৮ মার্চ প্রেক্ষিত : নারীর উন্নয়ন প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেট: মার্চ ৬, ২০১৭, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

 রোজিটি নাজনীন



ঐতিহাসিক ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০১৭। বিশ্বের নারী সমাজের কাছে ৮ মার্চের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দিবসটি পালনের জন্য প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় আয়োজন হয় বহুবিধি কর্মসূচি। কর্মসূচির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য- নারীর উন্নয়ন।
আসুন, তাহলে ৮ মার্চের জন্মের ইতিহাস আমরা নারী সমাজের কাছে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরি। এর জন্ম প্রতিষ্ঠা হলেন- জার্মান নেত্রী ক্লারা জেটকিন। ১৯০৮ সালে নিউইয়র্ক শহরে একটি সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকদের অমানবিক ও বিপজ্জনক কর্ম পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করার জন্য ক্লারা সেদিন প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিলেন। তবে তিনি সেদিন এককভাবে কোন দায়ভার নিজ কাঁধে তুলে নেননি। শুধু তাই নয়-নারী শ্রমিকদের নায্য মজুরি পেতে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সংঘবদ্ধ করে প্রতিবাদমুখর করেছিলেন। পরবর্তীতে এই দৃষ্টান্ত ভাবমূর্তির আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। ফলে সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল নারীর অর্থনৈতিক অধিকারের আর একটি অধ্যায়। ক্লারা জেটকিন সেদিনের যে কাজটি করেছিলেন আজ সেটি  ইতিহাস হয়ে যুগে যুগে নারীর উন্নয়নে প্রভাব ফেলেছে ও নারীদের দিক নির্দেশনা দিয়ে চলেছে। নারীরা নিজ মেধা বিকাশে সাহসের সাথে এগিয়ে আসছে। নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগের সম্প্রসারণ ঘটছে ও নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করছে। এমনকি বিচ্ছিন্ন নারী সমাজ সংবদ্ধ হয়ে গড়ে তুলছে বিভিন্ন সংঠন। স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার লক্ষ্যে তারা এই সংগঠনগুলিকে বিভিন্ন আকারে রূপ দিয়ে পুরুষের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছে। সর্বোপরি নারীর অর্থনৈতিক বহুবিধ সুযোগের সৃষ্টি হচ্ছে- নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে- নারীর উন্নয়নে বেগম রোকেয়ার শিক্ষার আলো যেমন নারীদের অশিক্ষার অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছিল ঠিক তেমনি ক্লারা জেটকিনের সংঘবদ্ধ শ্রমজীবী নারীদের আন্দোলন নারীদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে আশীর্বাদ হয়েছিল। তার আন্দোলনের প্রদত্ত ঘোষণা জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আজ দিবসটি বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে উৎযাপিত হচ্ছে।
ক্লারা জেটকিনের প্রদত্ত ঘোষণার ফল স্বরূপ ৮ মার্চকে জাতিসংঘের  আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের পরও কম সময় গড়ায়নি। পৃথিবী নামক গ্রহের অধিবাসী মানব জাতি হাজার বছরে পাড়ি দিয়েছে অনেকটা পথ। আর এই মানব প্রজাতির অর্ধেকটা হলো নারী। হাজার বছরের যাত্রাপথে সভ্যতার ইতিহাসে নারীদের অবস্থা ও অবস্থান কেমন ছিল বর্তমানে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে- ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রতি নজরদারি করা নারী সমাজের অন্যতম সচেতনতা। কারণ নারী চিরকালই নির্দিষ্ট সীমার গ-ির মধ্যে “বাক্সবন্দী” থেকেছে। অবরুদ্ধতার সময়ের সিঁড়িগুলোকে ভাঙ্গতে নারীকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হয়েছে, লড়াই করতে হয়েছে। তাই নারীর উন্নয়ন- শুধুমাত্র স্বপ্ন দেখার অভিপ্রায়ই নয়-বা পুরুষের আশ্বাসের বিশ্বাসেও নয়? নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হবে পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে তথা রাষ্ট্রিয়ভাবে। কারণ নারী উন্নয়নের জানালাটা অনেক বড়। কিন্তু সেটা খুলে দিতে হবে নারী পুরুষ উভয়কেই একত্রে। নারীদের মেধা বিকাশের সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিযোগিতার হাত নয়, সম্পূরক হাত হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে পুরুষকে। দেশের জাতীয় অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে পুরুষের একটি হাতই যথেষ্ট নয়Ñ প্রয়োজন নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি। আর এর বিকল্প উপায় মাত্র একটি। সেটা হলো নারীর মেধাকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা অর্থাৎ নারীকে অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণে সহায়তা করা। আর এটা সম্ভব কেবলমাত্র পারিবারিকভাবে উপযুক্ত যতœ ও পরিচর্যার মাধ্যমে। পুরুষের পাশাপাশি সম্পূরক হিসেবে কাজে অংশীদারিত্ব করতে সাহসী করে গড়ে তোলা। ঘরে বাইরে নারী শ্রম বিতরণ করে থাকে। কিন্তু তাদের সে শ্রম যদি অর্থের মাপকাঠিতে স্বীকৃত না হয় তাহলে তাদের সে শ্রমের মূল্যবোধ অন্যদের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। ফলে অর্থ উপার্জন নারীদের চেয়ে তাদের স্থান পরিবারে ও সমাজে অনেক নিচে থাকে। যে নারীরা দেশের ভবিষৎ প্রজন্মকে জন্ম দিচ্ছে, তাদের কখনোই এভাবে নিচে পড়ে থাকা বাঞ্ছনীয় নয়? এখন প্রশ্ন হল- আন্তজার্তিক নারী দিবস তথা বিশ্ব নারী দিবসে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের শান্তির সুবাতাস নারীরা গায়ে কতটুকু লাগাতে পেরেছে? এর উত্তর মনোদৈহিক দিক থেকে খতিয়ে দেখার সময় এখনই। কারণ সভ্যতার বিবর্তন ঘটছে, বদলাচ্ছে পৃথিবী। সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তা চেতনার গতি অর্থাৎ উন্নত জীবনের ছোঁয়া সর্বক্ষেত্রেই। এর মূল চাবিকাঠি হল- আর্থিক উপার্জন। তাহলে এই অর্থ উপার্জনে নারীদের জন্য কী কী সুযোগ সম্প্রসারণ করা দরকার? তাই অর্থনৈতিক সুযোগের সম্ভাবনার দ্বারগুলোও বিভিন্ন খাত অনুযায়ী উন্মোচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তৃণমূল নারী থেকে উচ্চবিত্ত নারীদের অবস্থা ও অবস্থানের স্বরূপ জেনে এই সুযোগগুলো সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহায়তার জন্য স্থানীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিবেশ সৃষ্টি করা। যাতে করে নারীরা তাদের মেধা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক স্বচ্ছলতা এনে তার অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন ঘটিয়ে ক্ষমতায়িত নারী হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে ও বিচ্ছিন্ন মনোভাব পরিত্যাগ করতে পারে। যদিও ইতোমধ্যেই নারী পুরুষের অসমতা কমিয়ে নারীদের শ্রমের মর্যাদার পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাদের কর্ম পরিবেশ নায্যমজুরি ও নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়গুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক করা হয়েছে। তাই অর্থনৈতিক সুযোগের সম্প্রসারণ করে নারীদের গুনগত মান বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ বর্তমানে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও নারীরা নিজেদের অনেকেই স্বামীর পরিচয় দিয়ে পরিচিত হয়। এইসব আদর্শ মনোভাবকে পিছনে ফেলে কর্মঠ ও সময়োপযোগী হয়ে নারীদের বেরিয়ে আসতে হবে। মেধা বিকাশের পাশাপাশি তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠতে হবে। মোবাইল প্রযুক্তির কৌশলগত ব্যবহার কাজে লাগিয়ে সফল উদ্যোক্তা হতে সাহসী হতে হবে। ব্যবসার তথ্য প্রচার বাজারজাতকরণ নেটওয়ার্ক বজায় রাখা ইত্যাদি বিষয়গুলো-নারী ক্ষমতায়নে ফলপ্রসু হবে।
সমাজের কুসংস্কার আর্থিক ও ধর্মীয়হীনতার আধিক্য নারীরা কৃতিত্বের সাথে যাতে মোকাবেলা করতে পারে। এর জন্য দরকার নারীদের সুশিক্ষা, সচেতনতা, আত্মবিশ্বাস, জ্ঞান ইত্যাদি। সমাজের কুসংস্কার থেকে নারীদের বের করতে হলে দরকার পুরুষের পাশাপাশি কাজে অংশগ্রহণ। কাজে অংশগ্রহণ করলেই অর্থায়নের মূল্যবোধের মাপকাঠিতে নারীদের গুরুত্ব অর্থপূর্ণ হবে। এটা আজ ২০১৭ সালে দাঁড়িয়ে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। বাস্তবাদী নারীরা নিজেদের চেতনাকে উন্মোচন করতে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে সৃজনশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। যা তাদের যাত্রাপথকে করবে মসৃণ, জীবনযুদ্ধে আত্মপ্রত্যয়ী করতে সহাক হবে। তবেই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীর উন্নয়ন প্রাসঙ্গিক ভাবনা স্বার্থক হবে। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়
“এ বিশ্বের যা কিছু মহান, চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।”
লেখক : সভাপতি, রাজশাহী উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি