৩৮তম বিসিএস এর ফলাফল ও কিছু কথা

আপডেট: July 23, 2020, 2:32 pm

সামসুল ইসলাম টুকু:


অতি সম্প্রতি প্রকাশিত ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। এই ফল প্রকাশের পর একটা পক্ষ প্রশ্ন তলেছেন “সাধারণ ক্যাডারে প্রকৌশলী কৃষিবিদ ও চিকিৎসক কেন?” এর বিপরীতে প্রতিপক্ষরা বলছেন “সাধারণ ক্যাডারে প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসক নয় কেন?” ৩৮তম বিসিএস এর ফলাফলে ২৫ জনকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ জন প্রকৌশলী ও ৭ জন চিকিৎসক। এই ২০ জনের মধ্যে আবার ১০ জনই বুয়েটের শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও অন্যান্য ক্যাডারেও আছেন। শুধু তাই নয়, ৩৮তম বিসিএস এ ২ হাজার ২৪ জনের পদ খালি ছিল। এর মধ্যে ১৩২০ জন প্রকৌশলী সাধারণ শিক্ষার্থীদের সরিয়ে বা টপকে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। এই ব্যতিক্রমি ও অপ্রত্যাশিত ফলাফল সাধারণ ক্যাডারদের হতাশ ও বিস্মিত করেছে। দেশ জয় করার মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন প্রকৌশলীরা। বিশেষত বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিনন্দন জানাতে হীনমন্যতায় ভুগছেন সাধারণ ক্যাডারের লোকজন।
বুয়েটের মত এত বড় বিদ্যাপিঠের শিক্ষার্থীরা যে দুর্লভ ও বিশেষ জ্ঞান অর্জন করলেন সেটাকে আর কখনো ব্যবহারের সুযোগ পাবেন না। তারা মেধাবী, তারা তাদের কর্মক্ষেত্রে থাকলেই ভালো করতেন, তাদের আসল কর্মক্ষেত্র ফাঁকা করে অন্য কর্মক্ষেত্রে চলে যাচ্ছেন সেজন্য ওই বিদ্যাপীঠের শিক্ষকরা ব্যথিত হবেন না খুশি হবেন- এসব ভেবে বিলাপ করছেন সাধারণ ক্যাডাররা। তারা এ ব্যাপারে বিশেষভাবে চিন্তিত ও দ্বিধান্বিত। তাদের দীর্ঘ কালের বদ্ধমূল ধারণা ও বিশ^াস টেকনিক্যাল ক্যাডারের লোকদের জেনারেল ক্যাডারে মানায় না। যারা জেনারেল ক্যাডারের তাদের জন্যই ওই পদগুলোর উপযুক্ত বা তাদেরই একান্ত প্রাপ্য। প্রশাসনে গিয়ে সচিবালয়ে গিয়ে কলম পেষার কাজটা তাদেরই। তারাই সহকারী কমিশনার থেকে সচিব পর্যন্ত হবেন আর সমাজে ছড়ি ঘোরাবেন। অন্যদিকে প্রকৌশলী কৃষিবিদ ও চিকিৎসকরা তাদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধন করবেন। তারা আরো চিন্তিত এ জন্য যে, ২৮/৩০ বছর পরে যখন ওই সব প্রকৌশলী ও চিকিৎসকরা পদোন্নতি পেয়ে সচিব হবেন, তখন সামান্য ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ না করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ৫ জন রোগী না দেখে তাহলে কি তাদের ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার বলা যাবে? তাহলে তারা কেন এই কলমপেষার পদে যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। এর কারণ হচ্ছে একজন সহকারী কমিশনার যে সামাজিক প্রভাব ও আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখেন বা তাদের দেওয়া হয়েছে, একজন সচিব রাষ্ট্র চালানোর যে ক্ষমতা রাখেন সেটা একই মেধাসম্পন্ন এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের না পাওয়ার যে বৈষম্য বিদ্যমান সেটা দূর না করার জন্যই প্রকৌশলী ও চিকিৎসকরা ওই পদগুলো তাদের দখলে নেওয়ার জন্যই উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। বেশি বেশি করে লেখাপড়া করছেন। আর তারা যদি মেধা তালিকার ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার ও পদোন্নতি পেয়ে সচিব হতে পারেন তাহলে তো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। সুতরাং ওই চিন্তাগুলো হবে অমূলক। বরং সেপথ উন্মুক্ত রাখাই ভালো। ভারসাম্য রক্ষা হবে বা টেকনিক্যাল বিভাগের তারাই সচিব হবেন। তারাই সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। সেখানে জেনারেলিস্টরা বেমানান ও কম যোগ্যতাসম্পন্ন। প্রকৌশলী কৃষিবিদও চিকিৎকদের এই উত্থান অনেকেই ভালো চোখে দেখেন না তাদের মনজগতের দ্বন্দ্বের কারণে। তারা এই উত্থানকে রুদ্ধ করার জন্য প্রকৌশলী কৃষিবিদ ও চিকিৎসকদের সাধারণ ক্যাডারে প্রবেশ রহিত করার আদেশ জারি করার সর্বশেষ ইচ্ছেটাও ব্যক্ত করতে ভুলেন নি।
প্রায় দুই যুগ আগে প্রকৃচির আন্দোলনের সময় প্রশাসন বনাম প্রকৃচির মধ্যে যে বৈষম্যগুলো উঠে এসেছিলো বিশেষত জেলা পর্যায়ে সেগুলো দেখা দরকার। প্রকৃচির কর্মকর্তারা মনে করেন, ডেপুটি কমিশনার তাদের অধীনস্থ কর্মচারী ভাবেন। তিনি সমন্বয়কারী ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপক না হয়ে প্রশাসক ভাবেন। তিনি টেকনিক্যাল বিষয়ে লেখাপড়া না করেও অর্থাৎ বিশেষায়িত জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও সে কাজের নিয়ন্ত্রক হতে চান। তার অধস্তন কর্মকর্তা সহকারী কমিশনারদের দিয়ে অন্য বিভাগের গাড়ি রিকুইজিসান করে ওই বিভাগের স্বাভাবিক কাজে বাধা দেন। একই সাথে বিসিএস পাস করেও পদোন্নতি হয়ে ডিসি হন এবং অন্যান্য ক্যাডারের বড় কর্মকর্তাদের উঁচু পদে চলে যান, আর অন্যান্য ক্যাডাররা সেই তিমিরেই থেকে যান। প্রশাসন ক্যাডারদের শনৈশনৈ পদোন্নতি হয়। দেশে এতো প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসক থাকতে সাধারণ বিএ, এমএ পাস করা জেনারেলিস্টরা তাদের সচিব হবেন কেন? উপরোক্ত এসব দ্বন্দ্বের কারণে তাদের মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা সৃষ্টি হয় এবং এর প্রতিবাদে তারা জনপ্রতিনিধির সভাপতিত্বে যে কোনো সভা করতে প্রস্তুত ছিলেন এবং ডিসির সভাপতিত্ব বর্জন করেন।
টেকনিক্যাল বিভাগ ও জেনারেলিস্টদের তথা প্রশাসনের মধ্যেকার এই দ্বন্দ্ব আজও সমাজে বিদ্যমান যদিও আগের মত তীব্র নয়। তারপরেও এই বিদ্যামান দ্বন্দ্বের কারণেই টেকনিক্যাল বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রশাসন পদ পাওয়ার এই লড়াইয়ের ফলাফল ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষায়। উদ্দেশ্য ক্ষমতা ব্যবহার করার ইচ্ছে। এই ইচ্ছেটা ব্যবহার হয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। এই ইচ্ছের কারণেই জনসাধারণ দলিত মথিত হয় চিড়াচ্যাপ্টা হয়। সুতরাং প্রশাসনে টেকনিক্যাল লোকেরাই আসুক আর জেনারেলিস্টরাই আসুক আমলাতন্ত্রের পরিবর্তন হয়ে জনতন্ত্র হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। যারাই এই প্রশাসনে আসুন না কেন ব্রাহ্মণ না হয়ে অতন্তপক্ষে মনুষ্য প্রজাতি ভাবুন। আপনাদের কার্যক্রম যেন দেশ ও জনতার বিপক্ষে না যায়। এ জন্য ক্ষমতার সীমা ও প্রয়োগ দুটোই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে, ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা না করে সমন্বয় করতে হবে। সমন্বয়ের অভাবটা আজ সমাজে খুব উৎকটভাবে ধরা পড়ে। অথচ দেশ ও জনগণের উন্নয়ন এর মধ্যেই নিহিত আছে। সর্বোপরি দলদাস না হয়ে দেশদাস হতে হবে। কারণ দেশ আপনাদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ করেছে এবং উচ্চ পদে পদায়ন করেছে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নাই বা করলেন। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে তো জবাবদিহি করতেই হবে। ভাববেন না যে ২০১৮ সালের কর্মকর্তা কর্মচারী আইন আপনাদের জবাবদিহি মুক্ত করেছে। হয়তো জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কিছুটা ক্ষুণœ হয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক