৯/১১ এর পর পশ্চিম কী ভুল করেছিল

আপডেট: অক্টোবর ৯, ২০১৬, ১১:৪১ অপরাহ্ণ

9-11
পিটার আপস
১৫ বছর আগে বিমানগুলো যখন বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ও পেন্টাগনে আঘাত করল আর পেনসিলভ্যানিয়ার মাঠে বিধ্বস্ত হল তখন আমরা কে কোথায় ছিলাম সবাই মনে করতে পারি।
তখন আমার বয়স সবে ২০ বছর। স্বেচ্ছাসেবী ক্রু-সদস্য হিসেবে বিস্কে উপসাগরে প্রতিবন্ধীদের লাল রঙের পালতোলা জাহাজে আছি। তখনই একজনের এমন অনুভূতি হল যে লাখ লাখ লোকের নিয়তি এর সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টে গেল, যাদের অনেককেই আমি চিনি।
কর্মকর্তাদের জন্য বিষয়টি আরও বড় ধাক্কা ছিল। তাদের জন্য এটি বিশ্বের সামনে পশ্চিমের যে রূপ তা পাল্টে ফেলার চেয়ে কম কিছু ছিল না।
এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে লেবার পার্টির এক সম্মেলনে দেয়া ভাষণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বলেন, “ক্যালাইডোস্কোপ ঝাঁকি খেয়েছে।” এই ভাষণেই তিনি ‘বিশ্বকে নতুনভাবে সাজানোর’ প্রতিশ্রুতি দিলেন।
পশ্চিম যদি ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাত তাহলে কী হতে পারত তা আর কখনও জানা যাবে না।
এই বছরগুলো ধরে একটি করে বর্ষপূর্তি পার হয়েছে, আর মনের মধ্যে একটা চিন্তা খুতখুত করে উঠেছে: যেভাবে প্রতিক্রিয়া করা হয়েছে (হয়তো অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে) তাতে কি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে?
এই প্রতিক্রিয়া মানবজাতির শোচনীয় পরিণতি বা হামলাটির মানসিক আঘাত হ্রাস করতে পারেনি। সাধারণভাবে পশ্চিম ওসামা বিন লাদেন, আল কায়েদা এবং ইসলামিক জঙ্গিবাদের হুমকি অগ্রাহ্য করতে পেরেছে এমনটিও বলা যায় না।
কিন্তু সময়ের ব্যবধান যতই বাড়ছে, মনে হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে যা ঘটেছিল এবং আমরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া করেছিলাম এ দুটির মধ্যে ধাক্কা খাওয়ার মতো বৈপরীত্য আছে।
এ বিষয়ে অন্য সবার মতো আমিও অপরাধী। এটা এ কারণে না যে আমাদের অধিকাংশই, যা ঘটেছে তার প্রতিক্রিয়ায় ইরাক এবং আফগানিস্তানে পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের নাটকীয়তা বৃদ্ধি অপরিহার্য মনে করেছিলাম, বরং এটা শুধুমাত্র এই যে এটাকে অবশ্যম্ভাবী বলে অনুভব করেছিলাম।
কয়েক বছর ধরেই অনেকেই জানত যে ব্যাপক হতাহত হওয়ার মতো হামলার ঝুঁকি বাড়ছে। ইসলামি জঙ্গিরা এর আগেও টুইন-টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে, ১৯৯৩ সালে একটি গাড়িবোমা হামলায় ছয়জন নিহত এবং এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। এরপর ১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তাঞ্জানিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে বোমা হামলা হামলাকারীদের ক্রমবর্ধমান সামর্থ্য প্রদর্শন করল। ২০০০ সালে অক্টোবরে ইউএসএস কোলে চালানো হামলায়ও তার প্রকাশ ঘটে।
এসব হামলায় যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে তা কখনও আধুনিক ছিল না– ট্রাক ও নৌকায় বোমা ভর্তি করে আনা হয়েছিল। আল কায়েদা যে কাজে দক্ষ হয়ে উঠছিল তা হল, দুর্বল জায়গা শনাক্ত করে তা ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলা।
৯/১১ হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক প্রধানদের দিশেহারা করে ফেলেছিল। এই হামলা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়ে, এমনকি এ ধরনের ব্যাপক কোনো কিছু আঁচ করতে না পেরে, নিজেদের প্রত্যাশিত বিষয়গুলো অকস্মাৎ পুনরায় পরীক্ষা করতে বাধ্য হলেন তারা।
এক দশক পর জ্যেষ্ঠ এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমাকে বলেন, “৯/১১ হামলাকে এমনভাবে দেখা হতে লাগল যেন প্রতি সপ্তাহেই এরকম কিছু ঘটতে পারে।”
যখন ব্লেয়ার ইরাক দখলের যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করছিলেন এবং ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, তার বিতর্কের মূল কথা এটিই ছিল। তিনি বলেন, ৯/১১ হামলায় আল কায়েদা তিন হাজার মানুষ হত্যা করেছে, কিন্তু তাদের যদি ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করার সামর্থ্য থাকে তবে তারা তা-ই করবে। এরপর ইরাকের ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের হুমকি আর চলতে দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়।
পরে দেখা যায় সেগুলো আজগুবি ভাবনা ছিল। ইরাকের কী থাকতে পারে বা না পারে সে বিষয়ে নিদারুণভাবে অসম্পূর্ণ জ্ঞান একপাশে ঠেলে দিয়ে দখলের ফলাফল সহজবোধ্য বলে ধরে নেয়া হয়।
দার্শনিকভাবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির মতো নব্য-রক্ষণশীল ডানপন্থীদের সঙ্গে ব্লেয়ারের মতো নব্য-উদারপন্থী হস্তক্ষেপকারীদের বাস্তব ফারাক ছিল। তা সত্বেও তারা একই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন: পশ্চিমকে সুরক্ষা দেয়া ও বিশ্বের দরিদ্র ও অস্থিতিশীল অঞ্চলগুলোর অবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ পেছনে ঠেলে দেয়ার মতো উভয়ে ক্ষেত্রে দৃঢ় একটি সামরিক পদক্ষেপ কেন্দ্রীয় বিষয় হবে।
এই ভাবনা সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ব্লেয়ার থেকে বারাক ওবামা ও ডেভিড ক্যামেরন প্রশাসনে অনুপ্রবেশ করে ধারাবাহিকতা বজার রাখল। ওবামা-ক্যামেরন উভয়েই আরব বসন্তের পর লিবিয়ায় সরকার পরিবর্তনে নিজের নিজের ধরনে অভিযানের অনুমতি দিল। তারপর উভয়েই একই উপলব্ধির মুখোমুখি হলেন– হস্তক্ষেপ একটি জটিল বিষয় এবং তাত্ত্বিকভাবে সীমিত সময়ের অভিযানে বড় ধরনের পশ্চিমা সেনাদল পাঠানো অবধারিতভাবে পরিকল্পনাকারীদের মনমতো ফল বয়ে আনে না।
জঙ্গি হামলার হুমকি হ্রাস করতে গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কিছু করা হয়নি। যদিও গত দুবছর থেকে শুরু হওয়া হামলাগুলোর আগ পর্যন্ত পশ্চিম আকস্মিক রক্তাক্ত বোমা হামলাগুলোর অধিকাংশই এড়াতে পেরেছে, কিন্তু জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর হামলায় পাকিস্তান, নাইজেরিয়া এবং অবশ্যই ইরাক ও আফগানিস্তানে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে।
আমরা এখন পশ্চিমের চিন্তাভাবনার আমূল পরিবর্তন দেখছি। সামরিক হস্তক্ষেপ এখনও চলছে– ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে, সোমালিয়ায় বিমান হামলা চালানো হচ্ছে, আফগানিস্তানে স্বল্প পরিসরে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে সবই ভিন্ন আঙ্গিকে।
ভালো হোক বা মন্দ, এসব অভিযান সাধারণত পরিচালিত হচ্ছে স্থানীয় সরকারগুলোর তাড়নায়। যখন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র সেনাদলগুলো এবং কর্মকর্তারা এসব উদ্যোগে যোগ দিচ্ছে, তখন ফিরে আসার আগে দেশটিকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে তারা মূলত সমর্থনকারীর ভূমিকা নিচ্ছে। যদিও রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃবৃন্দ তাদের আগের ব্যর্থতার বিষয়ে এবং কেন তারা তাদের কৌশল পরিবর্তন করলেন সে বিষয়ে কথা কম বলতেই পছন্দ করছেন, তাহলেও এসব পদক্ষেপেই বেশি বাস্তববুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে।
পরিহাসের বিষয়, স্থানীয় বাহিনীগুলো ও ক্ষমতা কাঠামোগুলোর মাধ্যমে কাজ করেই ২০০১ সালে তালেবানকে আফগানিস্তানের ক্ষমতা থেকে হটানোর অভিযানে আকর্ষণীয় সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতা ইরাকে চালানো আরও জাঁকালো, নিয়মিত সামরিক অভিযানের সময় দ্রুত হারিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু একটি জায়গায় এই কৌশল কাজ করেনি, তা হল সিরিয়া। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সরকার পতনের আশায় থেকে বেপরোয়াভাবে বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে। ইরান, রাশিয়া এবং এখন তুরস্কের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার জন্য তৈরি হতে বাধ্য হচ্ছে। এসব দেশগুলোর প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দৃষ্টিকোণ ও মতামত আছে।
পরিহাসের বিষয় ৯/১১ এর পর থেকে বড় যুদ্ধগুলোর পেছনে এত বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যয় করা হলেও পশ্চিম সন্ত্রাসবিরোধী ফ্রন্টেই প্রকৃতপক্ষে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। আল কায়েদাকে ক্রমাগতভাবে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া গেছে, ওসামা বিন লাদেনকে অবশেষে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়েছে। নজরদারি, গোয়েন্দা কার্যক্রম, বিশেষ বাহিনীগুলোর সেনা এবং ড্রোনের মাধ্যমে জঙ্গিদের অভিযান বিপর্যস্ত করা গেছে।
তবে এগুলোর কোনোটিই আইএসের উত্থান ঠেকাতে পারেনি। এই গোষ্ঠীটি এখন পশ্চিমকে আঘাত করার জন্য নতুন নতুন কৌশল খুঁজে বের করছে, নির্দিষ্টভাবে একক ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র দলকে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত করে। এরা নিম্নমাত্রার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপক হত্যাকা- ঘটাতে পারে এবং এদের থামানো খুব কঠিন।
কিন্তু এসবে বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। একটি সংক্রমণের চিকিৎসা করার জন্য যেমন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, তেমনি সবসময়ই অত্যন্ত ক্ষতিকর নতুন প্রজাতি আভির্ভূত হতে পারে যাদের জন্য আলাদা চিকিৎসা দরকার হবে।
এটা বলা সহজ যে আঘাত করার অনেক আগেই হামলার ছক ও হামলাকারীকে শনাক্ত করে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া যাবে। কিন্তু তা কখনোই পুরোপুরি সম্ভব হবে না। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, প্রকৃত বিপদের দিকে এক চোখ রেখে অপরটি সেগুলো প্রশমিত করার প্রকৃত উপদানের দিকে রাখা: অস্ত্রের সহজলভ্যতা সীমিত করা, জনগণের একটা বড় অংশ নিশ্চিহ্ন করে না ফেলা যেন তারা উগ্রপন্থায় দীক্ষিত সম্ভাব্য ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে।
অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে, যা কিনা সমাজিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, বিভক্তিকে গভীর করে এবং সবকিছুকে আরও খারাপ করে তোলে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইউরোপে সবকিছু এর ঠিক বিপরীত ধারায় চলছে।
চূড়ান্ত কৌশলগত বিশৃঙ্খলা যা নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে হামলার দরজা খুলে দিয়েছিল, তা আশঙ্কাজনকভাবে গতানুগতিক ছিল। বক্স কাটারের মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র উড়োজাহাজের যাত্রীদের কাছে রাখতে দেওয়া উচিত হয়নি, যা পাইলটকে হত্যার করতে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং হামলাকারীদের ককপিটে প্রবেশ করতে দেয়াও উচিত হয়নি।
এখনও, সেই ভয়াবহ দিনটার ১৫ বছর পরে, আমার শুধু মনে হয় আরও কম কিছু করে কী আমরা আরও বেশি কিছু অর্জন করতে পারতাম না?
(বিডিনিউজ২৪ডটকম এর সৌজন্যে)