে করে ট্রেন্সের জায়গা দেখতে গেছেন। এসময় নায়েক সুবেদার সিরাজ উদ্দিন লস্কর অবাঙালি সকলকে অস্ত্র মাটিতে রাখতে বলে পিছনে ঘুরতে বলেই বন্দি করে ফেললেন। কমান্ডার সুবেদার হাসেন আলী দৌড়ে এসে তাকে অস্ত্রত্যাগের নির্দেশ দিলেন। তিনি তখনো বুঝতে পারেননি নায়েক সুবেদার সিরাজউদ্দিন লস্কর পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছেন। নায়েক সুবেদার সিরাজউদ্দিন লস্কর হাসেন আলীর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে তার ফোল্ড থেকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে তাকে বন্দি করে সকলের সাথে চারঘাট থানায় পাঠিয়ে দিলেন। সিরাজউদ্দিন লস্কর ল্যান্স নায়েক মনোহার আলী ও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল ডিআইজি আব্দুল খালেককে সব কিছু বললেও তিনি নায়েক সুবেদার সিরাজউদ্দিন লস্কর কে বাঁধা দিতে থাকলেন। কিন্তু লস্কর তার বাঁধা উপেক্ষা করে লস্কর অ্যালার্ম বাজিয়ে দিলেন। তা শুনে বিউগলে সুর দেয়ার সাথে সাথে নিয়ম অনুযায়ী সকলে ফল-ইন করে ফেললেন। আউট সাইড ক্যাডেট ও ডিপার্টমেন্টাল ক্যাডেটরা সব শুনে জয়বাংলা সেøাগান দিয়ে অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধের শপথ নিলেন। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে আনসারদের পোষাক সংগ্রহ করা হলো। একাডেমির প্রিন্সিপাল ডিআইজি খালেক পরিবার নিয়ে একাডেমি ছেড়ে চলে গেলেন। ভাইস প্রিন্সিপাল মি. বড়ুয়া, সিএলআই পঙ্কজ, সিএলআই গাজী আব্দুর রহমান স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে পুলিশ একাডেমিকে কন্ট্রোলরুম করলেন। সিরাজ উদ্দিন লস্কর ইপিআর ইউসুফপুর বিওপিতে গিয়ে বাঙালি সৈনিকদের সংগঠিত করলেন। সরদহ আইয়ুব ক্যাডেট কলেজের বাঙালি অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন আব্দুর রশিদ ও অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক জনাব লস্করের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করলেন। অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক নিজের নাম রাখলেন জয়নাল আবেদিন। সরদহতে সংগ্রাম কমিটি গঠন করে স্বাধীনতাকামী ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে বাহিনী গঠন করা হলো। এই বাহিনী রাজশাহীর সরদহ-চারঘাট, নাটোরের লালপুর থানার কয়েকটি অঞ্চলসহ আড়ানী, গোপালপুরে (আজিমনগর) প্রতিরোধ গড়ে তুললো। পাবনা থেকে পালিয়ে আসা বেশ কিছূ পাকিস্তানি সৈন্য আড়ানী ব্রিজে নিহত হলো।
রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই বিছিন্ন। মুক্তিযোদ্ধা সেই সময়কার ছাত্রনেতা মোহাম্মদ আলী কামালের দেয়া তথ্যে জানা যায়, ২৯ মার্চ দুপুরের আগেই তিনি সঙ্গী আলাউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহী পৌঁছে খুঁজতে থাকলেন পরিচিত জনদের। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন। রাজশাহী শহরে সোনাদিঘির কাছে হোটেল কাশিনায় থাকা এক বাঙালি পুলিশ ইন্সপেক্টরের সাথে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে জানালেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে স্বাধীনতাকামী যোদ্ধারা দুই এক দিনের মধ্যে রাজশাহী শহরে অ্যাডভান্স করবে। স্বাধীনতাকামী বাঙালি পুলিশেরা বিছিন্ন না থেকে যেন এক সাথে থাকে। বিকেল চারটার দিকে তারা নিরাপদে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৌঁছালেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের রাজশাহী অ্যাডভান্সের খবর পেয়ে তা ব্যর্থ করতে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট থেকে ষড়যন্ত্র করে বাঙালি মেজর ভুঁইয়াকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬ নং উইং-এ পাঠানো হয়। তার আচরণ সন্দেহজনক হলে বিষয়টি নওগাঁস্থ ৭ নং উইং-এর স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী বাঙালি ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীকে জানান তিনি। তার প্রতি লক্ষ রাখতে নির্দেশ দিয়ে বললেন, রাজশাহীতে অ্যাডভান্সের জন্য তিনি প্রস্তত হচ্ছেন। এক পর্যায়ে মেজর ভুইয়াকে বন্দি করা হলে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি তিনি প্রকাশ করে দিলেন। ৭নং উইং থেকে ৩০ মার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে স্বাধীনতাকামী যোদ্ধারা রাজশাহীর গোদাগাড়ী মহিষালবাড়ির দিকে অ্যাডভান্স করলে সাধারণ মানুষেরা ব্যরিকেডগুলি পাহারা দিতে থাকলো। ছাত্রনেতা মোহাম্মদ আলী কামাল হাবিলদার চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে খরচাক্কায় জরুরি কাজ শেষ করে মহিষালবাড়ি  ফেরার সময় তাদের মটর সাইকেলের চাকা লিক হয়ে গেলে তারা মটর সাইকেলটি একটি বাড়িতে রেখে হাঁটা শুরু করলেন। দেখতে পেলেন, রাজশাহীর দিক থেকে দ্রুত বেগে দুটো গাড়ি যাচ্ছে। গাড়ি দুটো কাছে আসতেই গাড়ির মধ্যে দেখতে পেলেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক রাশিদুল হাসান, রহিম নাজির ও আর এক অফিসারকে। পিছনের গাড়িতে ইপিআর-এর মর্টার প্লাটুনের কিছু বাঙালি ইপিআর সদস্য। ছাত্রনেতা মোহাম্মদ আলী কামাল তাদের কিছু দূর পৌঁছে দেবার অনুরোধ করলে জেলা প্রশাসক রাজি হলে গেলেন। জেলা প্রশাসক রশিদুল হাসান মোহাম্মদ আলী কামালকে চিনে ফেলে বললেন,“ যা করা হচ্ছে তাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা ্িক্ষপ্ত হয়ে হয়ে সাধারণ মানুষদের হত্যা করবে। ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণের খবর পেয়ে তিনি সীমান্ত অঞ্চর পরিদর্শনে যাচ্ছেন। স্বাাধীনতাকামীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পৌঁছানো মাত্রই মোহাম্মদ আলী কামাল জেলা প্রশাসকসহ নিরাপত্তাকর্মীদের আত্মসমর্পণ করালেন। সঙ্গে থাকা ইপিআর-এর মটার প্লাটুনের সদস্যরা স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেয়ায় বেড়ে গেলো প্রতিরোধ শক্তি। আত্মসমর্পণকারী জেলা প্রশাসক রশিদুল হাসানকে সন্ধ্যার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘটনাটি জানানো হলো রাজশাহী শহরের উত্তরে নওহাটার মহিষকুন্ডু গ্রামে নওগাঁ ৭নং উইং থেকে অ্যাডভান্স হওয়া ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীকে। তিনি ১ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জে থাকা যোদ্ধাদের রাজশাহী শহরের পশ্চিমে কাশিয়াডাঙ্গায় অ্যাডভান্স হতে বললেন ।
লেখক : মুক্তিযুদ্ধের তথ্যসংগ্রাহক, প্রডিউসর প্রেজেন্টার রেডিও পদ্মা