৪৫ বছরেও হয়নি চুক্তিতে নিয়োগের নীতিমালা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৭, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


খোদ সরকারের ভেতর থেকে তাগাদা থাকলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৫ বছরেও জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নীতিমালা হয়নি।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে সরকারের পছন্দের ও আস্থাভাজন কর্মকর্তারা চুক্তিতে নিয়োগ পাচ্ছেন।
নীতিমালা না থাকায় জনপ্রশাসনে প্রেষণে নিয়োগ হচ্ছে সামরিক কর্মকর্তাদেরও, যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে জনপ্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তাদের।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক বলছেন, প্রয়োজন আছে এমন কিছু কর্মকর্তাকেই চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়, এই নিয়োগে নীতিমালা করার চিন্তাভাবনা আছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চাকরির মেয়াদ শেষে সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তারাই তদবির করে চুক্তিতে নিয়োগ পান। এতে নিয়মিতদের মধ্যে যোগ্য অনেক কর্মকর্তাই পদোন্নতি পাচ্ছেন না।
সাধারণত নিয়মিত কর্মকর্তাদের অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) বাতিল করে চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। কয়েক বছর আগে অবসরে গেছেন এমন কর্মকর্তাদেরও চুত্তিতে নিয়োগ দিয়ে সরকারি চাকরিতে ফেরানোর নজির আছে।
বর্তমানে ঠিক কতটি পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা জানা না গেলেও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, পাঁচশরও বেশি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রদূত, সচিব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন কমিশন ও কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক, হাসপাতালের পরিচালকসহ রেওলয়ের কারিগরি পদে চু্ক্িততে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
২০১১ সালের ডিসেম্বরে মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরির বয়স ৫৭ থেকে ৫৯ বছর করা হয়। আর ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়স এক বছর বাড়িয়ে করা হয় ৬০ বছর।
চাকরির বয়স বাড়ার পর সরকারি কর্মকর্তাদের ‘পারতপক্ষে’ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দিতে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেককে চিঠি দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হলে একটি নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি সর্বোচ্চ কতো বছর বয়স পর্যন্ত এ সুযোগ দেয়া হবে- সে বিষয়েও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর তাগিদ দিয়েছিলেন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী মুহিত।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে মুহিতের সুপারিশেই চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সচিব পদে বেশ কয়েকজনকে চুক্তিতে নিয়োগ দেয়ায় দক্ষ ও যোগ্য অতিরিক্ত সচিবরা সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাচ্ছেন না।
“এতে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করলেও সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলেন না। জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গেও নিয়মিত কর্মকর্তরা চুক্তিতে নিয়োগ না দেয়ার দাবি নিয়ে বৈঠক করেছেন।”
ওই কর্মকর্তা বলেন, সব ধরনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ করলে সবার জন্যই মঙ্গল, এতে কোনো বিতর্কেরও সৃষ্টি হবে না।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কোনো নিয়মনীতি নেই, এটা ডিপেন্ড করে কার প্রয়োজনীয়তা আছে, আর কার নেই। সেটা চিন্তা করে হয়ত দু’একজনকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”
কাউকে চুক্তিতে নিয়োগ দিতেই হবে সেই বাধ্যবাধকতা নেই বলেও জানান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী।
“এমন কোনো নীতি নেই যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতেই হবে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নীতিমালা করার চিন্তাভাবনা আমরাও করছি।”
গত ১৭ অগাস্ট গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার একই পদে দুই বছরের চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। একই দিন দুই বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ পান স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি গোলাম নাসিরও।
গত ৭ অগাস্ট চুক্তিতে দুই বছরের জন্য নিয়োগ পান আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক। গত ২৮ জুন সচিব পবন চৌধুরীর পিআরএল বাতিল করে দুই বছরের জন্য তাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান দেয় সরকার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদের চুক্তির মেয়াদ ২০১৯ সালের ৮ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। গত ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদের চুক্তির মেয়াদও তিন বছর বাড়ানো হয়।
গত ১ ফেব্রুয়ারি চুক্তিতে এক বছরের জন্য বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগ পান পিআরএলে থাকা মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন। একই দিন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খানের মেয়াদও চুক্তিতে দুই বছর বাড়ানো হয়।
এর আগে ২৫ জানুয়ারি চুক্তিতে আরও এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নিয়োগ পান অবসরে যাওয়া সচিব সুরাইয়া বেগম।
চলতি বছরের ৩১ মে অতিরিক্ত সচিব হোসনে আরার পিআরএল বাতিল করে চুক্তিতে সচিব পদমর্যাদায় তাকে দুই বছরের জন্য বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়।
পিআরএলে থাকা অতিরিক্ত সচিব তরুণ কান্তি ঘোষকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান, পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা জামিল আহমেদ আলিমের পিআরএল বাতিল করে এক বছরের জন্য পেট্রোবাংলার পরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিসের বোর্ড অব গভর্নসের চেয়ারম্যান পদে মুন্সী ফয়েজ আহমেদ আবারও দুই বছরের জন্য নিয়োগ পান গত ৩১ মে।
প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদকে গত বছরের ২৭ নভেম্বর তিন বছরের চুক্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর চাকরির বয়স শেষ হলেও গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর এক বছরের চুক্তিতে তাকে ওই পদেই নিয়োগ দেওয়া হয়।
গত ৩ অগাস্ট ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন পরিচালক হিসেবে সেনাবাহিনীর চারজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে প্রেষণে নিয়োগ দেয় সরকার।
এছাড়া বিভিন্ন বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ পদে সেনা কর্মকর্তাদের প্রেষণে চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ