৫৪ মুক্তিযোদ্ধার গ্রাম কয়লারদিয়াড় একাত্তরে ছিল রাজাকারমুক্ত

আপডেট: জুলাই ১৯, ২০২২, ১১:১২ অপরাহ্ণ


সামসুল ইসলাম টুকু :


মুক্তিযুদ্ধে একটি ব্যতিক্রমি গ্রাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলাধীন শ্যামপুর ইউনিয়নের কয়লারদিয়াড়। ওই গ্রাম থেকে ৫৪ জন মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। গ্রামটি ছিল রাজাকারমুক্ত। ছিলনা কোনো পাক দালাল, গঠিত হয়নি পিস কমিটি। এমন আর একটি গ্রাম বাংলাদেশে নেই। ওই গ্রামে বসেই কথা হচ্ছিল কয়লারদিয়াড় গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইউনিয়ন কমান্ডার আশরাফুল ইসলাম মাস্টার এবং মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালেক মাস্টারের সাথে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ তাদের ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে এবং সেইদিন থেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য তারা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকেন। স্থানীয়ভাবে তাদের উৎসাহিত ও সংগঠিত করেন অ্যাডভকেট আজিজউদৌলা এবং তৎকালীন এমএলএ ডা. মইনুদ্দিন আহমেদ (মন্টু ডাক্তার)। ওই গ্রাম থেকে প্রথম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন মৃত মোবারক আলি। তিনি খুলনার এক জুট মিলে চাকরি করতেন। ২৫ মার্চের ক্র্যাক ডাউনের পর দেশের অস্থির পরিস্থিতি হলে তিনি খুলনা থেকে ট্রেনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফিরছিলেন। সেদিন ট্রেনে একজন পাকসেনা তার সাথে ভীষণ দুর্ব্যবহার করে এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালিসহ থাপ্পড় মারে। এতে তিনি সাংঘাতিকভাবে পীড়িত হন ও অপমান বোধ করেন। সেদিন পাকসেনার বিরুদ্ধে কিছু করতে না পারলেও প্রতিজ্ঞা করেন দেশ স্বাধীন করেই এই থাপ্পড়ের প্রতিশোধ নিবেন। বাড়ি ফিরে এসেই কালবিলম্ব না করে সেইদিনই ভারত পাড়ি দেন এবং মালদহের মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগদান করেন। তারসাথে ওই গ্রামেরই আলতাস হোসেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে কয়লারদিয়াড়ের আরও ৫২ জন যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ৪৫ জনই ৭ নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করেন। তবে তাদের আলফা, ব্রেভো ও চার্লি এই ৩টি কোম্পানিতে বিভক্ত করা হয়। প্রথমে তাদের মালদহ জেলার এনায়েতপুর রেহাইচক হাইস্কুল মাঠে পিটি প্যারেড প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ দেন ইস্কান্দার নামে জনৈক ইপিআর সদস্য। সেখানে ২৫ দিন প্রশিক্ষণের পর অ্যাডভান্স প্রশিক্ষণের জন্য তাদের দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহুকুমার পানিঘাটা নামে একটি ঘন গাছপালা বেষ্ঠিত স্থানে পাঠানো হয়। সেখানে তাদের যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট সতীষ কুমার দত্ত। এখানেও প্রায় একমাসের প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হয় এবং৭ নং সেক্টরের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের কমান্ডের অধীনে বিন্যাস্ত করা হয়। এই কমান্ডারদের মধ্যে ছিলেন মেজর নাজমুল হুদা, মেজর গিয়াস, ক্যাপ্টেম মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, লেফটেন্যান্ট কাইউম, ক্যাপ্টেন আব্দুর রশীদ, লেফটেন্যান্ট হারুনুর রশীদ। এসকল কমান্ডের নেতৃত্বে তারা পাকসেনাদের বিরুদ্ধে স্ট্রাইকিং ফোর্সের দায়িত্ব পালন করতেন। এসময় আড়গাড়ার এক সম্মুখযুদ্ধে কয়লারদিয়াড় গ্রামের দুই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার ও আনিসুর রহমান শহিদ হন এবং আহত হন হেলাল ও নাসিরুদ্দিন। এ ঘটনা তাদের দুঃখ দিলে ও তাদের ভাল লড়াকু হওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে। এছাড়া টাকসাল সন্যাসীতলার সম্মুখযুদ্ধে ইয়াসীন আলী শহিদ হন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসে কয়লারদিয়াড়ে কোনো পাকসেনা ঢুকতে সাহস পায়নি। অথচ মাত্র ১ কি.মি. এর ব্যবধানে সন্ন্যাসীতলা ও ধোবড়ায় বড় ধরনের যুদ্ধ স্ংঘটিত হয় এবং এই দুটি যুদ্ধে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। কয়লারদিয়াড় গ্রামে কেউ রাজাকার হওয়ার সাহস পায়নি এমনকি পিস কমিটি গঠিত হয়নি। অথচ এই গ্রামের পাশেই শ্যামপুর ইউনিয়ন ছিল রাজাকারদের ঘাটি। হয়তো এদের কারণে কয়লারদিয়াড় গ্রামের ৬ জন নিরীহ মানুষকে কাজ দেবে বলে ধোবড়ায় ডেকে নিয়ে যায় এবং তাদের পাকসেনারা নির্মমভাবে হত্যা করে সেখানেই মাটিচাপা দেয়। এরা হলেন, বজলুর রহমান, লাল মহাম্মদ, সেতাউর রহমান, আব্দুল লতিফ, মোজাম্মেল হক ও জিল্লার রহমান। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেই গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়নি। কয়লারদিয়াড়ে এই ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত। কয়লারদিয়াড়ে রয়েছেন ৫ জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। এরা হলেন, সাদাতুর রহমান, শাহাবউদ্দিন, শরিফউদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম ও আফসার হোসেন। এদের প্রথম দুজন মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সাথে যোগাযোগ করে তালিকাভুক্ত হন বলে সেখান থেকে মোটা অঙ্কের ভাতা পান কিন্তু বাকি ৩ জন কল্যাণ ট্রাস্টের সাথে যোগাযোগ করতে না পারায় সাধারণ ভাতা পান। এই গ্রামের ৩ সহোদর ভাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের মধ্যে ছোট দুভাই মারা গেছেন, বড়জন বেঁচে আছেন। ৫৪ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ২১ জন মারা যান। বাকি ৩৩ জনের মধ্যে ২১ জন দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন এবং মাত্র ১২ জন এখনও কয়লারদিয়াড়ে অবস্থান করছেন। তবে সকলেই নিয়মিতভাবে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। এরপর তারা আর কী চান এই প্রেক্ষিতে ৭০ বছর বয়স্ক মুক্তিযোদ্ধা আশরাফুল মাস্টার ও ৭৯ বছর বয়স্ক আব্দুস সালেক মাস্টার বলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন এবং এখনও করছেন। শুধু তাই নয় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ও প্রকৃত সম্মান এবং সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন। এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই। তারা তৃপ্ত।