৩ কারণে হলি আর্টিজান হামলার চার্জশিটে দেরি

আপডেট: জুলাই ২, ২০১৭, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর এক বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত মামলার চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, এই হামলায় জড়িত পাঁচ জঙ্গি পলাতক থাকা ছাড়াও হলি আর্টিজান থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন আলামতের ফরেনসিক ও নিহত পাঁচ জঙ্গির ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না পাওয়ায় চার্জশিট দিতে দেরি হচ্ছে। যদিও শনিবার (১ জুলাই) হলি আর্টিজানে নিহত পাঁচ জঙ্গির ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ। কিন্তু কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, হলি আর্টিজানে হামলার পর জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জঙ্গিদের পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলেও তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছেন তারা। দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে জঙ্গিরাও বার বার কৌশল পরিবর্তন করে পাল্টা হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে। পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য সূত্রে জানা গেছে, এই সময়ে প্রায় দুই ডজনেরও বেশি হামলা করেছে জঙ্গিরা। এর কোনোটি ছিল এককভাবে, কোথাও সম্মিলিতভাবে।
পুলিশ সদর দফতর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ২৫০ জনের বেশি জঙ্গিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের মধ্যে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ৮৭ জন। তবে এ অভিযান জোরদার হয় ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পর। হলি আর্টিজান, কল্যাণপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেটসহ জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে অন্তত ৪০টি জঙ্গি আস্তানায় বিগত ১০ মাসে নারীসহ মারা গেছে ৫৪ জন। বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে আরও ২২ জঙ্গি। অভিযানসহ বিভিন্ন ঘটনায় জঙ্গিদের আসামি করে এ পর্যন্ত ৬৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে সারাদেশে। এর মধ্যে তিনটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ১৮ মামলার। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে একটিতে। তদন্ত চলছে আরও ৪০টির। ৫৭টি মামলার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। তিনটি ঘটনার রহস্য পুলিশ এখনও উদঘাটন করতে পারেনি।
হলি আর্টিজানে নিহত পাঁচ জঙ্গি
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গুলশানের হলি আর্টিজানের হামলায় সরাসরি ও নেপথ্যে জড়িত এমন ২২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। গত এক বছরে বিভিন্ন অভিযানে হলি আর্টিজান হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান ও তাউসিফ হোসেনসহ নিহত হয়েছে ১৩ জন। পলাতক রয়েছে আরও পাঁচ জন। বাকি চারজন কারাগারে। হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনায় সরাসরি অংশ নেয় পাঁচ জঙ্গি। তারা হলো রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, বগুড়ার শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিম্মি উদ্ধার অভিযানে হলি আর্টিজানেই প্রাণ হারায়। অন্যরা পরিকল্পনা, সমন্বয়, প্রশিক্ষণ, যোগাযোগ, অস্ত্র ও বোমা সংগ্রহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে।
জিম্মি উদ্ধার অভিযানে পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে নিহত হন হলি আর্টিজানের কর্মচারী সাইফুল ইসলাম চৌকিদার। হলি আর্টিজান ভেতর থেকে আটক আরেক কর্মচারী জাকির হোসেন শাওন ঘটনার কয়েকদিন পর হাসপাতালে মারা যান। হলি আর্টিজানে হামলা ও জঙ্গিদের সঙ্গে এই দুই জনের জড়িত থাকার কোনও তথ্য এখনও পাননি তদন্ত কর্মকর্তারা।
জঙ্গিবাদ মনিটরিংয়ে পুলিশ সদর দফতরের বিশেষায়িত সেল এলআইসি শাখার প্রধান ও এআইজি (গোপনীয়) মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি শিক্ষা ছিল। হলি আর্টিজান ছাড়া আরও বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের। কিন্তু হলি আর্টিজানের হামলা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশ জঙ্গি দমনে অনেকগুলো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। যার কারণে শোলাকিয়া ছাড়া আর কোথাও ওইভাবে জঙ্গিরা হামলা করতে পারেনি।’
হামলার পর হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট
হলি আর্টিজান হামলা ও মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকেই শনাক্ত করা হয়েছে। জড়িতদের অনেকেই বিভিন্ন অভিযানে নিহত ও গ্রেফতার হয়েছে। কয়েকজন পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষ্য গ্রহণ, জব্দ করা আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা ও নিহত ব্যক্তিদের ডিএনএ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে চার্জশিট তৈরি করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।’ যত দ্রুত সম্ভব এ চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সর্বশেষ গত বুধবার (২৮ জুন) দুপুরে সচিবালয়ের নিজ কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘হলি আর্টিজানের ঘটনা ছিল টার্নিং পয়েন্ট। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, জঙ্গিরা কী চায়। সব বিষয় খতিয়ে দেখতে গিয়ে চার্জশিট দিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।’ শিগগিরই এ ঘটনায় নির্ভুল ও নিখুঁত চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন