করোনার হটস্পট রামেক হাসপাতাল নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা, ২৪ ঘন্টায় মৃত্যু আরও ১২ জন

আপডেট: মে ৩১, ২০২১, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম:


রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ও আইসিইউ ওয়ার্ডের বাইরে বিরাজ করছে থমথমে নিরবতা। প্রায়শই শোনা যাচ্ছে বুক ফাঁটা কান্নার সঙ্গে আর্তনাত। কারো চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরলেও বের হচ্ছে না শব্দ। আর এভাবেই কেউ চোখের পানি মুছে আবার কেউ বুক ফাঁটা কান্নাস্বরে পরলোকে পাড়ি জমানো স্বজনের লাশ নিয়ে আহাজারি করতে করতে হাসপাতাল ত্যাগ করছেন। এই দৃশ্যগুলো যখন ভয়াবহ এক পরিস্থিতির বার্তা দিচ্ছে-ঠিক সে সময় স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই হাসপাতালের বর্হিঃবিভাগ থেকে জরুরি বিভাগ, হাসপাতালে সামনের খাবারের দোকান থেকে লক্ষীপুর মোড়ের চায়ের দোকান, ফার্মেসি থেকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেক রোগি ও তার স্বজনসহ দালাল ও রিপ্রেজেন্টেটিভরা। এক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আইন শৃঙ্খলাবাহিনী ও প্রশাসন সর্তক অবস্থানে থাকার কথা বললেও দৃশ্যমান বিশেষ কোন কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।
রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রোববার (৩০ মে) ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালে আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রামেক হাসপাতালে করোনায় মৃত্যুর সর্বোচ্চ সংখ্যা এটি। মারা যাওয়া ১২ জনের ৮ জনেরই করোনা পজিটিভ। বাকি ৪ জনের করোনা উপসর্গ ছিল। তাদের নমুনা পরীক্ষার আগেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাত জন রয়েছেন। বাকিদের মধ্যে রাজশাহীর দুই জন, নওগাঁর দুই জন ও নাটোরের একজন। এ নিয়ে গত ছয় দিনে রামেক হাসপাতালে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেন ৫১ জন। রামেক হাসপাতালে বর্তমানে ২০৪ জন করোনাক্রান্ত রোগি চিকিৎসাধীন আছেন। এদের মধ্যে ৯৪ জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের। ৭৭ জন রাজশাহীর এবং বাকিগুলো বিভাগের অন্য জেলার।
রামেক হাসপাতালে মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন প্রাণ। আক্রান্তের নতুন সংখ্যা। এরপরও সচেতন হচ্ছে না কোভিড আক্রান্তসহ সাধারণ রোগিরা। এছাড়া চিকিৎসা কেন্দ্রিক লক্ষীপুর এলাকায় নেই কোভিড সুরক্ষার বিশেষ কোন ব্যবস্থা। গতকাল রোববার (৩০ মে) রামেক হাসপাতালে বর্হিবিভাগ, জরুরি বিভাগসহ লক্ষীপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্হিবিভাগের টিকিট কাউন্টার, মেডিসিন কাউন্টার ও চিকিৎসকদের রুমের বাইরে রোগিদের জটলা বেঁধেছে। একে অন্যের শরীরে স্পর্শ করেই সিরিয়াল নিচ্ছেন। অনেকেতো হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। অনেকেই মাস্ক হাতে ধরে আছেন। আবার কেউ নাকের নিচে লাগিয়ে রেখেছেন। একই অবস্থা প্যাথলজি বিভাগগুলোতেও। এদিন আনসার সদস্যদের সচেতনতামূলক মাইকিং করতে দেখা গেলেও রোগিরা তেমন কর্ণপাত করছেন না। হাসপাতালের নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদেরও তেমন সচেতন থাকতে দেখা যায় নি।
জরুরি বিভাগেও অধিকাংশ রোগি ও তার স্বজনকে তেমন সচেতন থাকতে দেখা যায় নি। অনেকেই মাস্ক না পরেই হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এদিন হাসপাতালের বর্হিবিভাগ ও জরুরি বিভাগে ডাক্তারদের চেম্বারের বাইরে ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভদের জটলা বাঁধতেও দেখা গেছে। অথচ হাসপাতালের জরুরি সাধারণ ওয়ার্ডগুলো থেকেও প্রায়শ পরবর্তীতে করোনা শনাক্ত হচ্ছে। যেটা ডাক্তার, নার্সসহ হাসপাতাল চিকিৎসা সহায়কদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান ডা. আফরোজা নাজনীন জানান, সাধারণ ওয়ার্ডে কিছুদিন চিকিৎসা নেয়ার পরে প্রায়শই রোগির করোনা শনাক্ত হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, তিনি কোন রোগির ড্রেসিং করলেন বা অপারেশন করলেন তার পরের দিন রোগির করোনা শনাক্ত হলো। এতে ডাক্তারদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়লো। এভাবেই তারা ঝুঁকির মধ্যে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু রোগিরা এখনো সচেতন হচ্ছেন না।
হাসপাতালে বাইরেও খাবারের দোকান, ওষুধ ফার্মেসিসহ ডায়াগনস্টিক সেন্টরগুলোর বাইরে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে যাওয়া আসা করছে। ফার্মেসিগুলোর সামনে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ লেখা সম্বলিত ফেস্টুন টাঙানো হলেও সেখানকার কর্মচারীরা নিজেরাই মাস্ক ব্যবহার করছেন না। এমনকি ফার্মেসির ভিতরে অনেকটা গাদাগাদি করেই কাজ করছেন কর্মীরা। ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বাইরে জটলা বাঁধিয়ে আড্ডা দিতেও দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভদের। বিকেলে পর তাদের আড্ডায় জমজমাট থাকছে লক্ষীপুর এলাকা। এরাও স্বাস্থ্যবিধির প্রতি তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
হাসপাতালের বাইরে খোলা পরিবেশেই খাবার খাচ্ছেন রোগিসহ তার স্বজনরা। এক্ষেত্রে হাত না ধুয়েও খেতে বসতে দেখা গেছে অনেককেই। এছাড়া হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে বসে আছেন ফুটপাত ব্যবসায়ীরা। তারাও মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। লাশ ও রোগিবাহী গাড়ি চালক ও তার সঙ্গীদেরও একই অবস্থা।
এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, রাজশাহীর করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। এখানে কঠোর লকডাউন বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। কয়েক দিন পর পরই করোনার বেড বাড়ানো হচ্ছে। এরপরেও করোনা পরিস্থিতির অবনতি হলে সামনে রোগিদের আর জায়গা দেয়া যাবে না।
তিনি আরো জানান, হাসপাতালে রোগিদের সচেতন করতে তারা বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কিন্তু রোগিরা সচেতন হচ্ছে না। এক্ষেত্রে তারা খুব বেশি কঠোর হতেও পারছেন না। আর হাসপাতালের বাইরের এলাকাগুলোতে প্রশাসনিক তৎপরতা যেভাবে থাকা প্রয়োজন কার্যত তা হচ্ছে না বলেই মনে করেন তিনি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও গুরুত্বে সঙ্গে নেয়ার আহ্বান জানান হাসপাতাল পরিচালক।
এবিষয়ে রাজশাহী পুলিশ কমিশনার মো. আবু কালাম সিদ্দিক জানান, করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে হাসপাতাল পরিচালক, জেলা প্রশাসকসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দায়িত্বশীলদের নিয়ে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার বৈঠক করেছেন। যেখানে তিনি সকলের করণীয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তিনি আরো জানান, হাসপাতাল এলাকার বাইরে তারা বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। মাস্ক বিতরণ করছেন। এখন ফার্মেসিগুলো বন্ধ করে বা রোগিদের সেখানে আসা বন্ধ করতে পারেন না। করোনা পরিস্থিতি পুলিশ মানবিকভাবে মোকাবিলা করছেন।