নগরীর স্কুলগুলোতে নেই খেলার মাঠ ।। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মানসিক বিকাশ

আপডেট: মার্চ ২, ২০১৭, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


রাজশাহী নগরের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ। খেলার মাঠ নেই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে। স্বল্প পরিসরে গড়ে উঠা এই বিদ্যালয়গুলোতে নেই সাংস্কৃতিক চর্চার কোনো সুযোগ। শুধু নিয়মমাফিক বিদ্যালয়ে এসে পড়ালেখাতেই ব্যস্ত শিশু শিক্ষার্থীরা। একঘেঁয়েমি রুটিনের ফলে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের মানসিক বিকাশ।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাইমারি লেভেলেই শিশুদের শিক্ষার ভিত গড়ে ওঠে। ওই বয়সে শিশুরা যা শেখে তা সারাজীবন তাদের কাজে লাগে। প্রথম দশ বছরেই শিশুদের বিকাশ হয়ে থাকে। এইজন্য শিশুদের জন্য পড়ালেখার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে দিয়ে শিশুরা যা শিখবে তা অন্য কোনো উপায়ে সম্ভব না। এইজন্য স্কুলগুলোতে অবশ্যই খেলাধুলার মাঠ থাকা উচিত।
রাজশাহী বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের তথ্যমতে, বিভাগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে সাড়ে আট হাজার। ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কিন্ডারগার্টেন স্কুল আছে চার হাজার। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গ্রাম পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে খেলার মাঠ থাকলেও শহর পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে খেলার মাঠ নামমাত্র আছে। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় খেলার মাঠ আরো নেই। এইজন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় থাকা ৬০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দেড়শটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে কোনো খেলার মাঠ নেই। যা আছে তাকে খেলার মাঠ বলে না। এর মধ্যে একবারেই খেলার মাঠ নেই নগরীর কাদিরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লক্ষ্মীপুর ভাটাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুল দুইটি দেখতে একবারে পাখির খাঁচার মতো।
বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আরো জানায়, বিভাগের অনেক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ আবার দখলও হয়ে গেছে। বিদ্যালয়ের মাঠেই গড়ে উঠেছে স্থাপনা। যেটুকু রয়েছে তাতে নেই খেলাধুলার পরিবেশ। বিভাগীয় তথ্যমতে, রাজশাহীতে মাঠ বেদখল হয়ে যাওয়া স্কুলের সংখ্যা ৬টি, নওগাঁয় ৬০টি, নাটোরে ৩৫টি, বগুড়ায় ২৪টি, সিরাজগঞ্জে একটি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ২১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ দখল হয়ে গেছে। এর মধ্যে নগরীর গৌরহাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায়ই গড়ে উঠেছে স্টিল ওয়ার্কশপ। সারাক্ষণ উচ্চ শব্দে কাজ চলে ওখানে। এছাড়া নগরীর উপকণ্ঠ কাটাখালী পৌর এলাকার মাসকাটাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে বসানো হয়েছে সবজির হাট। শুক্র ও সোমবার নিময়করে ওই বিদ্যালয়ের মাঠে বসে হাট। স্কুল চলাকালীন হাট বসায় ওখানে বিঘ্নিত হয় শিক্ষার পরিবেশ।
গত কয়েকদিন শিশু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের পড়ালেখার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীই আছে যাদের পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ আছে। শিশুদের বেশিরভাগই পড়ালেখা করে অভিভাবকদের শাসনে। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য পড়তে তারা কোনো আনন্দ পায় না। খেলাধুলা করতেই বেশি আনন্দ পায়। তা-ও খেলতে পারে না। খেলার মাঠ নেই। বাবা-মায়েরাও অনুমতি দেন না।
তবে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ ততটা প্রয়োজন নেই বলে বলে দাবি করেছেন নগরীর বোয়ালিয়া থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে শুধু অ্যাসেম্বলি হয়। এরপর পুরো সময় ক্লাসে থাকে শিক্ষার্থীরা। ফলে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সুযোগ কম থাকে। তিনি বলেন, নগরীর বিদ্যালয়গুলো ৬ ছয় শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠত। নীতিমালায় খেলার মাঠের জন্য অতিরিক্ত জমি রাখার কথা নেই।
রাজশাহী বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের উপপরিচালক আবুল খায়ের জানান, রাজশাহী নগরীর বিদ্যালয়গুলোতে খেলার মাঠ না থাকলেও গ্রাম পর্যায়ের প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ রয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কারণ গ্রামের প্রতিটি স্কুল ৩৩ শতাংশ জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর নগরীর স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সিটি করপোরেশনের আওতায়। পরে ওই স্কুলগুলো জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৭৩ সালের আইন অনুযায়ী ওই সময়ে যে বিদ্যালয়ে যতখানি সম্পত্তি ছিল তা ওই বিদ্যালয়ের হয়ে যায়। এর ফলে বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ অবহেলিত থেকে গেছে। জেলা পর্যায়ের শহর এলাকাগুলোতেও একই অবস্থা। এর মধ্যে কোথাও কোথাও বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ দখল হয়ে গেছে। তবে নতুন করে ভবন নির্মাণ হলে বহুতল ভবনের নিচতলায় শিশুদের জন্য খেলার জায়গা রাখার বিষয়টি ভাবনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, বিভাগের প্রায় ৪ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে খেলার মাঠ নেই। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই বিদ্যালয়গুলো দেখভালের কোনো সুযোগও নাই। যার যখন ইচ্ছা মতোন বিদ্যালয় স্থাপন করছে।
সংস্কৃতিকর্মী মনিরা রহমান মিঠি বলেন, শিশুদের জন্য খেলার মাঠ থাকবে না তা ভাবাই যায় না। পড়ালেখার বাইরে একটু নিঃশ্বাস নেবার মতোন খোলা মাঠ শিশুরা পাবে না তা হতেই পারে না। শিশুদের মূল বিকাশই তো হয় খেলাধুলার মাধ্যমে। পড়ালেখার বাইরে মাঠে শিশুরা দৌঁড়াবে, খেলবে; তবেই না শিশুরা ভালো থাকবে। আনন্দে থাকবে। আর আনন্দের মাধ্যমে শেখাটাই প্রকৃত শেখা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবা কানিজ কেয়া বলেন, বিদ্যালয়গুলোয় খেলার মাঠ না থাকায় শিশুরা পড়ালেখায় আগ্রহ হারাচ্ছে। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সামাজিকীকরণে পিছিয়ে পড়ছে। এর ফলে বাস্তব পরিবেবেশে শিশুরা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছেনা। অসামাজিক হিসেবে গঠে উঠছে। মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত এ সব শিশু কিশোর পরবর্তীতে নানা ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার কোনো বিকল্প নেই।