নিভৃত পল্লীতে সুরেলা কণ্ঠের শিল্পী রনজিত সাহার দুর্বিসহ জীবন

আপডেট: জুলাই ৩০, ২০২১, ৬:২৪ অপরাহ্ণ

মান্দা প্রতিনিধি :


‘আজ ১৮ বছর পরে পুরোনো দীঘির পাড়ে একা একা গেলাম যখন, দেখি কৃষ্ণচুড়ার গাছে নাম দুটো আজও আছে, লিখেছিলাম তুমি আর আমি, কিশোর কিশোরী ছিলাম যখন।’ কিংবা ‘ফুল ফোটে, তুমি আমি মুখোমুখি বসে দুজন, এভাবেই কাটাবো সারাটা জীবন।’ সুরেলা কন্ঠে এ ধরনের অনেক গান শুনিয়ে মুগ্ধ করেন সবাইকে।
বয়স ষাটের কোঠায়। শত দুঃখ দুর্দশার মধ্যেও গানই তাঁর জীবন। সাংসারিক কাজ করতে করতে আপন মনে গেয়ে চলেন। কখনো পাড়া প্রতিবেশির আবদারেও গান শোনান।
সুরেলা কণ্ঠের এই শিল্পীর নাম রনজিত কুমার সাহা। তিনি নওগাঁর মান্দা উপজেলার কাঁশোপাড়া ইউনিয়নের তুলশিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। দারিদ্রতার কারণে গানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ হয়নি। রেডিওতে গান শুনে মুখস্থ করতেন। এরপর বেশ কিছু দিন একটি যাত্রাদলে অভিনয় ও গান করেছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হন গানের জন্য।
শিল্পী রনজিত সাহা বলেন, স্কুলের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রতিবছরই গান করে প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন। সহপাঠী ও স্কুলের শিক্ষকরা তার গানের প্রশংসা করতেন। এতে গানের প্রতি তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। কিন্তু এসএসসি পাস করার পর অভাবের কারণে পড়াশোনার ইতি টানতে হয়েছে। কীর্তন দলের সঙ্গে বেশ কিছু দিন গান করেছেন তিনি।
এই শিল্পী আরো বলেন, ‘স্কুল জীবনে পড়াশোনার চেয়ে গান মুখস্থ করার প্রতিই আমার বেশি আগ্রহ ছিল। ইচ্ছে ছিল বড় শিল্পী হব। কিন্তু দরিদ্রতার জন্য সেটি আর হয়ে ওঠেনি। এখানেই আমার ইচ্ছের মৃত্যু হয়। তবে সংসার জীবনে শত অভাব-অনটনের মধ্যেও আত্মার খোরাক গানকে কখনো ছেড়ে দেইনি। গানকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে না পারলেও গান আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।’
প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে সংসার জীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘স্ত্রী মারা যাওয়ার পর প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে বড় বিপদে আছি। তার জন্য বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রায় সারাদিন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ের সেবাযত্ন আমাকেই করতে হয়।’
প্রতিবেশি গনেশ চন্দ্র সাহা জানান, গ্রামে কিংবা আশপাশে সাংস্কৃতিক কিংবা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য রনজিত সাহার ডাক পড়ে। গানের গলায় মুগ্ধ মানুষরা তাঁর দেখা পেলেই আবদার করে বসেন গান শোনানোর জন্য। তিনি কাউকে কখনো নিরাশ করেন না। গান গেয়ে খুশি করেন মানুষকে। তবে গান গেয়ে নিজের আত্মার তৃপ্তি মেটালেও দুঃখে ভরা এই মানুষটির জীবন।
রনজিত সাহার স্ত্রী চন্দনা রানী সাহা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১০ বছর আগে। প্রতিবন্ধী এক মেয়ে ও অনার্স পড়ুয়া এক ছেলেকে নিয়ে চলছে তাঁর জীবনযুদ্ধ। একচালা টিনের ঘর ছাড়া তার সহায়-সম্পত্তি বলতে আর কিছুই নেই। কাঠের ব্যবসা ও মৌসুমে আমের ব্যবসা করলেও করোনার জন্য থমকে আছে সবকিছু।
আত্মার খোরাক গান মুখে থাকলেও পেটের খাবার যোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে গুণী শিল্পী রনজিত সাহাকে। জীবনের বাঁকিটা সময়ও গান গেয়ে যেতে চান। স্বচ্ছলভাবে বাঁচার জন্য চান সরকার ও বিত্তবানদের সহায়তা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ