এক সেঞ্চুরিতে ইতিহাসে ফখর জামান

আপডেট: জুন ১৯, ২০১৭, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ওয়ানডে ক্যারিয়ারের চতুর্থ ম্যাচেই সেঞ্চুরি। তাও আবার আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে। সীমিত সংস্করণের ক্রিকেটে পাকিস্তানের ওপেনার ফখর জামানের শুরুটা বোধহয় এর চেয়ে আর ভালো হতে পারতো না! ইতিহাসের পঞ্চম ব্যাটার হিসেবে রোববার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে সেঞ্চুরি হাঁকানোর কীর্তি গড়েছেন ২৭ বছর বয়সি ফখর। ফাইনালের ভেন্যু কেনিংটন ওভালে উপস্থিতসহ পুরো বিশ্বের ক্রিকেট ভক্তরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেছেন তার ব্যাটিং। সাজঘরে ফেরার আগে ভারতীয় বোলারদের বেধড়ক পিটিয়ে খেলেছেন ১০৬ বলে ১১৪ রানের নান্দনিক ইনিংস।
ফাইনালে ভাগ্যটাও বেশ সহায়তা করেছে নবাগত ফখরকে। ব্যক্তিগত ৩ রানে জসপ্রিত বুমরাহর বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়েছিলেন তিনি। এমএম ধোনি সহজ ক্যাচটা লুফে নিলেও বিধি বাম! আম্পায়ার জানালেন, নো বল। ওভার স্টেপ করেছেন বুমরাহ। জীবন পেয়ে আর পেছনে ফিরে তাকান নি ফখর। সেই ওভারেই বুমরাহকে হাঁকিয়েছেন চার। কাটিয়েছেন চাপ। আরেক ওপেনার আজহার আলিকে নিয়ে সচল রেখেছেন রানের চাকা। হতাশ করেছেন ভারতীয় বোলারদের। ফাইনালে পাকিস্তানকে দিয়েছেন উড়ন্ত সূচনা।
ফখর হাফসেঞ্চুরি পূরণ করেছেন ৬০ বলে। রবীন্দ্র জাদেজাকে চার মেরে। তবে আজহারের সঙ্গে তার দারুণ ওপেনিং জুটিটা ভেঙেছে করুণভাবে। দলীয় ১২৮ রানে। ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউটের শিকার হয়েছেন আজহার। তবে ফখর অবিচল। হাফসেঞ্চুরি পূরণ করার পর হয়ে ওঠেন বিধ্বংসী। জাদেজার করা ২৬তম ওভারে হাঁকান দুই চার, এক ছক্কা। পরের ওভারে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের বলে মেরেছেন এক চার, এক ছক্কা। সেঞ্চুরি পূরণ করেছেন ঐ অশ্বিনকেই বাউন্ডারি মেরে। মাত্র ৯২ বলে। হার্দিক পান্ডিয়ার শিকার হওয়ার আগে ১১৪ রান করেছেন ১২ চার আর ৩ ছয়ে।
‘ফখর’ আরবি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘গর্ব’। ফাইনালের চাপ মাথায় না নিয়ে ফখর যে ব্যাটিং শৈলী প্রদর্শন করেছেন তাতে ফখরকে নিয়ে গর্বে বুক ফুলে ওঠার কথা পাকিস্তানের। শুধু ফাইনাল কেন? গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচ থেকেই ব্যাট হাতে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন ফখর। ভারতের কাছে টুর্নামেন্টের প্রথম হারের পর পাকিস্তান একাদশ থেকে বাদ পড়েন আহমেদ শেহজাদ। তার পরিবর্তে বাঁচা-মরার ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে একাদশে জায়গা হয় নবাগত ফখরের। সে ম্যাচে খেলেছিলেন ২৩ বলে ৩১ রানের ছোটখাট ইনিংস। কিন্তু ৬টি চারে সাজানো সেই ইনিংস দেখেই স্টিফেন ফ্লেমিং, মাইকেল ভনের মতো সাবেক ক্রিকেটাররা অভিভূত হয়েছিলেন।
তবে পাকিস্তানের টিম ম্যানেজমেন্টের ফখরকে মূল একাদশে টানার সিদ্ধান্তটা নিতে বেশ সাহসের পরিচয় দিতে হয়েছে। কারণ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগে তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিজ্ঞতা বলতে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ! তবে ফখর তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন প্রথম ম্যাচেই। এরপর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পরের দুই ম্যাচে টানা হাফসেঞ্চুরি। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫০ ও সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৭ রানের দারুণ দুটি ইনিংস খেলেছিলেন ফখর। আর ফাইনালে তো তুলে নিয়েছেন সেঞ্চুরিই!
ফখরের আগে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগের সাত ফাইনালে সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন মোটে চারজন। তারা হলেন যথাক্রমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফিলো ওয়ালেস, ভারতের সৌরভ গাঙ্গুলি, নিউজিল্যান্ডের ক্রিস কেয়ার্ন্স ও অস্ট্রেলিয়ার শেন ওয়াটসন। ১৯৯৮ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির প্রথম আসরের ফাইনালেই তিন অঙ্কের ম্যাজিকাল ফিগার ছুঁয়েছিলেন ওয়ালেস। পরের আসরে ২০০০ সালে এক ফাইনালেই সেঞ্চুরি করেছিলেন সৌরভ আর কেয়ার্ন্স। আর ফখরের আগে সর্বশেষ সেঞ্চুরিটি করেছিলেন ওয়াটসন। ২০০৯ সালের টুর্নামেন্টে।
নৌবাহিনী ছেড়ে ক্রিকেটে : ফখর জামান ক্রিকেটকে খুব ভালোবাসেন। ছোটবেলায় পড়াশুনার ফাঁকে পাড়ার ক্রিকেটে খেলতেন। তবে জীবনের তাগিদে নৌবাহিনীতে যোগ দিতে হয়েছিল তাকে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত ওই চাকরি চালিয়ে যান। এরপর নৌবাহিনী ছেড়ে ক্রিকেটে ফিরে আসেন তিনি।
ওই বছরই পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে ফখরের অভিষেক ঘটে। মুলতানের বিপক্ষে করাচি বুলসের হয়ে। কায়েদ-এ আজম ট্রফিতে অভিষেকেই জাত চিনিয়েছিলেন। চার দিনের ম্যাচটিতে প্রথম ইনিংসে ১১৪ বলে ৯টি চারে করেন ৭৯ রান। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮১ বল খেলে ১২টি চারের সাহায্যে করেন ৮৩ রান।
২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় দলে অভিষেক হয় ফখর জামানের। টি-টোয়েন্টি দিয়ে পথচলা শুরু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। চলতি বছরের ৭ জুন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অভিষিক্ত ম্যাচে মাত্র ৫ রানেই থামেন তিনি। এখন পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন ৩টি। সর্বসাকুল্যে করতে পেরেছেন ২৬ রান।
ওয়ানডে ক্রিকেটে ফখরের পথচলা শুরু চলতি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। পাকিস্তান নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভারতের কাছে হেরে যায়। ওই ম্যাচে ব্যাট হাতে ব্যর্থতার পরিচয় দেন আহমেদ শেহজাদ (১২)। তাতে কপাল খোলে ফখরের। শেহজাদের পরিবর্তে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে একাদশে জায়গা পেয়ে যান তিনি।
প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ওই ম্যাচে ফাখরের ব্যাট থেকে আসে ৩১ রান। এরপর থেকে পাকিস্তান একাদশে খেলে যাচ্ছেন তিনি। শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফিফটি করেছেন, রান সংখ্যা যথাক্রমে ৫০ ও ৫৭।
চার ইনিংসে ৬৩ গড়ে নামের পাশে যোগ করেছেন ২৫২ রান (কালকের ম্যাচসহ)। ফখর জামান নিজেকে বড় ভাগ্যবানই ভাবতে পারেন। নৌবাহিনীর চাকরিটা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তটা যথার্থই ছিল! নৌবাহিনীতে থাকলে তাকে কদজনই বা চিনতেন। এখন ফাখরের খেলা দেখছে গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। যেভাবে খেলছেন, এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।