‘৯৭ বছরে এমন বর্বরতা দেখিনি’

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৭, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


কক্সবাজার বালুখালী পাহাড়ের ঢালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া নাজির হোসেননাজির হোসেন। বয়স ৯৭ বছর। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে কখনোই বাংলাদেশে আসতে চাননি। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে তিন ছেলে আগেই বাংলাদেশে এসেছেন। শুধু একাই বাড়িতে রয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কারণ সেখানে তার দাদা-দাদি থেকে শুরু বাবা-মা ও স্ত্রীর কবর। সেই জন্মভূমিতেই প্রিয়জনদের পাশে চিরনিন্দ্রায় শায়িত হওয়ার শেষ ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাকে নিজের ভিটেমাটিতে থাকতে দেয়নি। বাধ্য করেছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হতে দেখছি, বাংলাদেশ স্বাধীন হতে দেখছি। আমার ৯৭ বছর বয়সে এত বর্বরতা দেখিনি।’
নাজির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘আমার বাবার নাম আব্দুল খালেক। দাদার নাম ওয়াজ উদ্দিন। আমার পূর্বপুরুষ রাইখাইনের বাসিন্দা। আমরা খুব ধনী ছিলাম। ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার আগে ভারতের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছি। মিয়ানমারের বলিবাজার থানার নাগপুরায় থাকতাম। ওই এলাকায় ১৬ কানি আবাদি জমি আছে।’
মিয়ানমার সেনাবাহিনী গত ২৪ আগস্ট তার বাড়িতে যায়। তখন তার ছেলেরা কেউ বাড়িতে ছিলেন না। সেনাসদস্যরা তাকে ছেলেদের কথা জিজ্ঞাসা করে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মিলিটারিরা আমাকে প্রশ্ন করে, বাংলাদেশে যাবি, নাকি তোর ছেলেদের গুলি করে মারব? আমি বলি, ছেলেরা যাবে। আমি যাব না। এরপর মিলিটেরিরা ঘরে তল্লাশি চালায়। কিন্তু তখন কেউ ছিল না। ছেলেরা সবাই পাহাড়ে পালিয়ে ছিল।’
নাজির হোসেনের তিন ছেলে। বড় ছেলে মো. ইয়াহিয়া (৭০), মেঝ ছেলে মো. ইসলাম (৫৫) ও ছোট ছেলে মো. তাসকিন (৪৫)। তিন ছেলেই তাদের পরিবার নিয়ে ২৫ আগস্ট রাতে সীমান্তে আসেন। নাফ নদী নৌকায় পার হয়ে বাংলাদেশে আসেন তারা।
২৭ আগস্ট রাতে নাজির হোসেন ফোন করেন ছেলেদের। ওই দিন রাতে তার গ্রামে আগুন দেয় সেনাবাহিনী। তখন ছেলেরা তাকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। এ সময় তাদের পাশের বাড়িতে আগুন জ্বলতে থাকে। তিনি ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এক নাতি (মেয়ের ছেলে) মিয়ানমারে চিংড়ির ব্যবসা করেন। তাকেও ফোন দেন। তখন ওই নাতি এসে রাত ১টার দিকে নাফ নদীর তীরে নিয়ে আসেন। চিংড়ির ঘেরের নৌকায় গভীর রাতে নাজির হোসেনকে পার করে বাংলাদেশ সীমান্তে আনা হয়। সেখান থেকে হেঁটে টেকনাফ আসেন। ২৮ আগস্ট সকালে উখিয়ায় তার ছেলেরা নিয়ে আসেন। বর্তমানে সে বালুখালী পাহাড়ের ঢালে নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছেলেরা যে ঘর তৈরি করেছেন, সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। উঁচু এই পাহাড় থেকে মংডু দেখা যায়। বৃহস্পতিবার বিকালেও মংডুতে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। তা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাজির হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আমি এমন দৃশ্য আর দেখিনি। এত বর্বরতা! ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হতে দেখছি, বাংলাদেশ স্বাধীন হতে দেখছি। তখনও এমন দেখিনি। কারা হামলা করে চৌকিতে? তা আমরা কি জানি? আমাদের কেন মিলিটারি গুলি করে?’
বৃদ্ধ এই রোহিঙ্গা বলেন, ‘আমার মেয়ে আনোয়ারা বেগম (৫৫)। তার ছেলে জিন্নাহ এখনও মিয়ানমারে। সেখানে সে মাছের ব্যবসা করে। ভালোই ছিল তারা। কত কষ্ট করে বড় হয়েছে। সব শেষ হয়ে যাবে।’
নাজির হোসেন আবারও মিয়ানমারে যেতে চান। তিনি বাড়ি তালা মেরে রেখে এসেছেন। তার আশে-পাশের বাড়ি পোড়ালেও তার বাড়ি এখনও আছে। পোড়ালেও যেতে চান, পোড়া বাড়িটি কেমন আছে, তাও তার দেখতে ইচ্ছা।
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন